E-Paper

অত্যাচারের ইতিকথা ভোলেনি পরিবর্তনের সন্দেশখালি

দু’বছর পরে আর একটি নির্বাচনের আগে সব আপাতশান্ত। মূল রাস্তা থেকে অপরিসর গলিপথ দিয়ে এগোলে পাত্র পাড়া।

দেবাশিস চৌধুরী

শেষ আপডেট: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:০৯
নমিতা সর্দার। সন্দেশখালির পাত্র পাড়ায়।

নমিতা সর্দার। সন্দেশখালির পাত্র পাড়ায়। ফাইল চিত্র।

এই দ্বীপে ভেড়ির জলে নুন আছে। সেই নোনা জলে মিশে আছে অত্যাচারের ইতিহাস। চৈত্রের ঘুঘুডাকা দুপুরে সন্দেশখালির রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে সে কথাই মনে হচ্ছিল বার বার। দু’বছর আগে, শেখ শাহজাহান গ্রেফতার হওয়ার দিন এই রাস্তায় দাঁড়িয়েই ক্ষোভের আঁচ পেয়েছিলাম গ্রামবাসীদের কাছ থেকে। কেউ বলেছিলেন, রাতবিরেতে পার্টি অফিসে মেয়েদের ডেকে পাঠানোর কথা, নিজেরা হইহুল্লোড় করার পরে তাঁদের দিয়ে সে সব সাফসুতরো করানোর কথা। শুনেছিলাম পুরুষদের উপরে অত্যাচারের কথা।

আর ছিল লবণের প্রতাপ। এই দ্বীপে ধানচাষ হয় টুকরো জমিতে। যাঁরা শাহজাহান-বাহিনীর কথা শুনতেন না, তাঁদের জমির আল কেটে ঢুকিয়ে দেওয়া হত ভেড়ির লবণাক্ত জল। জমি বেদখল হয়ে যেত। ভেড়ির মালিকানাও মিলত না। এমনই এক ভেড়ির কালো জমির পাশ থেকে উঠে এসে এক প্রৌঢ় শুনিয়েছিলেন সেই কাহিনি। সঙ্গী হয়েছিলেন ৮ নম্বর কর্ণখালির আরও বেশ কয়েকজন মহিলা।

দু’বছর পরে আর একটি নির্বাচনের আগে সব আপাতশান্ত। মূল রাস্তা থেকে অপরিসর গলিপথ দিয়ে এগোলে পাত্র পাড়া। সেখানেই শ্বশুরবাড়ি রেখা পাত্রের। শ্বশুর-শাশুড়ি এখনও আছেন মাটির সেই বাড়িতে। যদিও শুনশান দুপুরে বাঁশের দরজায় ঝাঁপ ফেলা। একটু এগিয়েই বীণাপাণি সমাজকল্যাণ সমিতির ঘরটি। দু’বছর আগে শাহজাহানের গ্রেফতারির খবর শুনে এই এলাকায় উপচে পড়েছিল মহিলাদের ভিড়। তাঁরা এক দিকে ছিলেন খুশি। অন্য দিকে, আশঙ্কা ছিল যে, জেল থেকেই শাহজাহান হয়তো সব নিয়ন্ত্রণ করবে। সে নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ তার পরেও বহু বার উঠেছে। পুলিশ মাঝে মাঝে জেগে ওঠায় ধরাও পড়েছে শাহজাহানের কয়েক জন সঙ্গী। কিন্তু শিবু-উত্তমদের এলাকা, সন্দেশখালি দ্বীপ এখন আপাত ভাবে প্রতাপ-শূন্য।

খেয়া পেরিয়ে সন্দেশখালি ১ নম্বর ব্লকে থাকা দ্বীপটিতে ঢুকে একটু এগোলেই শিবু-উত্তমদের কুখ্যাত পার্টি অফিস। সে বাড়ি এখনও একই রকম। কাচ ভাঙা। দরজায় তালা। তৃণমূলের একটি অফিস কিছুটা এগিয়ে। সেখানেই এখন বসছেন দলের লোকজন। আর জমি ফেরানোর চেষ্টায় শাসক দল মাঠে নামিয়েছে দিলীপ নস্করকে। যিনি নিজেও শাহজাহান, শিবু, উত্তমের দাপটে এলাকা ছাড়া ছিলেন। যাঁকে শাহজাহানের সময়ের কথা জিজ্ঞেস করলেই লাভার মতো বার হয়ে আসে অত্যাচারের ইতিকথা। যা বলতেন এলাকার মানুষ। এবং বলতেন বিজেপির নেতারা।

তা হলে কি কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলারই চেষ্টা করছে তৃণমূল? কিন্তু

এতই যদি সব শান্ত, তা হলে পাত্র পাড়া, মাঝের পাড়ার লোকজন ইতস্তত করছেন কেন? পাত্র পাড়ারই পাড়া, মাঝের পাড়ার লোকজন ইতস্তত করছেন কেন? পাত্র পাড়ারই শঙ্কর মাইতি কথা বললেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর স্ত্রী এড়িয়ে গেলেন সংবাদমাধ্যমকে। বলে গেলেন, “যাঁরা (যে মহিলারা) সে দিন আন্দোলন করেছিলেন, তাঁরা সবাই কাজে তামিলনাড়ু গিয়েছেন। আমরা কিছু বলতে পারব না।” শঙ্কর অবশ্য বললেন, “এখন আর কোনও গোলমাল নেই।”এই কথার প্রতিধ্বনি স্থানীয় বাসিন্দা মামণি সর্দার, প্রতিমণি সর্দার বা নমিতা সর্দার এবং তাঁর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী মেয়ে পূর্ণিমার গলাতেও। সকলেই বললেন, এখন রাতবিরেতে খেয়া পার হয়ে দ্বীপে আসতে কোনও অসুবিধা নেই।

পূর্ণিমা বলছিলেন ভেড়ির নাম করে চাষের জমি দখলের কথা। এখন সে সব বন্ধ। বলছিলেন, মেলা হলেও স্টল যেত শিবু-উত্তমের পছন্দের লোকজনের হাতে। এখন তাতেও বিরতি। তিনি এ বারে নতুন ভোটার।

এখন চৈত্র সংক্রান্তিতে চড়ক পুজো। সে জন্য টোটো থামিয়ে চাঁদা তোলা হচ্ছে। ডাঁসা নদীতে খেয়ায় ভাসতে ভাসতে কানে আসছিল সন্দেশখালি ২ ব্লকের দ্বীপ থেকে লাউডস্পিকারের শব্দ। সেই শব্দে সম্প্রীতি। নদী পেরিয়ে খটির ঘাট পর্যন্ত গিয়ে দেখা পাওয়া গেল তৃণমূল প্রার্থী ঝর্না সর্দার এবং তাঁর প্রচারের মূল চালিকা শক্তি দিলীপ নস্করের। প্রচারের সকালের পর্ব শেষ করে দিলীপ চেয়ার পেতে বসেছেন। লাল চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “আমি রেখা পাত্রের বাড়িতে গিয়ে কড়া নাড়লে, তাঁরা আমাকে আপ্যায়ন করেন। অন্তত দু’টো ভোট পাব ওই বাড়ি থেকে।” শোনাচ্ছিলেন, শাহজাহানদের প্রভাবে কী ভাবে পুলিশ গিয়ে উঠেছিল তাঁর বাড়িতে। গভীর রাতে। শোনাচ্ছিলেন, কী ভাবে জমি দখল করে ভেড়ি তৈরি করত শাহজাহানরা।

এ সবই জানা। তফাত শুধু, দু’বছর আগে বলেছিলেন অত্যাচারিতেরা। এখন বলছেন তৃণমূলের নেতাই। বলছেন, “তখন কিছু টাকা শিবুর কাছ থেকে উদ্ধার করে সংশ্লিষ্ট লোকজনকে দেওয়া হয়েছিল। ভেড়ির মালিকানা সংক্রান্ত যে সব কাগজপত্র শিবুরা আটকে রেখেছিল, তার বেশির ভাগই আসল মালিকদের দেওয়া হয়েছে। ভোটের পরে বাকিরা পেয়ে যাবেন।” একই সঙ্গে জানাচ্ছেন, এখন কেউ ভেড়ি নিয়ন্ত্রণ করে না। সাম্রাজ্য বলতে আর কিছু নেই।

সত্যি কি তাই? তা হলে ধামাখালির কাছে, আকুঞ্জিপাড়ায় এখনও ক্ষোভ কিসের?অবশ্য বিজেপি প্রার্থী সনৎ সর্দারও মানছেন, ২০২৪ সালের সে ভয় আর মানুষের মধ্যে নেই। বলছেন, “মানুষের ভয় কেটেছে। তারা বুঝতে পারছে, কিছু দিনের মধ্যেই রাজ্যে পরিবর্তন আসছে।”

২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে সন্দেশখালি থেকে আট হাজার ভোটে ‘লিড’ নিয়েছিল বিজেপি। এ বারে দু’পক্ষেই গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আছে। বিদায়ী বিধায়ক সুকুমার মাহাতোকে প্রার্থী না করায় তিনি দূরত্ব রাখছেন বলেই এলাকায় আলোচনা। ফোনে সুকুমারের নিরাসক্ত গলা শুনেছিলাম। যদিও দিলীপ তা মানতে চাননি। আবার সনতের ঘরেও দ্বন্দ্বের কাঁটা। দু’বছর আগে অত্যাচারিত মুখ হিসেবে রেখাকে তুলে ধরেছিল বিজেপি। বসিরহাটের প্রার্থী করা হয় তাঁকে। প্রধানমন্ত্রী নিজে ফোন করে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছিলেন। সন্দেশখালি বিধানসভা কেন্দ্র তফসিলি জনজাতির জন্য সংরক্ষিত। তাই রেখাকে প্রার্থী করা হয়েছে হিঙ্গলগঞ্জে। এ দিকে সনৎ নিজে ছুটে বেড়াচ্ছেন। মনোনয়ন পর্বে একাধিক বার বসিরহাট শহরে যেতে হয়েছে তাঁকে। দ্বীপে ঘোরার সময়ে তাঁর প্রচারের খণ্ডচিত্র সে ভাবে চোখে পড়েনি। বিপরীতে দিলীপ পড়ে আছেন মাটি কামড়ে। দৃশ্যতই গতিশীল প্রচার।

তবে সব কিছু তো খালি চোখে ধরা পড়ে না। যেমন, বিজেপির অহরহ ধর্মের ভিত্তিতে ভাগাভাগি করার চেষ্টা। যদিও সাধারণ মানুষের একটা অংশ একে বেশি গুরুত্ব দিতে নারাজ। বরং সন্দেশখালির ভোটে আসল চাবিকাঠি রয়ে গিয়েছে সেই অত্যাচারের কাহিনির মধ্যে। সেই ভয় কি ভাঙাতে পারবে শাসক দল? না কি ইভিএমের বোতাম টেপার আগে শাহজাহানদের দাপটের কথা মনে পড়বে ভোটারদের?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

sandeshkhali

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy