দ্বন্দ্ব আর চোরাস্রোতের চক্রে গড় রক্ষার যুদ্ধ তৃণমূলের

শিয়রে ভোট। কী পরিস্থিতি জেলায় জেলায়? খোঁজ নিল আনন্দবাজার

দেবাশিস চৌধুরী

শেষ আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:২১
ইছামতীর ও-পারে নজরে আসছে বাংলাদেশ। হিঙ্গলগঞ্জে।

ইছামতীর ও-পারে নজরে আসছে বাংলাদেশ। হিঙ্গলগঞ্জে। — নিজস্ব চিত্র।

ইছামতীর সেতুতে ওঠার মুখে, বসিরহাট মহকুমা আদালত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেখানে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে ওঁরা।

উত্তর বাগুন্ডি গোটরা পঞ্চায়েতের সুমিতা দাস, পশ্চিম মধ্যমপুর নিমদড়িয়া কোদালিয়া পঞ্চায়েতের আকলিমা বিবি। লাইনে সামনের দিকে নাজিম হুসেন মোল্লা। নিবাস শাকচূড়া বাগুন্ডি পঞ্চায়েত। সকলেরই নাম বাদ গিয়েছে। এসআইআরের শুনানি, ট্রাইবুনালের শুনানি পেরিয়ে এ বার শেষ চেষ্টা, আদালতে আপিল।

একে কি সরলরেখা বলা যায়? না কি এমন আঁকাবাঁকা পথের চলনই এই সব কেন্দ্রের ভোট-ভাগ্য নির্ধারিত করবে?

পাশে চায়ের দোকানে চলুন। হাড়োয়া থেকে এসেছেন ওঁরা পাঁচ-ছ’জন। পুরুষ। মুসলমান। তাঁদেরই এক প্রৌঢ় বললেন, ‘‘এসআইআরে নাম বাদের প্রভাব পড়বে না ভোটে।’’ তার পরেই যোগ করলেন, ‘‘ও সব নাম তাদেরই বাদ গিয়েছে, যাদের সমস্যা আছে। কই, আমাদের তো কিছু হয়নি!’’

কত জন পরিবারে? প্রৌঢ়ের কথায়, ‘‘আমার চার ছেলে, দুই মেয়ে। সবার ভরপুর সংসার। কারও নাম বাদ যায়নি।’’ তা হলে যে যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির ক্ষেত্রে ছয় ছেলেমেয়ে হলেই ডাক পড়ার কথা? চায়ের কাগজের কাপটা ফেলে প্রৌঢ় উঠে দাঁড়ালেন, ‘‘আমাদের ডাকেনি।’’ তার পরে বললেন, ‘‘আমরা এ বারে সব আইএসএফ-কে ভোট দেব।’’ পাশ থেকে আরও কয়েক জন বলে উঠলেন, ‘‘পিয়ারুল (ইসলাম) ভাল প্রার্থী (আইএসএফ)। ও-ই এ বারে জিতবে।’’

আর এক ইছামতীর সঙ্গে দেখা হিঙ্গলগঞ্জে। ও-পারে তার বাংলাদেশ। বিডিও অফিসের সামনে থেকে নদীর ধার ধরে এগোলে দেখা যায়, খাঁড়িতে নৌকা বাঁধা। আর একটু এগোলে বিএসএফ আউটপোস্ট। তার পরে হিঙ্গলগঞ্জ বাজার।

টাকিতে খোলা ইছামতী। এখানে মানুষ সমান উঁচু পাঁচিল। টাকিতে লঞ্চে নদীতে ঘোরা যায়। হিঙ্গলগঞ্জে জলে নামা নিষেধ। এত কড়াকড়ি কেন? নদী পেরিয়ে অনুপ্রবেশ ঘটে? হিঙ্গলগঞ্জ বাজার সমিতির অন্যতম কর্তা দেবপ্রসাদ রহি বললেন, ‘‘এখান থেকে লেবুখালি ১০ কিলোমিটার। সেই পর্যন্ত অনুপ্রবেশ নেই। তবে ব্লক তো সুন্দরবন পর্যন্ত বিস্তৃত। ও দিকে কোথাও আছে কিনা, বলতে পারব না।’’ দেবপ্রসাদের দোকানে নতুন জামাকাপড়ের মধ্যে উঁকি দিচ্ছিল হিজাবের বাক্স। দেবপ্রসাদ বললেন, ‘‘এই সময়ে তো সবাই আসে বাজার করতে।’’ তার পরে, ‘‘এ তো হিন্দুপ্রধান এলাকা। এখান থেকে বিজেপি-ই জিতবে।’’ পাশের দোকানে এক ভদ্রমহিলা জিজ্ঞাসু চোখে তাকাচ্ছিলেন। কিন্তু এগিয়ে যেতেই হাত নেড়ে বোঝালেন, কিছু বলবেন না।

একই দৃশ্য সন্দেশখালিতে, রেখা পাত্রের পাড়ায়। মহিলারা সহজে কিছু বলতে চাইছিলেন না। সন্দেশখালি তফসিলি জনজাতির জন্য সংরক্ষিত হওয়ায় রেখা হিঙ্গলগঞ্জে বিজেপির প্রার্থী। সন্দেশখালির বিজেপি প্রার্থী সনৎ সর্দার বলছিলেন, ‘‘এ বারে লোকজন নির্ভয়ে নিজেদের কথা বলছেন। তাঁরা জানেন, এ বারে বদল হবেই।’’

বসিরহাট উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রে ধান্যকুড়িয়া রাজবাড়ির কাছে দক্ষিণপাড়ার বাসিন্দা হৃদয়বল্লভ কাবাসিও বলছিলেন, ‘‘হিন্দুদের এই শেষ সুযোগ।’’ এই সুযোগ হারালে কী হবে? উত্তর নেই। তবে জোর গলায় দাবি করলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্যই এসআইআর-এ মানুষের এত দুর্গতি।

কাছেই বিশ্বাসপাড়া। তেমাথার মুখে দাঁড়িয়ে বাবুদা (পুরো নাম বললেন না প্রৌঢ়) বলছিলেন, ‘‘ঘূর্ণিঝড়ে এত ক্ষয়ক্ষতি হল, যা পেল সব পার্টির লোক! দুঃস্থ মেয়েদের অনাথ আশ্রমটাও তুলে দিল তৃণমূল!’’ তত ক্ষণে তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন জালাল (পুরো নাম বললেন না তিনিও)। বাবুদা বলেন, ‘‘জালাল ওই আশ্রমে কাজ করতেন। ওঁকেই জিজ্ঞেস করুন না!’’ জালাল বললেন, ‘‘বাধা দিয়েছিলাম। কাজ হয়নি। মেয়েরা কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল!’’

ক্ষোভের কথা মেনে নিলেন তৃণমূলের প্রাক্তন বিধায়ক এবং বর্তমানে বসিরহাট উত্তরে দলের মূল ভোট-কর্তা এটিএম আবদুল্লা রনি। জানালেন, এ বারের লড়াই কঠিন। বসিরহাট উত্তর কেন্দ্রে বাদ গিয়েছে ৩৪ হাজার নাম। বসিরহাট দক্ষিণে লড়াই আরও তীব্র। দুই পুরসভা, বসিরহাট ও টাকিতে তৃণমূল অনেকটা পিছিয়ে। ভরসা শুধু গ্রাম, বলছিলেন তৃণমূলেরই সুরজিৎ মিত্র। সেখানে যদি কংগ্রেস-সিপিএম ভোট কাটে! নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তৃণমূল কর্মী জানিয়ে গেলেন, ‘‘রনিদার ইচ্ছে ছিল, প্রার্থী হবেন। কিন্তু...।’’ দক্ষিণেও ‘অফ দ্য রেকর্ড’ ক্ষোভ। ‘অন রেকর্ড’ নীরবতা। বাদ নেই মিনাখাঁও। মিনাখাঁ ২ ব্লকের দায়িত্বে তাজউদ্দিন মোল্লা। দীর্ঘদেহী মানুষটি জানালেন, অন্য দুই ব্লকের মতো নয় তাঁর ব্লকটি। এটি হিন্দু-প্রধান। কিন্তু লক্ষ্মীর ভান্ডার, যুবসাথী তুরুপের তাস হবে। যদিও বেসুর দলের অন্দরে। যে দিকে ইঙ্গিত করে মিনাখাঁর আইএসএফ প্রার্থী প্রতীক মণ্ডল বলছিলেন, ‘‘ভোট কাটাকাটিতে যে কেউ জিততে পারে।’’

এ সব অঙ্ক অবশ্য উড়িয়ে দিল হাড়োয়া শহরের কাছে বিকেলের চায়ের আড্ডা বা বাদুড়িয়া বিধানসভা কেন্দ্রে যদুরহাটি বাজারের এক ভাতের হোটেলের ভিড়। বিদায়ী বিধায়ক কাজী আবদুর রহিমের ভদ্রাসন বাদুড়িয়া। আগে তাঁর বাবা ছিলেন কংগ্রেস বিধায়ক। ২০১৬ সাল থেকে তিনি। ২০২১-এ তৃণমূলের। এ বারে ঘাসফুলের টিকিট না পেয়ে কংগ্রেসে ফিরেছেন। বলছিলেন, ‘‘২০২৩ সালে পঞ্চায়েত ভোটের সময় থেকে একঘরে হয়ে পড়ছিলাম। এআইসিসি থেকে যোগাযোগ করলে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরেছি।’’ তাঁর বিশ্বাস, এই এলাকায় ভোট ধর্মের নামে ভাগহবে না।

বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে সাতটি বিধানসভা কেন্দ্র: বাদুড়িয়া, হাড়োয়া, বসিরহাট উত্তর ও দক্ষিণ, সন্দেশখালি, মিনাখাঁ ও হিঙ্গলগঞ্জ। এর মধ্যে লোকসভা ভোটে একমাত্র সন্দেশখালিতে তৃণমূল পিছিয়ে ছিল আট হাজারের কিছু বেশি ভোটে। বসিরহাট উত্তর ও দক্ষিণ, হাড়োয়া, মিনাখাঁ, বাদুড়িয়ায় সংখ্যালঘু ভোট ৫০ শতাংশ বা তার বেশি। হিঙ্গলগঞ্জেও ২৫ শতাংশের বেশি সংখ্যালঘু ভোট। তবে তৃণমূলের গড় হিসাবে পরিচিত এই সব এলাকায় এ বারে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা, নেতাদের দাপট, দুর্নীতি এবং সর্বোপরি ভোটার বাদ হয়ে উঠতে পারে নির্ণায়ক। আইএসএফ, কংগ্রেসের পালে হাওয়া লাগলে কী হবে, কেউ বলতে পারেন না।

কেউ বলতে পারেন না? যদুরহাটি বাজারে জাহানারা বিবি বললেন, ‘‘দুটো অস্ত্রোপচার হল। গলব্লাডার আর অ্যাপেন্ডিসাইটিস। আশি ভাগ টাকা তো স্বাস্থ্যসাথী থেকেই পেলাম।’’ এক সময়ে সিপিএম করা মিজানুর মণ্ডল থেকে কংগ্রেসের এসরাফিল মণ্ডল বা দোকান মালিক আনসার মল্লিক, সকলেই একযোগে বললেন, ‘‘যা দিচ্ছেন, দিদিই দিচ্ছেন!’’ আইএসএফের কাদের ভাই দাবি করলেন, বিধায়ককে কখনও এলাকায় দেখা যায়নি। হাড়োয়ার চায়ের আড্ডাতেও ইকবাল আহমেদ, আমিরুল মণ্ডল, বাবর আলি মোল্লা বা রবিউল ইসলামের এক কথা। বললেন, ভোটকাটুয়াকে ভোট দেবেন না।

ইছামতী নদী, মেছোভেড়ি আর ঝকঝকে নিউ টাউন-রাজারহাটের উপান্তে থাকা গঞ্জের পথঘাট তাই অপেক্ষায়, অঙ্কের শেষ দেখতে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Basirhat

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy