E-Paper

ভাতার বিচার ভিন্ন, ধন্দ রয়েছে ভোট-ব্যাঙ্ক নিয়েও

শিয়রে বিধানসভা ভোট। কী পরিস্থিতি জেলায় জেলায়? খোঁজ নিল আনন্দবাজার।

দয়াল সেনগুপ্ত 

শেষ আপডেট: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:২৭
ভাতার লড়াই এক দেওয়ালে। এক দিকে শাসকদলের লক্ষ্মীর ভান্ডার, অন্য দিকে বিজেপির প্রস্তাবিত অন্নপূর্ণা ভান্ডার। দুবরাজপুরের চণ্ডীপুর গ্রামে।

ভাতার লড়াই এক দেওয়ালে। এক দিকে শাসকদলের লক্ষ্মীর ভান্ডার, অন্য দিকে বিজেপির প্রস্তাবিত অন্নপূর্ণা ভান্ডার। দুবরাজপুরের চণ্ডীপুর গ্রামে। — নিজস্ব চিত্র।

বাস স্ট্যান্ড, স্কুল, ছোটখাটো বাজার নিয়ে জমজমাট মহম্মদবাজারের গণপুর জনপদ। দেওয়াল লিখন, ফেস্টুন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পতাকায় ছেয়ে গিয়েছে বীরভূমের রামপুরহাট বিধানসভা কেন্দ্রের অধীনস্থ মহম্মদবাজারের এই অংশ। মূল রাস্তা থেকে কিছুটা ভিতরের দিকে, একচালায় বসে সার রাখার কয়েকটি প্লাস্টিকের বস্তা সেলাই-যন্ত্রে জুড়ছিলেন রীতা সূত্রধর। ভোট কাকে? প্রশ্ন শুনে মাথা না-তুলেই মহিলার উত্তর, ‘‘দিদিকেই!’’ কারণ কি লক্ষ্মীর ভান্ডার? জবাব এল, ‘‘নিশ্চয়ই।’’ বিজেপি কিন্তু বলছে অন্নপূর্ণা ভান্ডারের কথা। এ বার মুখ তুলে রীতা বললেন, ‘‘না আঁচালে যে বিশ্বাস নেই! পাচ্ছি আর পাব, দুটোর ফারাক অনেক!’’

অন্য ফারাকের কথা তুলছেন সিউড়ি বিধানসভা কেন্দ্রের সিউড়ি-১ ব্লকের নগরী এলাকার দুই আদিবাসী বধূ সোনালি হেমব্রম, কালী হেমব্রম। জামদই গ্রামের এই দুই মহিলাই মাধ্যমিক উত্তীর্ণ। ভাতায় উপকার হচ্ছে জানিয়েও তাঁদের প্রশ্ন স্থায়ী রোজগার নিয়ে। দু’জনেই বললেন, ‘‘ভাতার টাকায় কি সংসার চলে? হাতখরচ চলছে, অস্বীকার করব না। তবে, সেটুকুই। কিন্তু আমাদের কাজ চাই। সেটা কোথায়? স্বামীদের কেন বাইরে যেতে হচ্ছে?’’

বীরভূমে ভোটের প্রচারে রাজ্য সরকারের নানা ভাতার কথা নিয়মিত তুলে ধরছে তৃণমূল। দলের নেতা অনুব্রত মণ্ডল প্রতিটি জনসভায় বলে চলেছেন, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হারা মানে লক্ষ্মীর ভান্ডার, যুব সাথী-র মতো প্রকল্পের ভাতা বন্ধ হয়ে যাবে।’’ সিউড়ির তৃণমূল প্রার্থী উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায় বলছেন, ‘‘দিদি বাংলার মানুষকে ভরিয়ে দিয়েছেন। উনি না থাকা মানে বাংলায় অন্ধকার।’’ একই বক্তব্য বোলপুরের প্রার্থী, বিদায়ী মন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিংহের।

বাস্তবে কি লোকে ভাতা-নির্ভর যাপন চাইছে? হায়দরাবাদে মিষ্টি তৈরির কারখানায় কাজ করেন নানুরের চিৎগ্রামের ইন্দ্রজিৎ ঘোষ। বললেন, ‘‘শুধু ভাতা দিয়েসংসার চলবে না। হায়দরাবাদে কাজ করে মাসে ১৫-২০ হাজার টাকা উপার্জন করি। যেটা পশ্চিমবঙ্গেসম্ভব নয়। রাজ্যে ভাল কাজের সুযোগ পেলে অবশ্যই ফিরব।’’ সিউড়ি বিধানসভা কেন্দ্রের রাজনগরের তারাশোল গ্রামের ঠাকুরণ কিস্কু দিনমজুরি করেন। তিনি বলছেন, ‘‘লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা কাজে লাগে। কিন্তু, পেট চলে না। পেট চালাতে কাজ চাই। কাজ কোথায় আমার এলাকায়?’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘১০০ দিনের কাজ বহু বছর বন্ধ। তাই যে কাজ পাই, তা-ই করি।’’

ছোট্ট আদিবাসী গ্রাম রাজনগরের লাটুনতলা। ৫০টি পরিবার। দু’দিকে তৃণমূল এবং বিজেপির প্রচার।গ্রামে ঢোকার রাস্তার একটি অংশ ঢালাই হয়েছে। বাকি অংশ কাঁচা। অধিকাংশই মাটির বাড়ি। সরকারি আবাস প্রকল্পের সুবিধা পাননি অনেকে। গ্রামের একমাত্র শিশুশিক্ষা কেন্দ্রটি বন্ধ। তবে, লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা পাচ্ছেন প্রায় সকলেই। আদিবাসী মহিলাদের অন্যতম বাহামণি মুর্মু বলছেন, ‘‘তফসিলি শংসাপত্র না থাকায় ১২০০ টাকা পাই। কী হবে তা দিয়ে?’’ গ্রামের আর এক বধূ আরতি মুর্মুর ক্ষোভ, ‘‘ভাতায় উপকার হয়েছে ঠিকই। তবে বাড়ি-সহ নানা দিক থেকে আমরা বঞ্চিত।’’

মুদ্রার অন্য পিঠও আছে। রামপুরহাট বিধানসভা কেন্দ্রের সংখ্যালঘু-প্রধান সেকেড্ডা পঞ্চায়েত থেকে প্রায় সাড়ে ন’হাজার ভোটের ‘লিড’ গত বিধানসভা নির্বাচনে জিতিয়েছিল তৃণমূল প্রার্থীআশিস বন্দ্যোপাধ্যায়কে। এ বারও আশিস রামপুরহাট থেকে প্রার্থী। সেকেড্ডা এলাকার সোঁতশালে রাস্তা ঘেঁষা চায়ের দোকানে বসা দুই প্রৌঢ় অবশ্য বলছেন, ‘‘এসআইআর (ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন)-এর নামে বিজেপি যা করেছে, ওদের ভোট দেওয়ার প্রশ্ন নেই। বাম-কংগ্রেস বা অন্য কাউকে দিলে ভোট নষ্ট হবে। তাই, তৃণমূলকে ভোট দেব।’’

২০১১ সালের পর থেকেই বীরভূম তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি। গত বিধানসভা নির্বাচনেও জেলার ১১টি আসনের মধ্যে দুবরাজপুর বাদে বাকি ১০টিতে জিতেছিল তারা। পরিসংখ্যানবলছে, গ্রামীণ এলাকায় তৃণমূলের এগিয়ে থাকার নেপথ্যে মহিলা ও সংখ্যালঘু ভোট। ঘটনা হল, এসআইআর-পর্বের শেষ ধাপে ‘অযোগ্য’ হিসাবে চিহ্নিত ৮২ হাজার ভোটারের অধিকাংশ সংখ্যালঘু এবং মহিলা। আগের দুই পর্বে বাদ পড়েছে আরও প্রায় দু’লক্ষ নাম। এত নাম বাদ যাওয়ার কী প্রভাব ভোটের বাক্সে পড়বে, তা নিয়ে চিন্তায় জেলা তৃণমূলের নেতাদের অনেকেই। পক্ষান্তরে, বিজেপির বীরভূম সাংগঠনিক জেলা সভাপতি উদয়শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, ‘‘এসআইআরের ইতিবাচক প্রভাব আমাদের পক্ষে যাবে।’’ বিদায়ী বিধায়ক তথা দুবরাজপুরের বিজেপি প্রার্থী অনুপকুমার সাহার প্রত্যয়, ‘‘তৃণমূলের অপশাসন, দুর্নীতি থেকে বাংলাকে একমাত্র রক্ষা করতে পারে বিজেপি। মানুষ এটা বুঝেছেন।’’ ‘‘বিজেপি যা বলে, তা করে’’, বলছেন সিউড়ির বিজেপি প্রার্থী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়।

সিপিএমের জেলা সম্পাদক গৌতম ঘোষের দাবি, সংখ্যালঘু ভোট ভাগ হবে। জেলায় প্রভাব বাড়াচ্ছে আইএসএফ, এমআইএম-এর মতো দলগুলি। যদিও জেলা তৃণমূলের সহ-সভাপতি মলয় মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘‘বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের যৌথ উদ্যোগে যে ভাবে লক্ষ লক্ষ প্রান্তিক মানুষকে হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে, বিশেষত সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের, তাতে তৃণমূলছাড়া আর কোন দল পাশে দাঁড়িয়েছে? অন্য দলে ভোট দেওয়ার কথা তাঁরা ভাববেন কেন?’’ জেলা তৃণমূলের চেয়ারপার্সন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘তৃণমূল শুধু সংখ্যালঘুর ভোটে জেতে, এটা বিভ্রান্তিকর প্রচার। মুসলিম-হিন্দু, দুই সম্প্রদায়ের ভোটই সমান ভাবে পাব।’’

সংখ্যালঘু ভোট নিয়ে চর্চার পাশেই আলোচনায় রয়েছে অনুব্রত মণ্ডল এবং তৃণমূলের জেলা সভাধিপতি কাজল শেখের সমীকরণ।বিধানসভা ভোটের আগে জেলার দুই শীর্ষ নেতার সম্পর্কের ‘ফাটল’ আরও চওড়া হয়েছে বলে দলেই জল্পনা। কাজল এ বার প্রার্থী হাঁসন কেন্দ্র থেকে। তাঁর সমর্থনে সভা করেছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সে মঞ্চে ছিলেন অনুব্রত। কিন্তুতৃণমূলের অন্দরের চর্চা, ভোটে ঘুঁটি সাজানোয় জেলায় দলের কোর কমিটির আহ্বায়ক অনুব্রত ওরফে কেষ্টকে উপেক্ষা করে কাজলকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গোষ্ঠীদ্বন্দ্বেতৃণমূলের কাছে আপাত ‘নিরাপদ’ আসন হিসাবে পরিচিত মুরারই, হাঁসন এবং নলহাটিতে ব্যবধান কমতে পারে, মনে করছেন দলের নেতাদের একাংশই।

এসআইআর-উত্তর বীরভূমে ভাতা-রাজনীতিকে কোন চোখে দেখা হবে, তৃণমূলের মহিলা এবং সংখ্যালঘু ভোট অটুট থাকবে কিনা, কেষ্ট-কাজল সমীকরণের উত্তর কী বেরোয়, এমন ধাঁধা রয়েছে অনেক। সাক্ষী রীতা, ঠাকুরণেরা।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Birbhum West Bengal Politics TMC BJP

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy