‘ওরা খাতা খুলতে পারবে না’, মোদীর বচন সত্য ৯ জেলায়

তৃণমূলের জোট-সঙ্গী হিসাবে পাহাড়ে ভোটের দায়িত্বে থাকা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চার নেতা তথা গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান অনীত থাপা বলেন, ‘‘সামগ্রিক ভাবে প্রতিষ্ঠান বিরোধী ভোট হয়েছে। তাই আমরা জিততে পারিনি।’’

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ০৫ মে ২০২৬ ০৮:২৭
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। — ফাইল চিত্র।

‘‘এ বারের ভোটে অনেক জেলায় তৃণমূল খাতা খুলতে পারবে না’’, প্রচার-পর্বে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এই দাবি কার্যত সত্য বলে প্রমাণিত হল উত্তর থেকে দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায়।

উত্তরবঙ্গের চার জেলায় কোনও আসন পায়নি তৃণমূল বা তাদের ভোট-সঙ্গীরা। সব বিধানসভা আসনে পদ্ম ফুটেছে আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং এবং কালিম্পংয়ে। আলিপুরদুয়ারের পাঁচটি, জলপাইগুড়ির সাতটি, দার্জিলিঙের পাঁচটি ও কালিম্পংয়ের একটি আসনে বিজেপি জিতেছে। দুর্নীতি না গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, কেন শূন্য হল তৃণমূল, তা নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে সোমবার বেলা গড়াতেই। তবে ঘনিষ্ঠ মহলে তৃণমূল নেতারাও মানছেন, একাধিক কৌশলে তাঁদের টেক্কা দিয়েছে বিজেপি। দার্জিলিং পাহাড়ে এক সময়ের ‘আন্দোলনের মুখ’ বিমল গুরুঙ্গকে সঙ্গে রাখা যদি তার এক দিক হয়, উত্তরবঙ্গে এমসের মানের হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, রেল, চা, মালদহের আম নিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি, অন্য দিক।

তৃণমূলের জোট-সঙ্গী হিসাবে পাহাড়ে ভোটের দায়িত্বে থাকা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চার নেতা তথা গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান অনীত থাপা বলেন, ‘‘সামগ্রিক ভাবে প্রতিষ্ঠান বিরোধী ভোট হয়েছে। তাই আমরা জিততে পারিনি।’’ তৃণমূল সূত্রের দাবি, বিভিন্ন প্রকল্পে ‘কাটমানি’ নেওয়া এবং নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ দলের বিরুদ্ধে গিয়েছে। তবে শিলিগুড়ি পুরসভার তৃণমূলের মেয়র তথা সংশ্লিষ্ট বিধানসভার পরাজিত প্রার্থী গৌতম দেব বলেন, ‘‘ভোটার তালিকায় সংশোধনের প্রক্রিয়ায় অনেক নাম বাদ পড়েছে। আরও কিছু কারণ আছে। নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।’’ পক্ষান্তরে, জলপাইগুড়ির বিজেপি সাংসদ জয়ন্ত রায়ের মন্তব্য, “বাংলায় এত দিন মানুষ ভোট দিতে ভয় পেতেন। এ বার অবাধ ভোট হয়েছে। পাশাপাশি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিতে মানুষ ভরসা করেছেন।’’

রাজনৈতিক মহল মনে করাচ্ছে, ২০২০ সালে তৃণমূল ছেড়ে শুভেন্দু অধিকারী যোগ দেওয়ার পরে, বিজেপির ক্ষমতা উত্তরোত্তর বেড়েছে পূর্ব মেদিনীপুরে। গত লোকসভা ভোটের ফলাফলের নিরিখে পটাশপুর ছাড়া, জেলার বাকি ১৫টি আসনে এগিয়েছিল বিজেপি। তার পরেও ঘর গোছাতে পারেনি তৃণমূল। উল্টে, উত্তম বারিক এবং অখিল গিরি শিবিরের দ্বন্দ্বে পর্যুদস্ত হয়েছে জোড়াফুল। এ বার উত্তম ও অখিল হেরেছেন। ফল বিজেপির পক্ষে ১৬-০। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, ভাতার পরিবর্তে কর্মসংস্থানের দাবি, শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মতো বিষয়ে জনমত গঠনে বিজেপি সফল। শুভেন্দুর রাজ্য বিজেপির অন্যতম মুখ হয়ে ওঠাও বিজেপির এমন ফলের পক্ষে সহায়ক হয়েছে।

পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ও ঝাড়গ্রামেও খাতা খুলতে পারেনি তৃণমূল। পুরুলিয়ার ন’টি, বাঁকুড়ার ১২টি ও ঝাড়গ্রামের চারটি আসনে শুধুই পদ্ম-প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জঙ্গলমহলের বড় অংশের ভোটার জনজাতি ও কুর্মি সম্প্রদায়ের। এ বার নির্বাচনে আদিবাসী কুর্মি সমাজের পদ্ম প্রার্থীদের সমর্থন, বিজেপির জয় সহজ করেছে। আদিবাসী কুর্মি সমাজের মূল মানতা অজিত মাহাতোর ছেলেকে বিজেপি তাদের প্রার্থী করেছিল। অন্য দিকে, বিপুল সংখ্যক পরিযায়ী শ্রমিকদের এলাকায় কর্মসংস্থানের অভাবের ক্ষোভও তৃণমূলের বিপক্ষে গিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। কিছু কেন্দ্রে দলীয় প্রার্থী পছন্দ না হওয়ায়, তৃণমূলের অন্দরে অন্তর্ঘাতের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

পশ্চিম বর্ধমানে ২০২১ সালে ন’টি আসনের মধ্যে তৃণমূল ছ’টি ও বিজেপি তিনটি আসনে জিতেছিল। এ বার সব ক’টায় জিতেছে বিজেপি। তৃণমূলের নিচুতলার একাংশের দাবি, দলের নেতাদের অনেকের ‘ঔদ্ধত্য’ মানুষের থেকে দূরে ঠেলছিল। গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের সমস্যা রয়েছে। কিছু তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে স্থানীয় কারখানায় টাকার বিনিময়ে বহিরাগতদের কাজে ঢোকানোর অভিযোগ দলের বিরুদ্ধে গিয়েছে। তৃণমূলের অন্যতম রাজ্য সাধারণ সম্পাদক ভি শিবদাসনের কথায়, ‘‘কিছু নেতার অহঙ্কার, দলের পরিবর্তে নিজের স্বার্থসিদ্ধি করার মানসিকতা বিরুদ্ধে গিয়েছে।’’ পাণ্ডবেশ্বরের জয়ী বিজেপি প্রার্থী জিতেন্দ্র তিওয়ারি বলেন, ‘‘নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে বাংলা আবার ঘুরে দাঁড়াবে। আবার শিল্প হবে, বেকারেরা কাজ পাবেন, মেয়েরা সুরক্ষিত থাকবেন— এই নিশ্চয়তার পক্ষে পশ্চিম বর্ধমানের মানুষ বিজেপিকে সমর্থন করেছেন।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Narendra Modi BJP

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy