E-Paper

বিজেপির কঠিন বাংলা, ভাগাভাগির ভোট অঙ্কেই কি নিশানায় ইস্তাহার

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্বের অধ‍্যাপক সুনন্দন সেনের মতে, “বাংলার ইস্তাহার উর্দু নয়, আরবি ইশতিহার থেকে আহৃত। বাংলার সঙ্গে ফার্সির সংযোগ থেকে তা আমাদের শব্দ-ভাঁড়ারে মিশেছে। যা আরও অগুনতি শব্দের ক্ষেত্রে ঘটেছে।”

ঋজু বসু

শেষ আপডেট: ০২ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৩১

— প্রতীকী চিত্র।

শুধু অঙ্ক নয়, বাংলা ভাষা বড়ই কঠিন! ঢাকাইয়া থেকে মানভূমি, এমনকি বাগবাজারী থেকে বালিগঞ্জী বাংলা ভাষার ফারাক একদা বাঙালিকে বুঝিয়েছিলেন খোদ পবনপুত্র হনুমান। বাঙালির রসসাহিত‍্যের অবতার পরশুরামের ‘রামরাজ‍্য’ গল্পে রামরাজ‍্যের ভাষা হিন্দি বলে মানতে রাজি হননি হনুমানজি। উপস্থিত চরিত্রদের বোঝার সুবিধায় তিনি কথা বলেন নির্ভেজাল ‘ভবানীপুরী বাংলায়’।

এই ২০২৬-এর ভোটকালীন বাংলায় অন‍্যতম প্রধান প্রতিস্পর্ধী বিজেপির বাংলা জ্ঞান নিয়ে ফের প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। তৃণমূলের ভোট প্রচারের ইস্তাহার প্রকাশরত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি দেখিয়ে ‘ইস্তাহার’ একটি উর্দু শব্দ বলে প্রচারের ঢাক পেটাচ্ছে বিজেপি। রাজ‍্য বিজেপির মতে, ‘‘ম্যানিফেস্টোর বাংলা হল ঘোষণাপত্র। ইস্তাহার বলে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে অবমাননা করা হচ্ছে।’’ ভোটের আগে বাংলার মনীষীদের ডাকাডাকির মতো এই ‘সহি’ বা শুদ্ধ বাংলা চর্চাও অপ্রত‍্যাশিত নয়। তার উপরে বহিরাগত বা গোবলয়ের দল তকমাধারী বিজেপির তরফে বাঙালিয়ানা প্রচার স্বাভাবিকই ঠেকছে। তা বলে ইস্তাহারকে বাংলা থেকে বিসর্জনে একমত নন ভাষাবিদেরা।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্বের অধ‍্যাপক সুনন্দন সেনের মতে, “বাংলার ইস্তাহার উর্দু নয়, আরবি ইশতিহার থেকে আহৃত। বাংলার সঙ্গে ফার্সির সংযোগ থেকে তা আমাদের শব্দ-ভাঁড়ারে মিশেছে। যা আরও অগুনতি শব্দের ক্ষেত্রে ঘটেছে।” ‘ঘোষণাপত্র’ সংস্কৃত থেকে আসা ঘোষণা এবং পত্রের সমাসবদ্ধ রূপ। সুনন্দনের কথায়, “আমরা অনেকেই ভূমি বা ভুঁই নয়, জমি; বায়ু বা বাতাস নয়, হাওয়া বলে থাকি। লাল বলি, রাঙা বলি না! তেমনই ঘোষণাপত্র নয়, ইস্তাহারই বহুল প্রচলিত।” তাঁর মতে, “কে তৎসম বলবে আর কে আরবি, ফার্সি থেকে পাওয়া শব্দ, তা নিয়ে জোরাজুরি চলে না। ফার্সির নানা উপসর্গ, প্রত‍্যয় পর্যন্ত বাংলায় ঢুকে ভাষার শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত। সেটা তো অস্বীকার করা যাবে না।”

ইন্ডিয়ান স্ট‍্যাটিস্টিক‍্যাল ইনস্টিটিউটের ভাষাতত্ত্বের অবসরপ্রাপ্ত অধ‍্যাপক প্রবাল দাশগুপ্তও এই নতুন করে খুঁচিয়ে তোলা ‘জল-পানির’ রাজনীতি খারিজ করছেন। প্রবাল মনে করাচ্ছেন, হিঁদুয়ানি বা মুসলমানির গন্ধে ভরা জল এবং পানি, দুটোই আদতে সংস্কৃত থেকে বাঙালি পেয়েছে।সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, গ্রিয়ারসন, সুকুমার সেনেরা বিভিন্ন ভারতীয় ভাষাকে কয়েকটি বর্গে ভাগ করেছিলেন। আজকের বাংলা, হিন্দি, গুজরাতি, মরাঠি, ওড়িয়াও সংস্কৃত থেকে প্রাকৃত ও অপভ্রংশ হয়ে গড়ে উঠেছে বলে তাঁদের অভিমত। প্রবাল বলছেন, “উর্দু আর হিন্দিও কিন্তু লিপির ফারাক ছাড়া কার্যত এক ভাষা বলেই অনেকে দেখেন। উর্দুতে আরবি, ফার্সির প্রভাব বেশি থাকলেও তা আদতে সংস্কৃতের থেকে দূরের বলা যাবে না।”

ভোটের বাজারে বিজেপির এই উর্দু বনাম বাংলা লড়িয়ে দেওয়া উল্টে বাংলা ভাষার বৈচিত্র‍্যই মুছতে চাইছে বলে মনে করছেন অনেকে। আবার, বিজেপির রাজনীতির সূত্রেই নমোকে নমন, আধিকারিককে প্রভারী, খবরকে সূচনা, আলোচনাকে চিন্তন, পথ দেখানোকে মার্গদর্শনের মতো অশ্রুতপূর্ব বাংলা চাপানো হচ্ছে বলে কেউ কেউ প্রমাদ গুনছেন।

গরিব, প্রান্তিক পশ্চিমবঙ্গবাসীকে বাংলাদেশি বলে ‘পুশব‍্যাকের’ সময়ে বিজেপির অমিত মালব‍্যর ভাষাতত্ত্ব বাংলা ভাষার অস্তিত্বই কার্যত বাতিল করতে বসেছিল। তবে, এই ভাষা-বিভ্রাট বিজেপির একচেটিয়াও বলা যাবে না। ফিরহাদ হাকিম উর্দুর মহিমা কীর্তনে মুখর হয়েছেন। তাতে ক্ষুব্ধ বাঙালি মুসলিম সমাজ। রেড রোডে ইদের নমাজে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলা না বলে হিন্দি বক্তৃতা নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে বাঙালি মুসলিমদের। ভাষার খোপে হিন্দু, মুসলিমকে পুরে ফেলার বিভাজন-কৌশলই এখন ভোটের তাস।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

BJP Bengali Language

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy