ভরা বর্ষার দ্বারকেশ্বর নদের মতোই ফুঁসছেন নদীপারের বাসিন্দারা। বালির অবৈধ কারবারেই জীবন জেরবার হয়ে যাচ্ছে, গজরাচ্ছেন তাঁরা।
বিষ্ণুপুর, কোতুলপুর, ইন্দাস, ওন্দা ও বাঁকুড়া বিধানসভা কেন্দ্রের বিভিন্ন এলাকায় দ্বারকেশ্বর নদ থেকে বালি তোলার রেওয়াজ দীর্ঘদিনের। কিন্তু দ্বারকেশ্বরের কোল ঘেঁষে থাকা গ্রামগুলির বাসিন্দাদের অভিযোগ, আগেও বালি চুরি চলত। কিন্তু, গত এক দশকে বৈধ বালিঘাটের কারবারের আড়ালে অবাধে বালি চুরি চলছে। কেউ আটকায় না। তাঁরা জানালেন, অপরিকল্পিত ভাবে বালি তোলায় নদীর গতিপথ বদলাচ্ছে, ভাঙছে পাড়, তলিয়ে যাচ্ছে কৃষিজমি। নিয়ম ভেঙে গাড়িতে অতিরিক্ত বালি বহনের ফলে ভাঙছে রাস্তা। ইদানীং যন্ত্রে বালি তোলা শুরু হওয়ায় স্থানীয়দের বালিঘাটে কাজ দেওয়াও এক প্রকার বন্ধ। সব মিলিয়ে ভোটের মুখে বালির কারবার ঘিরে তেতে রয়েছে এলাকা।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, বালিঘাটে শাসকদলের স্থানীয় নেতাদের মাতব্বরি চলছে। তবু বিরোধীরা চুপ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জনের ক্ষোভ, ‘‘হাত মিলিয়ে সব পক্ষই আসলে বালি থেকে লুটেপুটে খাচ্ছে।’’
বিষ্ণুপুরে দ্বারকেশ্বর নদে একটি বালিঘাটের ইজারাদার মানছেন, শুধু বৈধ ঘাটের বালি দিয়ে তাঁর ব্যবসা চলে না। তাঁর দাবি, ‘‘এক সিএফটি (ঘনফুট) বালি ৩৫ টাকা দরে বিক্রি করলে লাভ থাকে চার টাকা। বাকি ৩১ টাকা প্রশাসন-পুলিশের নজরানা, রাজনৈতিক দলের চাহিদা মেটাতেই লেগে যাচ্ছে। ভোটের বাজারে ব্যবসা-পরিস্থিতি আরও খারাপ।’’
বিষ্ণুপুরের প্রকাশঘাটে দ্বারকেশ্বরের উপরে সেতুর দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু, আজও তা হয়নি। নদ পারাপারে প্রতি বার অস্থায়ী রাস্তা হলেও, এ বার তা বেশ পোক্ত ভাবে করা হয়েছে। তাতে অবশ্য খুশি হওয়ার বদলে ক্ষুব্ধ স্থানীয় ঝন্টু লোহার, রাজু লোহারেরা। বলছেন, ‘‘এই রাস্তা কি আসলে আমাদের জন্য হয়েছে? এ বার আশপাশে অনেক বালিঘাট খুলেছে। তাই বালির গাড়ি পারাপারের জন্য মজবুত রাস্তা করেছে সরকার। বর্ষায় বালি তোলা বন্ধ থাকে। তখন নদীর জলের তোড়ে ওই রাস্তা ভেঙে গেলেও ওদের অসুবিধা হয় না। কিন্তু আমরা তখন রোগীকে হাসপাতালে পাঠানোর পথ খুঁজে পাই না। আমাদের নিয়ে গরজ থাকলে, এত দিনে পাকা সেতু করে দিত।’’
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে প্রশাসনিক বৈঠকে গ্রামীণ রাস্তা দিয়ে বালির ট্রাক, ডাম্পার চলায় রাস্তা ভেঙে যাওয়া নিয়ে একাধিক বার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সে কথা মনে করানোয় ফুঁসে ওঠেন ইন্দাস বিধানসভা কেন্দ্রের দ্বারকেশ্বর লাগোয়া ঘাটিপাড়া, চুয়াডাঙা, ন’নগর, ধবলপুরের বাসিন্দারা। ডিঙ্গলের নেপাল পালের কথায়, ‘‘বালি বোঝাই ডাম্পার চলাচলে গ্রামের রাস্তা ভেঙে দশ বছর জল-কাদায় ভরে ছিল। গত বছর ‘পথশ্রী’ প্রকল্পে রাস্তা হল। বালিঘাট খুললেই আবার ওভারলোড (বহন ক্ষমতার অতিরিক্ত বালি বোঝাই) ট্রাক, ডাম্পার চলবে। রাস্তা ভাঙবে। ঠেকাবে কে?’’ সরকারি নিষেধ সত্ত্বেও ইন্দাসের সামরোঘাটের সেতুর কাছেই যন্ত্রে বালি তুলতে দেখা গিয়েছে। নদীর পাড়ে থাবা বসিয়েছে ভাঙন। চাষিদের আশঙ্কা, আস্তে আস্তে নদীর পারে তাঁদের চাষের জমিও দ্বারকেশ্বর গিলবে।
কোতুলপুর বিধানসভা কেন্দ্রের জয়পুরের বসানিপাড়া ঘেঁষে দ্বারকেশ্বর পার হত হাতিরা। সেখানে যন্ত্রে বালি তোলায় নদী-গর্ভে বড় বড় গর্ত হয়েছে। ভীম বসানি, ধরণী বসানিরা বলছেন, ‘‘গর্তে পড়ার ভয়ে হাতিরা চেনা পথ ছেড়ে গ্রামের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে। চাষের জমি মাড়িয়ে ফসলের সর্বনাশ করছে। আমরা কোথায় সরে যাব?’’
ভোটের ময়দানে এলাকায় ক্ষোভের আঁচ পেয়ে যুযুধান দলের নেতারা পরস্পরের দিকে আঙুল তুলছেন। বিজেপির কোতুলপুর মণ্ডল (৩) সভাপতি নবকুমার চক্রবর্তীর দাবি, “বালি চুরির বিরুদ্ধে আন্দোলন করায় আমাদের কর্মীদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে।’’ বিষ্ণুপুর পঞ্চায়েত সমিতির সহ-সভাপতি, তৃণমূলের দোলগোবিন্দ পরামানিকের দাবি, “বিজেপির লোকেরাই বালিঘাট থেকে টাকা তুলছে।’’ ইন্দাস, কোতুলপুর, বিষ্ণুপুর, ওন্দা ও বাঁকুড়া— এই পাঁচ বিধানসভা কেন্দ্রেই গত বার বিজেপি জিতেছিল। তা হলে কেন এই অবস্থা? বিষ্ণুপুরের বিজেপি সাংসদ সৌমিত্র খাঁ দাবি করছেন, “পুলিশ-প্রশাসন তৃণমূলের কথায় চলছে। তাই বালি চুরি বন্ধ হচ্ছে না।’’ ওন্দায় তৃণমূল প্রার্থী সুব্রত দত্তের পাল্টা দাবি, ‘‘মাসখানেক আগে বর্ধমানে বালিঘাট থেকে টাকা তুলে আসার পথে ধরা পড়েন বিষ্ণুপুরের সাংসদের ঘনিষ্ঠেরাই। এর পরেও ওঁরা তৃণমূলের দিকে আঙুল তোলেন কোন মুখে!’’ জেলা পুলিশ এবং প্রশাসনের কর্তাদের দাবি, বালির অবৈধ কারবারের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলে। রাজস্ব আদায়ও করা হয়।
শুধু বালির কারবার নিয়ে নয়, বিদায়ী বিধায়কদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গের ক্ষোভও রয়েছে বিষ্ণুপুর এবং কোতুলপুরে। বিষ্ণুপুরের তন্ময় ঘোষ ও কোতুলপুরের হরকালী প্রতিহার বিজেপির টিকিটে জিতে পরে তৃণমূলে গিয়েছেন। এ বার দু’জনেই তৃণমূলের প্রার্থী। অন্য দিকে, ইন্দাস, ওন্দা ও বাঁকুড়া কেন্দ্রে বিজেপি তিন বিদায়ী বিধায়ক— নির্মল ধাড়া, অমরনাথ শাখা ও নীলাদ্রিশেখর দানাকেই প্রার্থী করেছে। গত বারের হারা আসন ইন্দাস, ওন্দা ও বাঁকুড়ায় তৃণমূল প্রার্থী করেছে যথাক্রমে শ্যামলী রায় বাগদি, সুব্রত দত্ত এবং সদ্য দলে যোগ দেওয়াচিকিৎসক অনুপ মণ্ডলকে। তবে, গত লোকসভা ভোটের নিরিখে ইন্দাস ছাড়া বাকি চার কেন্দ্রে বিজেপি-ই এগিয়ে ছিল। পাঁচ কেন্দ্রেই তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব রয়েছে।
তৃণমূলের জেলা সভাপতি সুব্রত দত্তের মন্তব্য, ‘‘সবাই জানেন, সব কেন্দ্রে আসলে এক জনই প্রার্থী— মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে মানুষ জোড়া ফুলেই ছাপ দেবেন।’’ বিজেপির প্রাক্তন জেলা সভাপতি তথা ওন্দার প্রার্থী অমরনাথের আশা, ‘‘বঞ্চনা আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানুষের জমে থাকা ক্ষোভ ইভিএমে ছাপ ফেলবেই। রাজ্যে পরিবর্তন অনিবার্য।’’
‘‘পরিবর্তন কিসে হবে জানেন? আমাদের গ্রামগুলির ভিতর দিয়ে যদি ওই ওভারলোড করা বালির ট্রাক-ডাম্পার আর চলতে না দেখি’’, বলছেন বিষ্ণুপুরের ঝন্টু, কোতুলপুরের ভীমেরা।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)