নেতারা ব্যস্ত অস্তিত্ব আর দল রক্ষায়, ক্ষুব্ধ রাজু-শিবেনরা

কালিম্পং থেকে পেশক, লামাহাটা, তাকদা, জোড়বাংলো হয়ে দার্জিলিং ঢোকার মুখে ঘুম জনপদ।

কৌশিক চৌধুরী

শেষ আপডেট: ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ১০:১৮
বিমল গুরুং এবং অনীত থাপা।

বিমল গুরুং এবং অনীত থাপা।

শিলিগুড়ি থেকে পাহাড়ি পথে সেবক, কালিঝোরা, তিস্তা বাজার হয়ে কালিম্পংগামী ১০ নম্বর জাতীয় সড়ক। পথের ধারের গ্রাম তাশিডিং। রাস্তার পাশে ছোট্ট মোমো এবং চাউমিনের দোকান। কয়েক হাত দূর দিয়ে জনা বিশেক লোক নিয়ে হেঁটে গ্রামে যাচ্ছেন কালিম্পঙের বিজেপি প্রার্থী তথা ভারতীয় হকি দলের প্রাক্তন অধিনায়ক ভরত ছেত্রী। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, নির্মাণ শ্রমিক রাজু শঙ্কর বললেন, ‘‘উনি (ভরত) পরিচয় রক্ষা করতে লড়ছেন। এখানে আসলে সবাই লড়ছে। নেতারা নিজেদের বাঁচাতে, দল বাঁচাতে লড়ছেন। আমাদের অস্তিত্ব শুধু ভোটার স্লিপে। ভোটদাতা কিনা প্রমাণের জন্য এ বার এসআইআর (‌ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন)-এর সময়ে যেমন লড়তে হল!’’

কালিম্পং থেকে পেশক, লামাহাটা, তাকদা, জোড়বাংলো হয়ে দার্জিলিং ঢোকার মুখে ঘুম জনপদ। সেখানে মুদির দোকানি নরবাহাদুর তামাং যন্ত্রে চাল মাপতে মাপতে বলেন, ‘‘পাহাড় পাহাড়ের মতোই আছে। জলসঙ্কট মেটেনি, রাস্তা চওড়া হয়নি, যানজট কাটেনি। জাতিসত্তা নিয়ে আবেগ মনের কোণেই আছে। ভোটে নেতারা লড়ছেন নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচাতে। জনতা নিজেদের দৈনন্দিন অস্তিত্ব রক্ষায় ব্যস্ত।’’

পাহাড়ের এলাকায় এলাকায় ফ্লেক্স, পতাকা, পোস্টারের টক্কর নেই বললেই চলে। চৌরাস্তা ও লেবংয়ে হাতেগোনা সভা ছাড়া, বড় সভা নেই। বাড়ি-বাড়ি, মহল্লা, গ্রামে যুযুধানেরা ঘুরে ঘুরে প্রচার করছেন। বাতাসিয়া থেকে ঘুমে ঘুরছেন গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সভাপতি বিমল গুরুং। বিজেপির সঙ্গে নতুন করে জোটে ফিরেছেন। বিজনবাড়ি, চুংথাং, মেরিবং বা তামসাঙের মতো নিজের সংগঠন থাকা এলাকায় ঘুরছেন বিমল। বিজেপির প্রতীকে তাঁর যুব নেতা নোমেন রাই দার্জিলিং আসনে লড়ছেন। ২০১৭ সালের পরে সাড়ে তিন বছর অজ্ঞাতবাসে কাটিয়ে পাহাড়ে ফিরলেও গুরুংয়ের সংগঠন কার্যত তলানিতে। দল-সংগঠনের সঙ্গে নিজের অস্তিত্ব বাঁচাতে মরিয়া গুরুংকে ছোট সভাতেও বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘‘দার্জিলিঙে হারলে রাজনীতি ছেড়ে দেব।’’

কার্শিয়াঙে বিজেপি প্রার্থী দলেরই স্থানীয় নেতা সোনাম লামা। যাঁর পরিচিতির বিস্তার নিয়ে দলের অন্দরে প্রশ্ন রয়েছে। আগের বারের বিজেপি বিধায়ক বিষ্ণুপ্রসাদ শর্মা গিয়েছেন তৃণমূলে। যদিও দুই জেলার দার্জিলিং, কার্শিয়াং ও কালিম্পং আসনে রাজ্যের শাসকদলের অস্তিত্ব এ ভোটে নেই। প্রচারেও নেই নেতা-নেত্রীরা। পাহাড় সামলাচ্ছে তৃণমূলের সহযোগী প্রজাতান্ত্রিক মোর্চা। ‘‘গুরুংয়ের রাজনীতি ছাড়়াই উচিত’’, মনে করছেন একদা তাঁর ‘ডান হাত’ বলে পরিচিত প্রজাতান্ত্রিক মোর্চার বর্তমান সভাপতি অনীত থাপা। ২০১৭-র আগে গুরুংয়ের সঙ্গীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ এখন অনীতের সঙ্গে। গুরুং-ঘনিষ্ঠ আর এক নেতা অমর লামা অনীতের কার্শিয়াঙের প্রার্থী। পাহাড়ের জন্য পৃথক স্কুল সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান তথা সাহিত্যিক বিজয়কুমার রাই দার্জিলিঙের প্রার্থী। কালিম্পঙে গত বারের বিধায়ক রুদেন সাদা লেপচার উপরেই ভরসা রেখেছেন অনীত।

কার্শিয়াঙে নিজের বাড়ির অদূরে একটি দফতর থেকে পাহাড়ে ভোট পরিচালনা করছেন জিটিএ-প্রধান। পঞ্চায়েত, পুরসভা, ‘গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’-এর ভোটে সাফল্য পেলেও পাহাড়ের বাইরে লোকসভা, বিধানসভা ভোটে তেমন সাফল্য নেই অনীতের। গত বিধানসভা নির্বাচনে কালিম্পংয়ে জিতলেও দার্জিলিং, কার্শিয়াঙে গুরুংয়ের গোষ্ঠীর প্রার্থীর সঙ্গে ভোট কাটাকুটিতে হেরেছেন। লোকসভা ভোটে বিজেপির জয়ের ব্যবধান কমিয়েছেন। এ বার তাঁরও পাহাড়ের বাইরে অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই। বলছেন, ‘‘পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছি। গোর্খাদের পরিচিতি, অস্তিত্বের কথা এ বার পাহাড়ের বাইরে বিধানসভায় বেশি করে পৌঁছতে হবে।’’

পাহাড়ে আরও এক রাজনৈতিক চরিত্র, ‘গোর্খা জনশক্তি ফ্রন্ট’-এর নেতা অজয় এডওয়ার্ড। হামরো পার্টি তুলে দিয়ে নতুন দল গড়েছেন। নিজে দার্জিলিঙে দাঁড়িয়েছেন, বাকি দু’টি কেন্দ্রে প্রার্থী দিয়েছেন। ভোট কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করার বেশি ক্ষমতা অজয়ের এই মুহূর্তে পাহাড়ে রয়েছে কিনা, সেই হিসাবও চলছে। তবে গাড়িধুরা, রোহিণী, পানিঘাটা থেকে সমতলে নামতেই ছবিটা পাল্টায়। গেরুয়া, তেরঙা পতাকা, ফ্লেক্সের ছড়াছড়ি। মিছিল, জনসভা চলছেই। দার্জিলিং সমতলের শিলিগুড়ি, মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি এবং ফাঁসিদেওয়া— তিন আসনেই গত বার জিতেছিল বিজেপি। পুরনো তিন বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ, আনন্দময় বর্মণ এবং দুর্গা মুর্মুকে তারা প্রার্থী করেছে। এসআইআর-আবহে ফাঁসিদেওয়ায় সংখ্যালঘু প্রভাবিত এলাকাগুলিতে ভাল ফলের আশায় তৃণমূলের প্রার্থী রিনা টোপ্পো এক্কা।

শিলিগুড়ি আসনে তৃণমূলের প্রার্থী গৌতম দেব রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী। গত বিধানসভা ভোটে শহরের পাশের আসন ডাবগ্রাম-ফুলবাড়িতে হারের পরে শিলিগুড়ি পুরসভার মেয়র। এ বার দল কার্যত তাঁকে শিলিগুড়ি ‘উদ্ধারের’ দায়িত্ব দিয়েছে। জিতলে পুরস্কার আসতে পারে। তবে, হারলে কী হবে, স্পষ্ট নয়। গৌতম বলছেন, ‘‘শিলিগুড়ির মানুষকে নিয়ে এগোতে চাই। তাই চাইছি, সবার আশীর্বাদ।’’ একই অবস্থানে দাঁড়িয়ে শিলিগুড়ির বিদায়ী বিজেপি বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ। জিতলে বা বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় এলে চিন্তা থাকবে না। কিন্তু প্রত্যাশিত ফল না হলে অনিশ্চয়তা। কারণ, ২০২২ সালের পুরভোটেই শিলিগুড়িতে বিজেপির চেনা হিসাব মেলেনি। শঙ্কর বলছেন, ‘‘তৃণমূল যা-ই করুক, শিলিগুড়ির মানুষ কাদের সঙ্গে রয়েছেন, তা পর পর বড় ভোটে প্রমাণিত। এ বারেও অন্যথা হবে না।’’

ভোটের ময়দানে সিপিএম এবং কংগ্রেস থাকলেও সিপিএম উল্লেখযোগ্য শিলিগুড়িতেই। বর্ষীয়ান সিপিএম নেতা অশোক ভট্টাচার্য প্রকাশ্যেই বলছেন, শিলিগুড়ির সিপিএম প্রার্থী শরদিন্দু চক্রবর্তী ওরফে জয় তাঁর স্বচ্ছ ভাবমূর্তির জোরে বামের ভোট রাম থেকে ফিরিয়ে আনতে পারবেন। কার্যত তা হলে, শঙ্করের সমস্যা বাড়বে। দার্জিলিং সমতলের প্রবীণ নেতা শঙ্কর মালাকার কংগ্রেসের হাত ছেড়ে এ বার তৃণমূলে। মাটিগাড়া-নকশালবাড়িতে জোট রাজনীতির সুফলে দুই দফায় (২০১১ সালে তৃণমূল, ২০১৬ সালে সিপিএম) জয়ী এই শঙ্কর জানেন, এ বারের লড়াইয়ের ফল ঠিক করবে তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা কতটা দীর্ঘায়িত হবে।মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি বিধানসভা কেন্দ্রের নেপাল সীমান্তের খড়িবাড়ি এলাকায় পানের দোকান শিবেন অধিকারীর। বললেন, ‘‘ভোটার তালিকায় নাম তুলতে দু’দফায় সরকারি দফতরের চক্কর কাটার পরে নাম উঠেছে তালিকায়। আর একটু হলে হয়তো ভিন্‌দেশি বলে নেপালে চলে যেতে হত! অস্তিত্ব সঙ্কটে ছিল। কোনও মতে বেঁচেছি।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Darjeeling Bimal Gurung Anit Thapa

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy