এসআইআরে বাদ ৪৬ হাজার নামেই কি নির্ভরশীল উত্তর দমদমের ভবিষ্যৎ

অতীতের ভোট ফলাফলের নিরিখে তৃণমূল ও বিজেপিকে ঘিরেই জনমানসে উৎসাহ থাকার কথা ছিল। এ বার সেখানেই প্রাসঙ্গিক বাম। ২০১১ সালে এই কেন্দ্রে জয়ী হয় তৃণমূল।

আর্যভট্ট খান , কাজল গুপ্ত

শেষ আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩৮

—প্রতীকী চিত্র।

‘ডিডিকে বলো’, শুনে চায়ে চুমুক দিতে গিয়ে থমকে গেলেন এক বৃদ্ধ। ভাবলেন, উচ্চারণে অস্পষ্টতা। কিন্তু তা নয়। ফের স্পষ্ট ভাবে শুনলেন।

কী ব্যাপার?

এই ডিডি হলেন দীপ্সিতা ধর। উত্তর দমদম বিধানসভায় বামেদের এ বারের প্রার্থী তরুণ তুর্কি এই মুখ। প্রার্থীর কাছে অভিযোগ জানাতে বামেরা একটি কিউআর কোড চালু করেছে। যার পোশাকি নাম— ‘ডিডিকে বলো।’ কোড স্ক্যান করলে ওয়টস্যাপ নম্বর মিলবে। যেখানে এলাকা নিয়ে অভিযোগ জানাতে পারবেন বাসিন্দারা। প্রার্থীর দাবি, ইতিমধ্যে দুই শতাধিক অভিযোগও জমা পড়েছে।

অতীতের ভোট ফলাফলের নিরিখে তৃণমূল ও বিজেপিকে ঘিরেই জনমানসে উৎসাহ থাকার কথা ছিল। এ বার সেখানেই প্রাসঙ্গিক বাম। ২০১১ সালে এই কেন্দ্রে জয়ী হয় তৃণমূল। ২০১৬ সালে সাড়ে ৬ হাজারেরও বেশি ভোটে জয়ী হন বাম প্রার্থী। কিন্তু ২০২১-এ তৃণমূল জয়ী হয় ২৮ হাজারেরও বেশি ভোটে। দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে বিজেপি। বামেরা হয় তৃতীয়। অবশ্য তার আগে ২০১৯ ও ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে জয়ী হয় তৃণমূল। দ্বিতীয় স্থানে বিজেপি। তবে ব্যবধান বেশি ছিল না।

তবে ভোট পরবর্তী সময়ে পথের লড়াইয়ে যতটা বামেদের দেখা গিয়েছিল, তুলনায় পিছিয়ে বিজেপি। এমনটাই অনেকের মত। বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, উত্তর দমদম ছিল বামেদের ঘাঁটি। ২০১৬-র পরবর্তী নির্বাচনে হারলেও অন্যান্য বিধানসভার তুলনায় এখানে শতাংশের হিসাবে কিছুটা বেশি ভোট ধরে রাখতে পেরেছে বামেরা।

যাঁরা তৃণমূলকে বেগ দিতে বিজেপিকে ভোট দিয়েছিলেন, অভিজ্ঞতার নিরিখে তাঁদের ভুল ভাঙছে, তাই সেই ভোট ফিরবে বলে আশা বামেদের। বিজেপির দাবি, এখানে ক্রমশ তাঁদের ভোট বাড়ছে। এ বারে জয় নিশ্চিত। তৃণমূলের দাবি, উন্নয়নের নিরিখে জয় সময়ের অপেক্ষা। জয়ের ব্যবধান বাড়াবে।

তবে এই কেন্দ্রে বামেদের ভোট যে ফ্যাক্টর, সেটা রাজনৈতিক দলগুলি ও বাসিন্দাদের কথায় উঠে এসেছে। এখানে বিজেপির প্রার্থী সৌরভ শিকদার দমদম লোকসভার প্রাক্তন সাংসদ তপন শিকদারের ভাইপো। ভোটারদের দাবি, ‘ডিডি এবং ভাইপো’র লড়াই জমে উঠেছে। পিছিয়ে নেই কংগ্রেসও। ২০ বছর বাদে একক ভাবে তাঁরা লড়ছেন। প্রার্থী ধনঞ্জয় মৈত্র।

‘ডিডি’র কথা শুনে অবশ্য তৃণমূল প্রার্থী বলেন, ‘‘ডিডি আর দিদির মধ্যে যে আকাশ-পাতাল তফাত সেটা মানুষ বোঝেন।’’ মানুষ কী বোঝেন, তার প্রতিফলন ভোটের ফলাফলেই স্পষ্ট হবে। ৩২ বছরের দীপ্সিতা ২০২১-এর বিধানসভা এবং ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে বালি এবং শ্রীরামপুরে প্রতিদ্বন্দিতা করে পরাজিত হয়েছিলেন। এ বারে উত্তর দমদম। বিপরীতে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। স্বাস্থ্য এবং অর্থ দফতরের দায়িত্ব সামলানো এই ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থীর বিরুদ্ধে বাম, বিজেপি, কংগ্রেস প্রচারে তুলে ধরছে নিকাশি, স্বাস্থ্য, জল, শিক্ষার ইস্যু।

গত অগস্টে উত্তর দমদমের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের দেবীনগরে ঘরের মধ্যে জমা জলে ডুবে মৃত্যু হয় পাঁচ মাসের এক শিশুকন্যার। সেই ঘটনা আজও ভুলতে পারেননি বাসিন্দারা। সেই ঘটনা এলাকার নিকাশি সমস্যা তুলে ধরেছিল। উত্তর দমদম পুরসভার ৩৪টি ওয়ার্ড এবং নিউ ব্যারাকপুর পুরসভার ২০টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই বিধানসভা এলাকার বাসিন্দারা মানছেন যে বেলঘরিয়া, কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে এবং যশোর রোডের মধ্যবর্তী এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান নিচু। বাম আমলে খাল সংস্কার, নিকাশি নালা তৈরি হলেও তাই সমস্যা মেটেনি। তৃণমূল ক্ষমতায় এসে খাল সংস্কার, একাধিক নিকাশি নালা তৈরি করেছে। এমবি রোড-সহ বেশ কিছু জায়গায় জল জমার সমস্যা নিয়ন্ত্রণে এলেও বাকি একাধিক ওয়ার্ডে সমস্যা আছে। এক বাসিন্দা সমীরবরণ সাহার মত, “পরিষেবার খামতি থাকলেও উন্নয়নও চোখে পড়েছে। কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে আলোয় সেজেছে, সার্ভিস রোড তৈরি হয়েছে। কিছু অভিযোগ করলে দ্রুত নিষ্পত্তি হয়।”

বাম প্রার্থী দীপ্সিতার অভিযোগ, বেহাল নিকাশি, দিনভর মশা, ভাঙাচোরা রাস্তা, বেহাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা। পানীয় জলের আকাল। কিছু প্রাথমিক স্কুলে ছাত্র প্রায় শূন্য। কর্মসংস্থান নেই। ব্যাগ তৈরি, ছাতার শিক তৈরির ছোট কারখানা ছিল এখানে। এ সব এখন লাটে উঠেছে। পুর হাসপাতালের বড় রোগ রেফার। ধর্মীয় মেরুকরণ, পেশি আর বাহুবলই শাসকের ভরসা।

তৃণমূল প্রার্থীর পাল্টা প্রশ্ন, “৩৪ বছর রাজ্যের ক্ষমতায় বাম এবং উত্তর দমদমে সিপিএম-এর পুরবোর্ড ছিল ৪৬ বছর। কী করেছে? ২০১৬ সালে সিপিএম জয়ী হয়েছিল, পরিষেবা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘২০২১ সালে মানুষ আমায় জেতান। আমরা ফের জিতব।’’

বিজেপি প্রার্থী সৌরভের অভিযোগ, বামেদের ৩৪ এবং তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনকালে উত্তর দমদম শুধু পিছিয়েছে। এগিয়েছে শুধু প্রোমোটিং দৌরাত্ম্য আর দাদাগিরি। বিমানবন্দর সংলগ্ন এই বিধানসভার সরু ও আবর্জনাময় রাস্তা ব্যর্থতার প্রমাণ দিচ্ছে। সৌরভের দাবি, ‘‘বিজেপি এলে উন্নয়নের স্বাদ পাবেন মানুষ। প্রচারে গেলে মানুষ বলছেন, জিতে কাকার মতো কাজকরতে হবে।’’

কংগ্রেস প্রার্থী ধনঞ্জয়ের দাবি, “এমনিতেই পরিষেবায় পিছিয়ে। অপরিকল্পিত উন্নয়ন সেই সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলেছে। তবে এ বার একক ভাবে লড়ার ফলে কংগ্রেসের ভোট অনেকটাই ফিরবে।’’

তৃণমূল প্রার্থীর পাল্টা দাবি, এখানে কী ছিল, আর কী হয়েছে, সেটা মানুষ জানেন। এলাকায় বিএড কলেজ, আইটিআই হয়েছে। পুর হাসপাতালে বিনামূল্যে ডায়ালিসিস, নিউ ব্যারাকপুরে হাঁটু প্রতিস্থাপন হচ্ছে। নিমতায় স্বাস্থ্য কেন্দ্রের আধুনিকীকরণ, পানীয় জলের প্রকল্প, দু’টি দমকল কেন্দ্র হয়েছে। পরিত্যক্ত ফুল, পাতা থেকে হচ্ছে আবির, ধূপকাঠি। সিসি ক্যামেরার নজরদারি, এমবি রোডের সংস্কার, ফতেশা খালের সংস্কার হয়েছে। নোয়াই খালের কিছুটা সংস্কার হয়েছে। ড্রেন পাকা হয়েছে। আবার কিছু খাল রেলের জমিতে বলে সংস্কারে বাধা হচ্ছে। ক্রীড়াঙ্গন এবং পুর প্রেক্ষাগৃহের আধুনিকীকরণ নিয়ে প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন।

তবে এ সব ছাপিয়ে গিয়ে কপালে ভাঁজ ফেলছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)। এসআইআরে বাদ যাওয়া ৪৬ হাজারেরও বেশি নাম ভোটের অঙ্ককে আরও জটিল করতে পারে বলে চাপা আশঙ্কা রয়েছেই।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

North Dum Dum CPIM TMC BJP

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy