হিন্দু বনাম বড় হিন্দুর লড়াইয়ে ‘বিজয়’ কার

কলকাতা পুরসভার ২০, ২৩, ২৫, ২৭ এবং ৩৭ থেকে ৪৩ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত জোড়াসাঁকো বিধানসভা। যে সময়ে রাজ্যে বিজেপি উল্লেখযোগ্য শক্তি ছিল না, তখন থেকেই এই বিধানসভার অন্তর্গত ২২,২৩ এবং ৪২ নম্বর ওয়ার্ডে বিজেপি প্রার্থী জিততেন।

বিপ্রর্ষি চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৩৭

—প্রতীকী চিত্র।

চিৎপুরের ট্রাম লাইন ধরে এগোতে থাকলে দুই দিকে অসংখ্য পাথর খোদাইয়ের দোকান। সেখানে তৈরি হয় বিভিন্ন মাপ ও শৈলীর মূর্তি। কোথাও পাথরে খোদাই করে লেখা হচ্ছে নাম কিংবা স্মৃতি। এখানকার ঠাকুরবাড়ি থেকে নাখোদা মসজিদের ভৌগোলিক দূরত্ব ২.৩ কিলোমিটার। এই ঠাকুর বাড়িতে বাস বিশ্বজনীন রবির। এক কালে ৫ এবং ৬ নম্বর চিৎপুর রোড জুড়েছিল একটি সাঁকো দিয়ে। সেই থেকে এই জায়গার জোড়াসাঁকো নামেই পরিচয়। রাজ্যে ২০০৯ সালের আসন পুনর্বিন্যাসের পরে ২০১১ সালে বিধানসভা হিসেবে প্রথম আত্মপ্রকাশ জোড়াসাঁকোর। তবে ঠাকুরের জোড়াসাঁকোয় এ বার লড়াই হিন্দু বনাম বড় হিন্দুর!

কলকাতা পুরসভার ২০, ২৩, ২৫, ২৭ এবং ৩৭ থেকে ৪৩ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত জোড়াসাঁকো বিধানসভা। যে সময়ে রাজ্যে বিজেপি উল্লেখযোগ্য শক্তি ছিল না, তখন থেকেই এই বিধানসভার অন্তর্গত ২২,২৩ এবং ৪২ নম্বর ওয়ার্ডে বিজেপি প্রার্থী জিততেন। তার জেরে এই বিধানসভায় বিজেপির কিছু প্রভাব রয়েছে। সেই প্রভাবেই ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে বিধানসভাভিত্তিক ফলাফলে বিজেপি এগিয়ে ছিল। কিন্তু ২০২১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস ওই আসন পুনরুদ্ধার করে। আবার ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে ফের এই আসন থেকে এগিয়ে গিয়েছে বিজেপি। প্রার্থী বদলে এ বার তৃণমূলের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২০ নম্বর ওয়ার্ডের পুর-প্রতিনিধি বিজয় উপাধ্যায়। বিজেপির প্রার্থী ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের ১৫ বছরের পুর-প্রতিনিধি বিজয় ওঝা। সিপিএমের হয়ে এই কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ভরতরাম তিওয়ারি।

দীর্ঘদিনের পুর-প্রতিনিধি হওয়ায় বিজয় তার প্রচারে পথসভা, মিছিলের থেকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন বাড়ি বাড়ি প্রচারে। সঙ্গে রয়েছে পুর-প্রতিনিধির স্ট্যাম্প। প্রচারের ফাঁকেও মানুষ তাঁর কাছে কাজ নিয়ে এলে রাস্তায় বসেই কাগজে সই, স্ট্যাম্প দেওয়ার কাজ করছেন। বিজয় বলছেন, ‘‘১৯৮৫ থেকে এই ওয়ার্ডে কোনও পুর-প্রতিনিধি দ্বিতীয় বার জেতেননি। আমি প্রতি নির্বাচনে ব্যবধান বাড়িয়ে জিতেছি। আমি মানুষকে গিয়ে বলছি, আমায় ১৮২৫ দিন ধার দিন!’’ তাঁর কথায়, ‘‘আমি সনাতনী মানুষ। এই এলাকায় সিংহভাগ মানুষ হিন্দু। তাঁরা আমায় ভোট দেবেন না কেন?’’ পাল্টা মত আছে আর এক বিজয়ের। তৃণমূল প্রার্থীও বলছেন, ‘‘আমি বড় হিন্দু। অনেক ধার্মিক কাজ করেছি। নির্বাচনে জিতলে সব ধর্মীয় স্থান নতুন করে সাজিয়ে দেব।’’ সেই সঙ্গে তাঁর আরও দাবি, ‘‘রাজনৈতিক পরিচয়ের থেকে বড় আমার সামাজিক কাজ। নির্বাচনে জিতলে স্কুলগুলোকে ডিজিটালাইজ়ড করে দেব। স্মার্ট ক্লাসরুম করব।’’ কিন্তু তাঁর মাথায় তো ঝুলছে লোকসভা নির্বাচনের পিছিয়ে থাকার অঙ্ক! তাঁর দাবি, ‘‘ওই ভোট বিজেপি পায়নি। তাপসদা (রায়) এখানকার (পুরনো বড়বাজার) বিধায়ক ছিলেন। তাঁর ব্যক্তিগত প্রভাব ছিল। সেই প্রভাবেই তিনি ভোট পেয়েছেন।’’

এই কেন্দ্রের আরও একটি বড় বিষয়, এসআইআর পর্বে এই কেন্দ্রে ৭৫ হাজারেরও বেশি ভোটার বাতিল হয়েছে। বিজেপির বিজয় বলেন, ‘‘এই ভোটগুলো সব তৃণমূল মারত। বেশির ভাগ মৃত এবং স্থানান্তরিত ভোট। ওই ভোটে বিরোধীদের কিছু করার ছিল না। ফলে, কেটে গিয়ে সুবিধাই হবে।’’ তৃণমূলের বিজয়ের দাবি, ‘‘বিজেপির ২২-২৩ ওয়ার্ড থেকে সাড়ে ১১ হাজার ভোটার বাদ হয়েছে। এসআইআর-এ নাম বাদ দিতে গিয়ে বিজেপিই বিপদে পড়বে।’’ কিন্তু বাস্তবটা কী? ওই বিধানসভার ৩৭, ৩৯ এবং ৪৩ নম্বর ওয়ার্ড সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত। তেমনই ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের একটি অংশও। আর এই জায়গা থেকেই সব চেয়ে বেশি নাম বাদ গিয়েছে। তাই শুধু হিন্দিভাষী নয়, উর্দুভাষী মানুষের নামও বাদ গিয়েছে বহুলাংশে। তাই তৃণমূলের কাছে বিধানসভার লড়াই যে সহজ হবে না, সেটা বোঝা যাচ্ছে।

কিন্তু হিন্দুত্বের লড়াই, এসআইআর-এ নাম বাদ যাওয়ার পরেও এখানকার বড় সমস্যা নিকাশি এবং অর্থনীতি। বর্ষা হলেই বিস্তীর্ণ অঞ্চল জলের তলায় চলে যায়। তাতে বড়বাজার থেকে শুরু করে বইপাড়ায় অর্থনীতির অবস্থা বেহাল হয়ে পড়ে। তা ছাড়াও বড়বাজারে ব্যবসা বিগত বছরগুলোর তুলনায় কমেছে বলে দাবি স্থানীয়দের। আবার বইপাড়া, বৈঠকখানা বাজারেও বিগত বছরগুলোয় অর্থনীতি নিম্নগামী। সরকার বিকল্প ব্যবস্থা করেনি বলেও ক্ষোভ রয়েছে ব্যবসায়ীদের। সেই সঙ্গে পোস্তা উড়ালপুলের ভেঙে পড়ার পরে পুনর্নির্মাণ না হওয়া, বড়বাজার-মহাত্মা গান্ধী রোডের যানজট এই বিধানসভার অন্যতম সমস্যা। কিন্তু প্রধান দুই যুযুধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রচারে সে সব প্রতিশ্রুতি অমিল।

সিপিএম নেতা সংগ্রাম চট্টোপাধ্যায় অবশ্য বলছেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে যে বাম সংস্কৃতির ধারা রয়েছে, তাতে বিজেপি বেমানান। তৃণমূল সর্বস্তরে বেলাগাম দুর্নীতি না-করলে আজ বিজেপি জায়গা পেত না। আমরা বলছি, তৃণমূল রাজ্যের সর্বনাশ করেছে। বিজেপি এলে আরও সর্বনাশ হবে। আমরাই একমাত্র বিকল্প ভাবনা এবং ইস্তাহার নিয়ে মানুষের কাছে যাচ্ছি। বিধানসভায় শক্তি বাড়লে এই বিকল্পের কথা, মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার কথা তুলে ধরব। ’’

ব্যবসায়িক বড়বাজার, উর্দুভাষী মুসলিম মহল্লা এবং বাঙালি পুরনো পাড়া নিয়ে তৈরি এই কেন্দ্রে হাঁটলে বোঝা যাবে, প্রচারে-প্রভাবে দৃশ্যতই এগিয়ে তৃণমূল। কিন্তু তলায় তলায়? এক বর্ষীয়ান রাজনৈতিক কর্মীর মন্তব্য, ‘‘তৃণমূলের নিচুতলা আদৌ তৃণমূলে আছে তো? মিলিয়ে নেবেন, যা আবহাওয়া রয়েছে, এই নির্বাচন তৃণমূলের কাছে ভয়ের হতে চলেছে!’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Jorasanko TMC BJP CPIM

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy