E-Paper

ভাতা বনাম ভাঁওতার লড়াইয়েরমাঝে আরও পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা

পনেরো বছরে বদলে যাওয়া জঙ্গলমহলের বিজ্ঞাপন হতে পারে ঝকঝকে রাস্তাঘাট।

সুরজিৎ সিংহ

শেষ আপডেট: ১১ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৪৩
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

ভাতা, ভাঁওতা, ভোট— বিধানসভা নির্বাচনে শব্দ তিনটে এক সঙ্গে ঘুরছে বাঁকুড়ার জঙ্গলমহলে। বিগত বছরগুলিতে ভোটের মুখেই রাজ্য সরকার চালু করেছে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’, ‘বাংলার বাড়ি’র মতো প্রকল্প। জিতেওছে তৃণমূল। এ বারও ভোটের মুখে চালু হয়েছে ‘যুব-সাথী’, খেত মজুরদের ভাতা। আর সেই সব প্রকল্পের পাওয়া, না-পাওয়া কিংবা আরও কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় জঙ্গল ঘেরা গ্রামে-গ্রামে ভোটের হাওয়া যেন কিছুটা এলোমেলো।

পনেরো বছরে বদলে যাওয়া জঙ্গলমহলের বিজ্ঞাপন হতে পারে ঝকঝকে রাস্তাঘাট। ঠিক তার উল্টো ছবি, বারিকুল, মাজগেড়িয়া, সাতনালা, রানিবাঁধের রাউতোড়া, তাঁতিপাড়া থেকে রাইপুরের অমৃতপালের মতো বহু গ্রামে রাস্তার পাশে থাকা সার-সার জীর্ণ কাঁচাবাড়ি। রানিবাঁধ বিধানসভার বারিকুলের মুচিকাটার জয়ন্তী কিস্কুর মাটির বাড়ির টালির ছাউনির অনেকটা ভাঙা। বললেন, ‘‘সরকারি ঘর কবে পাব কে জানে! বৃষ্টি নামছে। চালাটা সারাতে হবে।’’ ছাতনা বিধানসভার জুগুনথোলের ফুলমণি হাঁসদা, পিঙ্কি হেমব্রমেরা ভোটে অনীহার কথা জানিয়ে দেওয়াল লিখেছেন। কেন? জবাব আসে, ‘‘গ্রামের কেউ সরকারি বাড়ি পায়নি।’’

রাইপুরের পিড়রগাড়ি মোড়ের লালু মেটে, আদিত্য মেটে আবাসের টাকা পেয়েও অখুশি। বলছেন, ‘‘ইট, রড, পাথরের দাম বাড়ায় এক লক্ষ ২০ হাজার টাকায় বাড়ির লিন্টেলের বেশি হচ্ছে না। সবাই জানে কারা আছে দাম বাড়ানোর পিছনে।’’ মুকুটমণিপুরের এক পরিযায়ী শ্রমিকের শ্লেষ, ‘‘ওই টাকায় ভাল গোয়ালঘরও হবে না!’’ ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পে টাকা বাড়লেও খুশি নন মুচিকাটার সরলা কিস্কু। তাঁর দাবি, ‘‘ওই টাকায় স্বামী, ছেলে ও আমার ফোন রিচার্জ করার পরে, হাতে আর কী থাকছে?’’ ছাতনার গুড়পুতা গ্রামের রিনা বাউরি, দীপালি বাউরির প্রশ্ন, ‘‘লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকাটাই কি সব? সরকারের তৈরি ঘুপচি শৌচাগার ব্যবহার করা যায় না। সেখানে জ্বালানি কাঠ রাখি। আমরা মাঠেঘাটেই যাই। তাতে কি সম্ভ্রম রক্ষা হয়?’’

যুব সাথীর আবেদনকারীদের অনেকে টাকা পেলেও না পাওয়ার সংখ্যাটা ঢের বেশি। তৈরি হয়েছে আশঙ্কা— ভোট মিটলে ভাতা মিলবে তো! যুব সাথীর টাকা চেয়ে খাতড়া ব্লক অফিসে দু’বার বিক্ষোভও হয়েছে। তবে তৃণমূলের প্রবীণ নেতাদের একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্তের কাছে ভাতার মূল্য কম নয়। বাম আমলেও প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হাওয়া অনেক আগে উঠেছে। কিন্তু ২০১১-র আগে তাদের সরানো যায়নি। বলছেন, ‘‘যাদের ভোট করানোর দক্ষতা আছে, তারা জানে কী করে টুকরো ক্ষোভের মোকাবিলাকরা যায়।’’

২০১৯-এর লোকসভা ভোটে জঙ্গলমহলে বিজেপি সাফল্য পায়। ২০২১-এর বিধানসভা ভোটে রানিবাঁধ, রাইপুর, তালড্যাংরায় তৃণমূল ঘুরে দাঁড়ায়। ছাতনায় জেতে বিজেপি। তবে স্থানীয় কিছু জনপ্রতিনিধির দুর্নীতি-যোগ, তৃণমূলকে বিড়ম্বনায় ফেলেছে। গোষ্ঠী-দ্বন্দ্বও আছে। এ বার রানিবাঁধ ও রাইপুরে তৃণমূলের নতুন প্রার্থী তনুশ্রী হাঁসদা ও ঠাকুরমণি সরেন।

রানিবাঁধের বিদায়ী বিধায়ক তথা প্রাক্তন মন্ত্রী জ্যোৎস্না মান্ডির দাবি, ‘‘ভোটের জন্য আগেই জমি তৈরি করে রেখেছি। প্রার্থীকে শুধু প্রচারে নামতে হবে।’’ যদিও তৃণমূল প্রার্থী তনুশ্রী বলছেন, ‘‘দল যে প্রার্থী বদলেছে, সেটাই প্রথম দিকে বেশি প্রচার করতে হয়েছে।’’ তাঁর ঘনিষ্ঠদের মন্তব্য, দলের কে, কী করছেন, নজর রাখতে হচ্ছে। দলের সর্বোচ্চ স্তরকে জানাতেও হচ্ছে। বিজেপির রানিবাঁধের প্রার্থী ক্ষুদিরাম টুডু ও ও রাইপুরের ক্ষেত্রমোহন হাঁসদার খোঁচা, ‘‘ধামসা-মাদল দিলেই কি উন্নয়ন হয়?’’ রানিবাঁধের সিপিএম প্রার্থী তথা জেলা সম্পাদক দেবলীনা হেমব্রম, রাইপুরে রাম মান্ডিও প্রচারে ব্যস্ত। দেবলীনা বলেন, ‘‘গরিবের পাশে কারা থাকবে, সবাই জানেন।’’

তালড্যাংরার বিদায়ী বিধায়ক তৃণমূলের ফাল্গুনী সিংহবাবু, বিজেপির সৌভিক পাত্র, সিপিএমের দেবকান্তি মহান্তি— তিন জনেরই নজর উৎকল সম্প্রদায়ের ভোটে। উৎকল সম্প্রদায়ের পক্ষে ‘দক্ষিণবঙ্গ ব্রাহ্মণ কল্যাণ সমিতি’র বাঁকুড়া জেলা সহ-সভাপতি তুষারকান্তি ষন্নিগ্রহী বলেন, ‘‘উৎকল সম্প্রদায়ের উন্নয়নে আলাদা বোর্ড গড়তে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আর্জি জানিয়েছিলাম। হয়নি। সব দলের সঙ্গে এখন আমাদের যোগাযোগ রয়েছে।’’

ছাতনায় বিদায়ী বিধায়ক সত্যনারায়ণ মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে কর্মীদের একাংশের আপত্তি সত্ত্বেও বিজেপি তাঁকেই প্রার্থী করেছে। তৃণমূলের প্রার্থী দলের ছাতনা ব্লক সভাপতি স্বপনকুমার মণ্ডল। আরএসপি প্রার্থী রাজীবলোচন কর। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভোটারেরা বলেছন, ‘‘সবাই ঘরের ছেলে। কার প্রতিশ্রুতিতে দম আছে যাচাই করব। তার পরে বোঝা যাবে এগোবে কে?’’

লোকসভা ভোটে ওই চার বিধানসভাতেই তৃণমূল এগিয়ে। সে সূত্রে বাম ভোট এ বারেও কতটা তাদের পক্ষে যায়, সে দিকে সতর্ক নজর বিজেপির। বিজেপির বাঁকুড়া জেলা সভাপতি প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের অবশ্য দাবি, ‘‘উন্নয়নের বদলে শুধু ভাতা দিয়ে তৃণমূল মানুষকে ভাঁওতা দিচ্ছে। মানুষ এ বার পরিবর্তন আনতে চান। বিজেপি সেই মুখ।’’ সিপিএমের ভোট-ব্যাঙ্ক আছে এমন গ্রামে টানা ছোট, ছোট বৈঠক করছেন পদ্ম কর্মীরা। ফল? রানিবাঁধের তুংচাঁড়ো গ্রামের বধূ বেলা মাঝি, সন্ধ্যা মাঝি বলেন, ‘‘লক্ষ্মীর ভান্ডার পাচ্ছি বটে। অন্যেরা কী দেয়, সেটাও দেখা দরকার।’’

বাঁকুড়ার তৃণমূল সাংসদ অরূপ চক্রবর্তীর দাবি, ‘‘কেন্দ্রের বঞ্চনা সত্ত্বেও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মানুষকে নিখরচায় বাসস্থান, খাবার, শিক্ষা, চিকিৎসার সুবিধা দিচ্ছেন। বিজেপির ভাঁওতা মানুষই রুখবে।’’

এলাকায় আদিবাসী স্কুল পড়ুয়াদের হস্টেল বন্ধ হয়ে যাওয়া, জাল জাতিগত শংসাপত্রের রমরমায় কারবারে ক্ষুব্ধ রানিবাঁধের মাজগেড়িয়ার একাধিক যুবকের আশঙ্কা, আদিবাসীদের সমাজের ক্ষোভে তাপ্পি মেরে ভোট কিনতে ভোটের আগে নানা পক্ষের লোক নানা প্রস্তাব নিয়ে আসবে। তাঁরা বলছেন, ‘‘প্রলোভনের কাছে বিকিয়ে গেলে পরিবর্তন হবে না।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

bankura

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy