কামারহাটিতে রং বদল রোখার লড়াই সদা ‘রঙিন’ মদনের

সেই ‘রঙিন বৃত্ত’ রেখেই ২০২১ সালে মদন ফের তৃণমূলের টিকিটে কামারহাটি উদ্ধার করতে নামেন। সে বার বামেরা প্রার্থী করে সায়নদীপ মিত্রকে। তত দিনে তৃণমূলের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসাবে বিজেপি উঠে এসেছে রাজ্যের সর্বত্রই।

নীলোৎপল বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৪৬
মদন মিত্র।

মদন মিত্র। —ফাইল চিত্র।

কখনও তিনি সহযোগীদের দিকে হাত বাড়িয়ে চেয়ে নেন মারকাটারি রঙের সানগ্লাস। কখনও চড়া রোদের উজ্জ্বলতাকেও টক্কর দেয় তাঁর ধুতি-পাঞ্জাবির রং। তিনি গান করেন, মিউজ়িক ভিডিয়ো তৈরি করে এমন সব শব্দ বা শব্দবন্ধের জনক হয়ে যান, যা মুখে মুখে ঘোরে। তিনি চান, তাঁর নির্বাচনী এলাকার মানুষজনও সব সময়ে রঙিন থাকুন। অঞ্চলে খেলা-মেলা-উৎসবের কমতি নেই। কিন্তু ‘মুড বুঝে’ তাঁর সানগ্লাস, পাঞ্জাবির রং বদলানোর মতো কামারহাটির রঙেও কি এ বার বদল আসবে? না কি তিনি গড় রক্ষা করবেন নিজের কায়দাতেই?

প্রশ্ন শুনে বি টি রোড সংলগ্ন বিধানসভা কেন্দ্র কামারহাটির তৃণমূল প্রার্থী মদন মিত্র বললেন, ‘‘ওহ, লাভলি! জিতব কী, জিতে গিয়েছি।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘শুধু বিনোদন নয়, মদনের থেকে মানুষ কাজটাও পান। সানগ্লাস চোখে থাক না থাক, রাতবিরেতে এখনও মদনই পথ দেখায়।’’ তবে, তাঁর ঘনিষ্ঠেরা মানছেন, ২০১৬ সালের মতো এ বারও দাদার জন্য কঠিন লড়াই। বামেরা কামারহাটিতে প্রার্থী করেছে মানস মুখোপাধ্যায়কে। ২০১৬ সালে এই মানসের কাছেই হেরে যান জেলবন্দি মদন। সেই ভোট দেখে অনেকেই বলেছিলেন, ‘‘মাঠ আছে, দলও মাঠে আছে, জার্সি, ব্যাট-বল সব আছে। কিন্তু দলের ক্যাপ্টেনই তো নেই।’’ সেই ম্যাচে মাঠে নেমে সমস্তটা পরিচালনা করেও জেতাতে পারেননি মদনের পরিবারের লোক। মানসের কাছে ৪১৯৮ ভোটে হেরে যান মদন। মন্ত্রিত্ব হারানো মদন তাঁর দলের ভিতরেও তখন বেশ কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি। তাঁরা বলছেন, ‘‘এর পর থেকেই নিজের চার দিকে রঙিন এক বৃত্ত তৈরি করে নেন এক কালের হাটে-মাঠে সবেতেই লোক ডাকার ‘মেশিনারি’ মদন।’’

সেই ‘রঙিন বৃত্ত’ রেখেই ২০২১ সালে মদন ফের তৃণমূলের টিকিটে কামারহাটি উদ্ধার করতে নামেন। সে বার বামেরা প্রার্থী করে সায়নদীপ মিত্রকে। তত দিনে তৃণমূলের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসাবে বিজেপি উঠে এসেছে রাজ্যের সর্বত্রই। সেই ভোটে দ্বিতীয় হওয়া বিজেপির থেকে ৩৫ হাজারের বেশি ভোট পান মদন। বামেরা তৃতীয় স্থানে নেমে যায়। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও একই ধারা বজায় রেখে কামারহাটি থেকে ‘লিড’ পান দমদম লোকসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী।

যদিও এলাকার বাম কর্মী-সমর্থকদের দাবি, কামারহাটি এ বার রং বদলাবে। ২০০৬ সালে কামারহাটি থেকে জিতেছিলেন মানস। ২০১৬ সালেও মদনকে হারিয়ে জিতেছেন সেই মানসই। এ বার ২০২৬। মদন এ বারও ৬-এর গেরোয় পড়বেন। বাম প্রার্থী মানস যদিও বলছেন, ‘‘জ্যোতিষচর্চার মতো ব্যাপার নয়, এমনিই জিতব। কামারহাটির মানুষ গুন্ডারাজ থেকে মুক্তি চান। আড়িয়াদহের মতো যে এলাকা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য এক সময়ে পরিচিত ছিল, সেখানে এখন জয়ন্ত সিংহের মতো দৈত্যের (জয়ন্ত ‘জায়ান্ট’ সিংহ নামে পরিচিত) জন্ম হচ্ছে। ‘জয়ন্তের আদালতে’ তুলে নিয়ে গিয়ে নির্বিচারে অত্যাচার চালানো দেখে মানুষ আঁতকে উঠেছেন। ভোটে তার প্রভাব পড়বেই।’’ তাঁর সংযোজন, চার দিকে দেদার বেআইনি নির্মাণ চলছে, অথচ অঞ্চলের মানুষ জল-যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাননি। কামারহাটির সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এখনও কার্ডিয়োলজি, নিউরোলজি, বার্ন ইউনিট তৈরি করা যায়নি। এক শয্যায় তিন জন করে রোগী ভর্তি করানো হচ্ছে। মানস বললেন, ‘‘এ সবের উত্তর তো সরকারে থাকা দলকেই দিতে হবে। উত্তর দিতে হবে, জয়ন্তের ঘটনা সামনে আসার পরেও কেন তৃণমূল প্রার্থীর প্রচারে গুন্ডাদের দেখা যাচ্ছে?’’ কামারহাটির বিজেপি প্রার্থী অরূপ চৌধুরী এর সঙ্গেই জুড়লেন, ‘‘অনেক জুটমিল বন্ধ। রাস্তার বেহাল অবস্থা। নর্দমার উপরে সিমেন্টের চাঙড় বসিয়ে চার-পাঁচ লক্ষ টাকায় দোকান করার জায়গা বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু মানুষ তাঁদের সমস্যার কথা বলবেন কাকে? তৃণমূল প্রার্থীকে যে বেশভূষায় দেখা যায়, তাতে মানুষ আর তাঁকে সিরিয়াসলি নেন না।’’

২০১৬ সালের মতো এ বারও কামারহাটিতে তৃণমূলের মুখ্য নির্বাচনী এজেন্ট, মদনের কনিষ্ঠ পুত্র শুভরূপ মিত্রের দাবি, ‘‘মদন মিত্রের জীবন বইয়ের খোলা পাতার মতো। তিনি একটু রঙিন হতে পারেন, কিন্তু পরিষেবা দেওয়ার কাজে তাঁর দিক থেকে কোনও ঘাটতি নেই।’’ এর পরে শুভরূপ জানান, তৃণমূল জিতলেই কামারহাটির সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালকে ঢেলে সাজানো হবে। এলাকার স্কুলের পরিকাঠামোর উন্নতি করে আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে যাওয়া হবে। খেলার মাঠের সংস্কার করে স্টেডিয়াম তৈরির ব্যাপারও পাকা হয়েই রয়েছে। তাঁর দাবি, ‘‘বামেরা ভাবছে, মানসবাবুর জোরে জিতে যাবে। জামানত জব্দ না হয়ে যায়। বিজেপি দ্বিতীয় হবে।’’ কামারহাটির জনশ্রুতি, এক সময়ে ভবানীপুর থেকে কামারহাটিতে লড়তে আসা মদনকে থাকার জন্য ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন বর্তমান বিজেপি প্রার্থী অরূপ। তিনি বাম শিবিরেও পরিচিত এক কালের দোর্দণ্ডপ্রতাপ সিপিএম নেতা অমিতাভ নন্দীর ঘনিষ্ঠ হিসাবে। সেই বিজেপি প্রার্থী সম্পর্কে মদন-পুত্রের মূল্যায়ন, ‘‘জাতের ভোট চায় যাঁরা, তাঁদের আর ভাল কী? মানুষ বিজেপিকে পরিত্যাগ করেছে।’’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটে কামারহাটি কেন্দ্রের ফলাফলের অন্যতম নির্ণায়ক কামারহাটি পুরসভার এক থেকে সাত নম্বর ওয়ার্ডের সংখ্যালঘু ভোট। বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) জন্য ৫২ হাজার থেকে কামারহাটির সংখ্যালঘু ভোট নেমে দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজারে। এই ৩৬ হাজারের মধ্যেকত ভোট কে ঘরে তুলতে পারছেন, সেটাই এ বারও অন্যতম নির্ণায়ক হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।সেই সঙ্গেই ছিন্নমূল হয়ে বাংলাদেশ থেকে অতীতে কামারহাটিতে আসা মানুষের সমর্থন কোন দিকে যায়, সেটাও আলোচনায় রয়েছে। কামারহাটিতে তৃণমূলেরই মদন-বিরোধী গোষ্ঠীর ভূমিকা কেমন থাকবে, ভোট-বাজারে বিশ্লেষণ চলছে তা নিয়েও। কামারহাটি পুরসভার চেয়ারপার্সন গোপাল সাহা অবশ্য বলছেন, ‘‘পুর পরিষেবার দিক থেকেই কামারহাটির মানুষ যা যা পেয়েছেন, তাতেই তৃণমূলের জেতা উচিত।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Madan Mitra TMC kamarhati Kamarhati Municipality

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy