অস্তমিত শিল্প আর ফিকে সবুজে ম্লান উত্তরের জনপদ

২০২১ সালে এই কেন্দ্র থেকে তৃণমূল জিতেছিল ৩৫,৩৯০ ভোটে। ২০২৪ সালে লোকসভা ভোটে এই কেন্দ্রে বিজেপির সঙ্গে তৃণমূলের ব্যবধান ছিল ৭২৬৮। এ বছর এসআইআরে এই কেন্দ্র থেকে প্রায় ৬০ হাজার নাম বাদ পড়েছে।

আর্যভট্ট খান , হিন্দোল ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৫:৩৫

— প্রতীকী চিত্র।

বি টি রোডের এক দিকে গঙ্গাতীরের কাশীপুর, চিৎপুর। এক সময়ের এই শিল্পাঞ্চলে মিশ্র জনগোষ্ঠীর বাস। অন্য দিকে, দমদম স্টেশন সংলগ্ন দমদম রোড, পাইকপাড়া, টালা পার্ক, বেলগাছিয়া এলাকা। পুরনো এই জনবসতির কোনও অংশ পরিকল্পিত, কোনও অংশ আবার অপরিকল্পিত— এই নিয়েই কাশীপুর-বেলগাছিয়া বিধানসভা কেন্দ্র। উচ্চ, মধ্য ও নিম্নবিত্তের বসবাস এখানে। সমস্যাও একাধিক। ভোট আসে, ভোট যায়। পালাও বদলায়।কিন্তু দীর্ঘ বছর ধরে সব সমস্যা জিইয়ে থাকে। বাসিন্দাদের কারও ভরসা লক্ষ্মীর ভান্ডারে। কেউ বা চান উপযুক্ত কাজ।

২০২১ সালে এই কেন্দ্র থেকে তৃণমূল জিতেছিল ৩৫,৩৯০ ভোটে। ২০২৪ সালে লোকসভা ভোটে এই কেন্দ্রে বিজেপির সঙ্গে তৃণমূলের ব্যবধান ছিল ৭২৬৮। এ বছর এসআইআরে এই কেন্দ্র থেকে প্রায় ৬০ হাজার নাম বাদ পড়েছে। যার মধ্যে বেশির ভাগই তৃণমূলের ভোটার বলে রব উঠেছে। এ হেন পরিসংখ্যান প্রশ্ন তুলছে, তবে পাল্লা কোন দিকে ঝুঁকছে?

প্রশ্নটা শুনে চুপ স্থানীয় চায়ের দোকানদার রোশন গুপ্ত। স্নাতক। রুস্তমজি পার্সি রোডের আশপাশের কারখানার প্রায় সবই বন্ধ। টিমটিম করছে গেঞ্জি কারখানা। সে দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘‘এভারেডি কারখানা ২০০৮ সাল থেকে বন্ধ। বাইরে চলে যাওয়ার কথা ভাবছি।’’ শত অভাবেও ভাল থাকার কথা শোনালেন পোর্ট ট্রাস্টেরজমিতে ঝুপড়ি বানিয়ে থাকা সুফিয়া বিবি। কেমন আছেন আপনি? সুফিয়া বললেন, ‘‘লক্ষ্মীর ভান্ডার থেকে শুরু করে যা কিছু পাচ্ছি, দিদিই তো দিয়েছে।’’

তবে, এই বিধানসভা কেন্দ্র ঘুরলেই আঁচ পাওয়া যায়, ‘ভাল আছি’ আর ‘ভাল নেই’— কার দিকে পাল্লা ভারী। কাশীপুর থেকে দমদম, বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে দুর্বিষহ হাল বড় রাস্তা এবং অলিগলির। রাস্তার ধারে বাস, গাড়ির অবৈধ গ্যারাজে সঙ্কুচিত হয়েছে পথ। ফুটপাত জুড়ে পড়ে থাকে বাতিল জিনিস আর বর্জ্যের ভ্যাট।

কলকাতা পুরসভার এক থেকে ছ’নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে এই বিধানসভা কেন্দ্র। এলাকায় রয়েছে কাশীপুর, চিৎপুর, সেভেন ট্যাঙ্কস, সিঁথির একাংশ, বেলগাছিয়া, পাইকপাড়া, টালা। এই কেন্দ্রে কাশীপুর রাজবাড়ি-সহ বেশ কিছু ঐতিহ্যশালী ভবন রয়েছে, যেগুলি ভগ্নপ্রায়। সেগুলির পুনরুজ্জীবন ঘটিয়ে পর্যটক টানার কথা কেন কোনও দল ভাবে না, তা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে এলাকাবাসীর। এখানেই রয়েছে শ্রীরামকৃষ্ণের স্মৃতিবিজড়িত উদ্যানবাটী। এ হেন জায়গার বাইরের এলাকাটাও এত মলিন কেন? প্রশ্ন সকলের।

প্রচারে ঘোরার ফাঁকে বিজেপি প্রার্থী রীতেশ তিওয়ারির বক্তব্য, ‘‘এত বছর ধরে পরিষেবা দিয়েও তো এলাকার এমন হতশ্রী দশা।’’ এই কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী অতীন ঘোষ। তিনি বিদায়ী বিধায়কও। তাঁর হয়ে প্রচারে বেরিয়ে পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের পুরপ্রতিনিধি তথা বরো একের চেয়ারম্যান তরুণ সাহা বললেন, ‘‘২০০৬ সালের বিধানসভা ভোটে সিপিএমের ঝড়েও এই কেন্দ্রে জয় এসেছিল। সে বার তৃণমূল ২৯টি আসন জিতেছিল।’’

প্রচারে এসে সিপিএম প্রার্থী রাজেন্দ্র গুপ্তের দাবি, ‘‘সিমেন্টের গুদাম করে রাখা কাশীপুর রোড এবং কলকাতা-হাওড়ার মধ্যে বন্ধ ফেরির সমস্যা নিয়ে কাজ করব। বিস্তীর্ণ এলাকায় জল জমার সমস্যা রয়েছে। সেটাও দেখব।’’ দীর্ঘ কুড়ি বছর পরে আলাদা লড়ছেকংগ্রেস। প্রার্থী তারক পাল বলেন, ‘‘রাহুল গান্ধী রাজ্যে আসার পরে কংগ্রেস কর্মীরা উজ্জীবিত। প্রচারে সাড়াও পাচ্ছি।’’

এক সময়ে সাহিত্যিকদের পাড়া বলে পরিচিত ছিল টালা পার্ক অঞ্চল। এলাকায় থাকতেন কাজী নজরুল ইসলাম, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, শঙ্খ ঘোষ, বিমল কর প্রমুখ। সজনীকান্ত দাসের শনিবারের চিঠির অফিসও ছিল এই এলাকায়। অনেকটা সবুজে ঘেরা পরিচ্ছন্ন ও সাজানো ছিল এলাকা। বছর দশেক ধরে ধীরে ধীরে সব নষ্ট হচ্ছে। এক বাসিন্দার বক্তব্য, ‘‘জল জমার সমস্যা অনেকটা ঠিক হয়েছে। কিন্তু টালা পার্কের বিশাল মাঠে একটি ক্লাব বছরভর কেন দুর্গাপুজোরপ্রস্তুতি চালাবে? উত্তর কলকাতার আমাদের এই ফুসফুসকে ফিরিয়ে দিতে হবে।’’

অভিযোগ, যত্রতত্র প্রোমোটিংও কালের গর্ভে পাঠাচ্ছে এলাকার চরিত্র। এক বাসিন্দা বলেন, ‘‘টালা পোস্ট অফিসের কাছে একটি বাড়িতে সত্যজিৎ রায়ের অপুর সংসারের শুটিং হয়েছিল। প্রোমোটিংয়ের সৌজন্যে তা মুছে গিয়েছে। সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতে কিছু কি করেছিলেন নেতারা?’’

সাম্প্রতিক অতীতে এলাকার কয়েকটি ঘটনায় তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব প্রকট হয়েছে বলে অভিযোগ। অতীন ঘোষ ও তৃণমূল নেতা শান্তনু সেনের অনুগামীদের কোন্দল থানা পর্যন্ত গড়িয়েছে। ফলে প্রশ্ন, অতীনের হয়ে কতটা কাজ করবেন শান্তনুর অনুগামীরা? শান্তনুর দাবি, ‘‘আমরা তৃণমূলের সৈনিক। অতীন ঘোষকে বিপুল ভোটে জয়ী করাতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছি।’’

এই কেন্দ্রেই রয়েছে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। বিরোধীদের দাবি, আর জি করের চিকিৎসক-পড়ুয়াকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার পরে এমনিতেই হাসপাতালের প্রতি মানুষের ভরসা কমেছিল। তার মধ্যে চলতি বছরে লিফ্টে আটকে এক যুবকের মৃত্যুতেফের অভিযোগ উঠছে, হাসপাতাল চত্বরে পরিচ্ছন্নতা ও সুরক্ষার বিষয়টি আজও উপেক্ষিত। ভোটের প্রচারে সব পক্ষ জনগণকে মনেও করাচ্ছে সে কথা।

এই কেন্দ্রে রয়েছে বেলগাছিয়া বস্তি, মরিচঝাঁপি বস্তি-সহ বেশ কিছু বস্তি। রয়েছে ১৭ শতাংশের মতো সংখ্যালঘু ভোট। বেলগাছিয়ার বস্তির উন্নয়ন হয়েছে বলে দাবি অতীনের। তবে মরিচঝাঁপির সুরজিৎ চক্রবর্তীর মতে, ‘‘নিকাশি আমাদেরই পরিষ্কার করতে হয়।’’ হিন্দিভাষীদের ভোট পাওয়ার আশায় থাকা রীতেশের আবার দাবি, ‘‘সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বেলগাছিয়া বস্তিতে তৃণমূল নেতাদের দেখা যায়। কিন্তু অন্য বস্তিতে নয়।’’

প্রচারের ফাঁকে তৃণমূল প্রার্থী অতীন ঘোষ বলেন, ‘‘টালা পার্কের সবুজ সারা বছর দখল করে রাখা উচিত নয়। আমরা ওখানে আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম ও সুইমিং পুল করব। জল জমার সমস্যা মেটাতে ২৮ কোটি টাকার প্রকল্পে দমদম রোডে নিকাশির পাইপ বসছে। চিৎপুর সেতুর কাজ শুরু হবে। গত পাঁচ বছরে কী করেছি, তার রিপোর্ট কার্ড তৈরি করে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছি। এর বেশি কিছু বলব না।’’

তবে, এ সবে আশ্বস্ত নন এলাকাবাসী। তাঁদের প্রশ্ন, ২০০৮ সালেও নিকাশির ভূগর্ভস্থ পাইপ বসেছিল বিস্তীর্ণ এলাকায়। তার পরেও দমদম স্টেশন রোড, দমদম রোড, রাজাবাগান লেন, দীপেন ঘোষসরণি, পাইকপাড়া-সহ বহু এলাকা একটু ভারী বৃষ্টি হলেই জলে ভাসে। পাম্প চালিয়ে বার করতে হয় সেই জল। ফলে নতুন কাজে কি সমস্যা মিটবে?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

TMC BJP Kashipur Belgachia

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy