শাসকদলের চেনা মাটিতে কি এসআইআরের অঙ্কে বদলের হাওয়া

ডায়মন্ড হারবার ছাড়িয়ে গঙ্গার তীর ঘেঁষা কুলপি বিধানসভা কেন্দ্রে ২০১১ সাল থেকে টানা তিন বারের বিধায়ক যোগরঞ্জন হালদারকে সরিয়ে দল এ বার নতুন মুখ বর্ণালীকে প্রার্থী করেছে। ২০০১ সালেও বিধায়ক হন যোগরঞ্জন।

ফিরোজ ইসলাম 

শেষ আপডেট: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫২

—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।

প্রতিকূল আবহাওয়া ও পরিস্থিতিতে সূর্যমুখী ফুলের বীজ আর নারকেলের চারা তৈরি করে গত জানুয়ারিতেই রাষ্ট্রপতির থেকে পুরস্কার পেয়েছিলেন কুলপি বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের এ বারের প্রার্থী বর্ণালী ধাড়া। শ্বশুরবাড়িতে সার এবং কীটনাশকের ব্যবসা সামলাতে এসে তাঁর মাটির সঙ্গে চেনাজানার শুরু। এ হেন বর্ণালীকে অবশ্য কুলপির ভোটের মাটি বুঝতে ঘাম ঝরাতে হচ্ছে। মাটির অম্লত্ব বুঝে কোন সারের রসায়নে ফুল ফোটাবেন, তার হদিস পেতে পাড়া চষে ফেলছেন বর্ণালী।

ডায়মন্ড হারবার ছাড়িয়ে গঙ্গার তীর ঘেঁষা কুলপি বিধানসভা কেন্দ্রে ২০১১ সাল থেকে টানা তিন বারের বিধায়ক যোগরঞ্জন হালদারকে সরিয়ে দল এ বার নতুন মুখ বর্ণালীকে প্রার্থী করেছে। ২০০১ সালেও বিধায়ক হন যোগরঞ্জন। ২০০৬ সালের নির্বাচনে হেরেছিলেন তিনি। গত লোকসভা নির্বাচনেও এই বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ৩২ হাজারের বেশি ভোটে এগিয়েছিল তৃণমূল। তার পরেও কুলপির প্রার্থী বদল বাতাসে নানা জল্পনা ভাসিয়ে দিয়েছে। মথুরাপুরের সাংসদ বাপি হালদারের সঙ্গে সুসম্পর্কের কারণেই তাঁকে সরতে হল কিনা, সেই জল্পনাও ঘুরছে। মুখে কুলুপ যোগরঞ্জন অবশ্য শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে দূরে থাকছেন। এ দিকে যোগরঞ্জনের হয়ে যাঁরা ভোট করতেন, তাঁরা শিবির বদলের সুযোগ খুঁজছেন বলে খবর। তাঁদের মনোভাব বুঝতে গিয়ে বর্ণালীকেও বেগ পেতে হচ্ছে।

পরিস্থিতি বুঝে তাই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কুলপিতে সভা করতে এসে ন্যূনতম ৪০ হাজার ভোটে নতুন প্রার্থীকে জেতানোর লক্ষ্য বেঁধে দিয়েছেন। বিধানসভা ক্ষেত্রের ১৪টি অঞ্চলের মধ্যে পিছিয়ে থাকা দু’টি অঞ্চলেও ভোট বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনে (এসআইআর) নাম বাদ যাওয়া ভোটারদের নিয়ে ট্রাইবুনালের দ্বারস্থ হওয়ার শিবির চলছিল কাকদ্বীপ রোডের ঝালবাড়িতে। আইএসএফ আয়োজিত শিবিরে দেখা হল বছর পঁচাশির রংলাল মোল্লার সঙ্গে। এত দিন ভোট দিলেও অসঙ্গতি দেখিয়ে তাঁর নাম বাদ পড়েছে। একই অবস্থা আশরাফ আলি মোল্লা ও তাঁর দুই ভাইয়েরও। আশরাফ বললেন, ‘‘আমার নামে আলি আর মোল্লা দুই পদবি কেন রয়েছে, এই প্রশ্ন তুলে নাম বাদ পড়েছে।’’

সেখানেই কুলপি বিধানসভায় নলবাহিত পানীয় জল, সেচের জলের সমস্যা, হিমঘর, রাস্তা, আবাস যোজনার বাড়ি, মৎস্যজীবীদের ভাতা-সহ নানা বিষয়ে অভিযোগ জানালেন বাসিন্দারা। বিশেষ নিবিড় সংশোধনের প্রশ্নে শাসকদলের থেকে তেমন সাহায্য না পাওয়ার ক্ষোভও প্রকাশ করলেন অনেকে।

এই বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থী অবনী নস্কর পেশায় শিক্ষাকর্মী। বিজেপির জেলা সভাপতি নব্যেন্দুসুন্দর নস্করের খুড়তুতো ভাই তিনি। স্বল্প পরিচিত প্রার্থী নিয়ে আপত্তি ছিল দলেরই নেতা-কর্মীদের একাংশের। অবনীর দাবি, সে সব অতীত। এসআইআরের ফলে এই কেন্দ্রে প্রায় ১৫ হাজার ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। নতুন প্রজন্মের তিন হাজার ভোটারের নাম জুড়েছে। সেই সব অঙ্ক মিলিয়ে ভোটে লড়ছেন তিনি। বড় সভার পরিবর্তে পাড়ায় পাড়ায় ছোট সভা আর সামাজিক ও ডিজিটাল মাধ্যমে নাগাড়ে প্রচারের কৌশলে এগোচ্ছেন। তাঁর কথায়, ‘‘বদলের হাওয়ায় সাফল্য আসবে। মানুষ এই শাসন চান না।’’

ওই কেন্দ্রে আইএসএফ প্রার্থী আব্দুল মালেক মোল্লা দলেরই দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার দায়িত্বে। ফলে নিজের কেন্দ্র সামলানোর পাশাপাশি, নানা দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে তাঁকে। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে মেরুকরণের প্রবল হাওয়ায় প্রায় ৩০ হাজার ভোট পেয়েছিল আইএসএফ। ওই সমর্থনের ভিত ধরে রেখে বামেদের নিয়ে নিজেদের জমি বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন ওই প্রার্থী। তাই এই নির্বাচনে তাঁদের ভূমিকা থাকছে। ময়দানে রয়েছেন কংগ্রেস প্রার্থী কুতুবুদ্দিন মোল্লাও। তবে, তাঁর অস্তিত্ব মূলত খাতায়-কলমে।

কুলপির একেবারে লাগোয়া বিধানসভা কেন্দ্র মন্দিরবাজার। ওই বিধানসভা কেন্দ্রের বিজয়গঞ্জ বাজার রয়েছে একেবারে শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখার অন্যতম ব্যস্ত স্টেশন লক্ষ্মীকান্তপুর ঘেঁষে। স্টেশন থেকে বিজয়গঞ্জ বাজারে আসার পথে হাজি বিরিয়ানির দোকান বা হিন্দু হোটেল— সবই রয়েছে একে অপরের গা ঘেঁষে।

তবে, ভোটের মরসুমে রামনবমীর হাওয়ায় পুরো বাজার ঢেকেছিল গেরুয়া পতাকা আর হনুমানের মুখ আঁকা পতাকায়। ওই বাজারে আসার পথেই চায়ের দোকানে জালাল লস্কর বলছিলেন, ‘‘এখানে যানজটের সমস্যা নিয়ে কেউ কিছু করে না। এলাকার লোকজনকে কাজের জন্য কলকাতায় যেতে হয়। অথচ রেল ছাড়া অন্য যোগাযোগ নেই।’’

এই কেন্দ্রে ২০১১ সাল থেকে জিতে আসছেন তৃণমূল প্রার্থী জয়দেব হালদার। ২০২১ সালের বিধানসভা এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল এগিয়েছিল যথাক্রমে সাড়ে ২৩ হাজার এবং ২০ হাজার ভোটে।নিয়োগ দুর্নীতিতে শাসকদলের প্রার্থীর ঘনিষ্ঠদের জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে। রয়েছেমেরুকরণের হাওয়াও। তার পরেও শাসকদল ওই কেন্দ্র ধরে রাখায় আশাবাদী।

মন্দিরবাজার কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থী মল্লিকা পাইক নতুন মুখ। তাঁর প্রচার থেকে সাংগঠনিক কাজকর্ম, সবই দেখছেন জেলা বিজেপির নেতা অশোক পুরকাইত। কেশবেশ্বর মন্দিরের কাছে কথা হচ্ছিল তাঁর সঙ্গে। এসআইআরে কয়েক হাজার ভোটারের নাম বাদ যাওয়ায় লড়াইটা তুল্যমূল্য, বলছেন তিনি।অশোক বলেন, ‘‘আবাস যোজনা, একশো দিনের কাজ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্নীতির জবাব দিতে মানুষ মুখিয়ে আছেন। প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া এই কেন্দ্রে বদল ঘটাবে।’’

লড়াইয়ে রয়েছেন কংগ্রেসের প্রার্থী চাঁদ সর্দার এবং বাম সমর্থিত আইএসএফ প্রার্থী অশোক গায়েনও। এখানে গত বিধানসভায় বামেদের প্রায় ৬ শতাংশ ভোট রয়েছে। তফশিলি সংরক্ষিত কেন্দ্রে ওই ভোট বাড়ানোর চেষ্টায় রয়েছেন বাম এবং আইএসএফ জোটের প্রার্থী। তবে কংগ্রেসের প্রার্থীর সঙ্গে কিছু ভোট ভাগ হতে পারে।

চেনা মাঠে বিরোধীদের তুলনায় কুলপি এবং মন্দিরবাজারে শাসকদল এগিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত নানা কাটাকুটির অঙ্ক সামলে ফল কোথায় গিয়ে ঠেকে, তা জানা যাবে ৪ মে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal Politics West Bengal government Kulpi

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy