প্রতিপক্ষ একই থাকল। শুধু মাঠ বদলে গেল! রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনে এ বারে সেই ছবি দেখার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না!
দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর কেন্দ্রে মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ওজনদার প্রার্থী দেওয়ার পক্ষে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বৈঠকে এ বার জোরদার সওয়াল উঠেছে। সূত্রের খবর, বিজেপির কেন্দ্রীয় ও রাজ্য নেতৃত্বের একাংশ চাইছেন, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী ভবানীপুরের মাঠে শাসক দলের সর্বাধিনায়িকার সঙ্গে টক্কর নিন। কারণ, শুভেন্দুর চেয়ে উপযুক্ত এবং ওজনদার প্রার্থী বিজেপি আর পাবে কোথায়! তবে সাংগঠনিক কারণেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের চূড়ান্ত সম্মতির অপেক্ষা চলছে। সম্মতি মিলতেই দ্রুত এই বিষয়ে ঘোষণা হতে পারে। প্রধানত উত্তরবঙ্গ ও রাঢ়বঙ্গের বেশির ভাগ আসনের প্রার্থী ঠিক হয়ে গিয়েছে বিজেপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটিতে।
দিল্লিতে বিজেপির প্রাক্তন সর্বভারতীয় সভাপতি জগৎ প্রকাশ নড্ডার বাড়িতে দু’দিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে দলের প্রার্থী তালিকা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন ও সাংগঠনিক কাজের সঙ্গে যুক্ত কেন্দ্রীয় নেতারা সকলেই দলের রাজ্য নেতৃত্বের পাশাপাশি ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। রাজ্যে বিজেপির বর্তমান বিধায়কদের মধ্যে কারা ফের টিকিট পাবেন, সেই তালিকা কার্যত পাকা হয়ে গিয়েছে এবং প্রত্যাশিত ভাবেই সেখানে বিরোধী দলনেতার নাম আছে। পাঁচ বছর আগে পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম থেকে ১৯৫৬ ভোটে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী, মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে হারিয়েছিলেন শুভেন্দু। বিজেপির অন্দরে সাংগঠনিক টানাপড়েন রয়ে গিয়েছে এই জায়গাতেই।
সূত্রের খবর, শুভেন্দু নিজে নন্দীগ্রাম ছেড়ে দিতে রাজি নন। তাঁর যুক্তি, লোকসভার সাংসদ-পদে ইস্তফা দিয়ে ২০১৬ সালে তিনি নন্দীগ্রাম থেকে তৃণমূলের বিধায়ক হয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু জমি আন্দোলনের সূত্রে নন্দীগ্রামের মানুষের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক সেই ২০০৬ সাল থেকে। কুড়ি বছরের সেই সম্পর্ক এর কথায় ঝেড়ে ফেলার কারণ নেই। তার পাশাপাশিই দলের আলোচনায় এসেছে, মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে ২০২১ সালে যখন শুভেন্দু পরাজিত করেছিলেন, তখন সেখানে বিজেপির প্রায় কিছুই ছিল না। অত অল্প সময়ে নন্দীগ্রামে যদি জয় বার করে আনা যায়, তা হলে ভবানীপুরে পাঁচ বছর আগের নন্দীগ্রামের তুলনায় ‘অনুকূল’ পরিবেশে এবং টানা বেশ কিছু দিন ধরে প্রস্তুতি নিয়ে রেখে সেই চেষ্টা করা যাবে না কেন? সে ক্ষেত্রে নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর, দুই কেন্দ্র থেকেই একসঙ্গে প্রার্থী করতে হয় শুভেন্দুকে। সেই পথে কি বিজেপি হাঁটতে পারবে? কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তেমন সিদ্ধান্ত নিলে শুভেন্দু তা-ই করবেন বলেই সূত্রের খবর।
বিজেপির অন্দরে আলোচনা হয়েছে, অতীতে ভবানীপুরে বা গত লোকসভা নির্বাচনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডায়মন্ড হারবারে প্রার্থী ঘোষণা করতে দেরি হয়েছিল দলের। তাতে ক্ষতিই হয়েছিল। এ বার বিধানসভা আসনের প্রথম তালিকাতেই ভবানীপুরকে রাখা হতে পারে। একটি সূত্রের ইঙ্গিত, প্রধানমন্ত্রী মোদী কলকাতায় সমাবেশ করে যাওয়ার পরেই এক-দু’দিনের মধ্যে প্রথম প্রার্থী তালিকা ঘোষণা হয়ে যেতে পারে।
ভবানীপুর কেন্দ্রে গত কয়েকটি নির্বাচনেই কলকাতার অন্যান্য অনেক জায়গার তুলনায় ভাল ফল করেছে বিজেপি। বিধানসভার নিরিখে দেখতে গেলে, ২০১১ সালে ভবানীপুরে বিজেপি প্রার্থী রামচন্দ্র জায়সওয়াল যেখানে পাঁচ হাজার ভোট পেয়েছিলেন, ২০১৬ সালে প্রার্থী চন্দ্রকুমার বসু সেই জায়গায় ২৬ হাজার ভোট পেয়েছিলেন। বিজেপি প্রার্থী রুদ্রনীল ঘোষ ২০২১ সালে (মমতা তখন প্রার্থী নন) সেই ভোট তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন ৪৪ হাজারে। পরে উপ-নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী প্রিয়ঙ্কা টিবরেওয়াল আবার নেমে এসেছিলেন ২৬ হাজারে। তবে উপ-নির্বাচনকে সূচক ধরতে রাজি নন বিজেপি নেতৃত্ব। তাঁদের অঙ্ক, দক্ষিণ কলকাতার ওই কেন্দ্রে গুজরাতি, শিখ, বিহারি, ওড়িয়া-সহ অ-বাঙালি ভোট আছে ভাল পরিমাণে। এই রকম পরিস্থিতিতে ভবানীপুরে শুভেন্দু প্রার্থী হলে মুখ্যমন্ত্রীকে ‘ঘিরে ফেলা’ সম্ভব।
শুভেন্দু বলছেন, ‘‘লড়াইটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে। সুতরাং, মুখ্যমন্ত্রীকে ছাড় দেওয়ার কোনও প্রশ্ন নেই। দলীয় নেতৃত্ব যা চূড়ান্ত করবেন, আমি তৈরি!’’ দক্ষিণ কলকাতায় তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটিতে বিরোধী দলনেতা নিজেই যদি মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেন, তা হলে জনমানসে এবং দলীয় কর্মীদের একই সঙ্গে বার্তা দিতে সুবিধা বিজেপির। দলের এক নেতার মন্তব্য, ‘‘মুখ্যমন্ত্রীই এখন প্রার্থনা করছেন, শুভেন্দু যাতে ওখানে প্রার্থী না হন!’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)