গোলমাল পাকাতে পারে বা নথিভুক্ত অপরাধী—এমন হাজারের বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করার বার্তা রাজ্য পুলিশের ডিজিকে (ঘটনাচক্রে, ওই দিনই ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্তের কর্মজীবনের মেয়াদ ছ’মাস বৃদ্ধি করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার) সোমবার রাতেই দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। রাতভর তল্লাশির পরে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত তেমন আরও প্রায় এক হাজার জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। কর্তাদের একাংশের মতে, গ্রেফতারির সংখ্যা ছাপিয়ে গিয়েছে প্রথম দফার গ্রেফতারির সংখ্যাকেও। নির্বাচন কমিশন সূত্রের বক্তব্য, বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা গোলমাল-হুমকি-ভীতি প্রদর্শনের বহু অভিযোগ আসছে কন্ট্রোল রুমে। সেগুলির ভিত্তিতে নামের তালিকা তৈরি হয়েছে। সেই অভিযোগের সত্যতা খতিয়ে দেখে তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করবে পুলিশ।
অতীত-ভোটের ইতিহাস ঘেঁটে অপরাধ এবং অপরাধীদের তথ্য সংগ্রহ করা প্রতি নির্বাচনী প্রস্তুতির রীতি। দেখা হয় কোথায় কোথায় কেমন অশান্তি-গোলমাল হয়েছিল, কোথায় ভোটারদের ভয় দেখানো বা বাধা দেওয়া হয়েছিল ভোটকেন্দ্র পর্যন্ত যেতে। এমনকি নথিবদ্ধ সেই অপরাধীরা ছাড়াও নতুন করে কে বা কারা গোলমাল পাকাতে পারে, তারও তথ্য তৈরি করা হয়। পাশাপাশি, জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানাগুলি কার্যকর করার সঙ্গে ‘প্রিভেন্টিভ অ্যারেস্ট’ বা সতর্কতামূলক গ্রেফতার করার রীতি নতুন নয়। তবে এমন পদক্ষেপে সংখ্যার দিক থেকে প্রথম দফার ভোটকেও ছাপিয়ে গিয়েছে দ্বিতীয় দফা। আজ, বুধবার দ্বিতীয় দফার ভোটের ৬০ ঘন্টা আগে থেকে গ্রেফতারির যে গতি, তাতে ১৪২টি বিধানসভা কেন্দ্র মিলিয়ে মোট গ্রেফতারির সংখ্যা ২,৪৭৩ ছাড়িয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যেই। প্রশাসনিক সূত্রের বক্তব্য, প্রয়োজন মতো পদক্ষেপ হতে পারে ভোটের দিনেও। প্রসঙ্গত, প্রথম দফায় প্রায় দু’হাজার দুষ্কৃতী বা সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।
মঙ্গলবার সিইও মনোজ আগরওয়াল বলেন, “কমিশন এবং লোক ভবনে কন্ট্রোলরুম রয়েছে। গ্রাম-শহর থেকে অনেকে গোলমালের তথ্য জানান। পুলিশকে অভিযোগ জানানো রীতি। তাতে আইনের কোনও বাধা নেই। পুলিশ তদন্ত করে দেখবে তাদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ রয়েছে। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ এবং অবাধ রাখার দায়িত্ব পুলিশের। মানুষের অভিযোগ থাকলে ১৮০০৩৪৫০০০৮ নম্বরে ফোন করে যে কোনও মানুষ ভোট সংক্রান্ত যে কোনও অভিযোগ জানাতে পারেন। গণতন্ত্রে হুমকি-হিংসার কোনও জায়গা নেই।”
সোমবার রাতেই রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্তকে ১৮০ পাতার তথ্য পাঠায় কমিশন। তাতে দ্বিতীয় দফার ভোটে থাকা আটটি জেলা এবং ১৪২টি বিধানসভা কেন্দ্রের প্রতিটি ধরে ধরে এমন সন্দেহভাজন, দুষ্কৃতী, অপরাধীদের নাম উল্লেখ করা ছিল। বলে দেওয়া হয়েছে, ভারতীয় ন্যায় সংহিতার আওতায় পদক্ষেপ করতে পারে পুলিশ। যাতে ভয়ডরহীন, প্রভাব-হিংসামুক্ত ভোট নিশ্চিত করা যায়। তাতে বাকিদের সঙ্গে এলাকাভিত্তিক ভাবে প্রভাবশালী তৃণমূল নেতাদের নামও দেখা গিয়েছে তালিকায়। মগরাহাট পশ্চিমের শামিম আহমেদ থেকে ফলতার জাহাঙ্গির খান (তিনিও প্রার্থী), বাসন্তীর রাজা গাজী থেকে সন্দেশখালির শেখ শাহজাহান, শিবপ্রসাদ হাজরার নাম রয়েছে। উত্তর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার সংবেদনশীল এলাকাগুলির বহু প্রভাবশালী নেতা-কর্মীই সন্দেহভাজনদের তালিকায় যুক্ত হয়েছেন। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে জোর দেওয়া হয়েছে ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলার উপর। সেখানে আগেই অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কঠোর পদক্ষেপ করে কমিশন। সে এলাকায় বেশ কটি থানার ওসি-আইসিদের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ হয়েছে। এ বার প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে রাজ্য পুলিশ ডিজিকে পদক্ষেপের সুপারিশপাঠানো তাৎপর্যপূর্ণ।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)