এক দল অনেক শাখা। আর এই শাখাপ্রশাখার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে তৃণমূল রবিবারের ভোটে প্রায় দিশেহারা অবস্থায়। যেখানে ওজনদার সব প্রার্থী মুখে বলছেন, দারুণ ভোট হয়েছে, আমি জিতছি। অথচ তাঁদের সঙ্গীরা বেজার মুখ করে বসে আছেন। জনান্তিকে তাঁদের বক্তব্য, এই ‘আমি’টা যদি ‘আমরা’ হতো এই জেলায়, তবে সত্যি দল ভাল ফল করত। কিন্তু এখন যা অবস্থা, তাতে বিরোধীরা না ছক্কা মেরে বসে!
দক্ষিণ দিনাজপুরে বিধানসভা আসন মোট ছ’টিই। গত বারে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে এর পাঁচটিতে জিতেছিল তৃণমূল। ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে ছ’টিতেই ‘লিড’ পেয়েছিল তারা। যদিও সে বারে বিজেপি গড়ে ২০ শতাংশের মতো ভোট পেয়েছিল।
এ বার জোটের সঙ্গে সরাসরি লড়াইটা তাই প্রথম থেকেই কঠিন ছিল। তার উপরে যুদ্ধটা শুরু হয়ে গিয়েছিল দলের মধ্যেই। কোথাও বিপ্লব মিত্র বনাম শঙ্কর চক্রবর্তী, কোথাও বিপ্লব মিত্র বনাম সত্যেন রায়। এর মধ্যে ‘চতুর্থ শক্তি’ হিসেবে ঢুকে পড়েন সদ্য দলে ফেরা সোনা পাল। বিপ্লবের সঙ্গে তাঁর এতটাই ‘মধুর’ সম্পর্ক যে কথায় কথায় সোনার দিকে আঙুল তোলেন তৃণমূলের প্রাক্তন জেলা সভাপতি।
এ দিনও তার অন্যথা হয়নি। সকালে ঘনঘন ফোন গিয়েছে কলকাতার তৃণমূল ভবনে। বিপ্লববাবু বারবার বলতে চেয়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধে দলে অন্তর্ঘাত হচ্ছে। তাঁকে হারানোর চেষ্টা হচ্ছে। যদিও যে শীর্ষস্থানীয় নেতা ও প্রান্ত থেকে ফোন ধরেছেন, তিনি একটা কথা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন বিপ্লবকে— আগে ভোটটা ঠিক মতো করো। তার পরে এই নিয়ে কথা হবে।
তৃণমূল সূত্রেই খবর, বিপ্লবের অনুগামী তজমুল হক শনিবার রাতে গোলমাল বাঁধানোর চেষ্টা করেছিলেন। তখন দলেরই একাংশে হাতে তিনি মার খেয়ে যান। যদিও বিপ্লববাবু সে কথা মানতে চাননি। তিনি আঙুল তুলেছেন সোনা পালের দিকে।
সোনা নিজে কী করছেন? তিনি সকালেই বিপ্লববাবুর কেন্দ্র হরিরামপুর ছেড়ে চলে যান কুশমন্ডি। তার পরে গঙ্গারামপুর। পরে ঘরে বাড়িতে ফিরলেও এলাকায় বিশেষ ঘোরেননি। কেন? হাল্কা মেজাজে বসে সোনা বললেন, ‘‘আমি বাইরে বের হলে কাকুর (বিপ্লব) ভোট নাকি কমে যাবে। তাই ঘরে বসে আছি। যদিও হরিরামপুরে তৃণমূলের লোকজনই বলছেন, এখানে সোনাকে বাইরে বেরোতে হয় না। হাওয়াতেই কাজ হয়।
এত দিন পর্যন্ত বেশ ফুরফুরে লাগছিল শঙ্কর চক্রবর্তীকে। একে রাজ্যের মন্ত্রী, তার উপরে মাত্র কয়েক মাস আগে বিপ্লববাবুর বদলে তাঁকে দলের জেলা সভাপতি করা হয়। প্রচারও করছিলেন দাপিয়ে। এ দিন সকালে স্নান সেরে ভোট দিতে যান বালুরঘাটের শিশুমন্দির স্কুলের বুথে। তার পর বেরিয়ে দলের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। কিন্তু দল যে শনিবার রাতেই বড় ধাক্কা খেয়ে গিয়েছে। দলের বালুরঘাট টাউন সভাপতি অসিত রায় মোটরবাইকে ৬ নম্বর ওয়ার্ডে যাওয়ার পথে আচমকাই কুকুরের কামড় খান। বিরোধীদের দাবি, ভোটারদের হুমকি আর দাবড়ানি দিতে যাচ্ছিলেন উনি। পথে এই বিপত্তি। তৃণমূল প্রকাশ্যে সে কথা উড়িয়ে দিলেও জনান্তিকে কেউ কেউ বলছেন, একেবারে ডুবিয়ে দিল!
দলীয় দ্বন্দ্বে কয়েক দিন আগে পর্যন্ত যিনি সব থেকে বেশি ধাক্কা খেয়েছেন, যাঁকে জেলাশাসকের কাছে গিয়ে নালিশ করতে হয়েছে— তৃণমূলের এক গোষ্ঠী আমার বিরুদ্ধে ভোটে প্রচার করছে, গঙ্গারামপুরের প্রার্থী সেই সত্যেন রায়ও এ দিন দাবি করেন, ‘‘আমি জিতছি। নন্দনপুরেও লিড নেবো।’’ কিন্তু এ দিন নন্দনপুরের ছবি অন্য কথা বলেছে। ওই অঞ্চলের একাংশ বুথে তৃণমূলের কোনও পোলিং এজেন্ট ছিল না। রামপাড়া, চেঁচরাতেও তাই। পোলিং এজেন্ট থাকা-না থাকাটা বড় করতে দেখতে নারাজ তৃণমূলের লোকজন। কিন্তু বিরোধীরা বলছেন, এজেন্ট না থাকার মানে, ওদের হয়ে কাজ করতে মানুষ অস্বীকার করছে।
তিন মাসে দক্ষিণ দিনাজপুর বারবার শিরোনামে এসেছে তৃণমূলের গোষ্ঠীর মধ্যে কখনও বোমা-গুলি, কখনও হাতাহাতির জন্য। এ দিন কিন্তু জেলায় ভোট হয়েছে শান্তিতে। এ জন্য বালুরঘাটের জোট প্রার্থী বিশ্বনাথ চৌধুরী ধন্যবাদ দিয়েছেন নির্বাচন কমিশনকে। চরকি পাক দিয়েছেন দিনভর। জেলায় সব মিলিয়ে ৮৫%। তাতে জয়েরই ছবি দেখছেন তাঁরা।
আর তৃণমূল? দিনের শেষে সোনা পাল বললেন, ‘‘আগামী ১৯ মে (ভোট গণনার দিন) আমার বাবার মৃত্যুবার্ষিকী। মোম নিয়ে আসবেন।’’ তাঁর অনুগামীরা বলছেন, মোমবাতিটা কিন্তু আসলে দলের জন্যই চেয়ে রাখলেন সোনাদা!