এসআইআরের তপ্ত হাওয়া জোড়াফুলের চেনা বাগানে

পলাশিপাড়ার সাহেবনগর গ্রামে খেত থেকে ফিরেছেন জনা দশেক যুবক। গ্রামে আটটা বুথ, ভোটার আট হাজারের মতো।

সুস্মিত হালদার

শেষ আপডেট: ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ১০:২৫
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

চায়ের দোকানের সামনে দিয়ে গিয়েছে ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক। পিচ গলা গরমে রুমাল দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে একমধ্যবয়সি গলা চড়ালেন— “বিজেপি কোনও বিষয়ই নয়। এ বার তৃণমূলের প্রধান প্রতিপক্ষ এসআইআর।” তাঁর ব্যাখ্যা, “একটা কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩৮ হাজারের মতো নামবাদ গিয়েছে। তার মধ্যে শুধু বিবেচনাধীন তালিকা থেকেই প্রায় ২১ হাজার, যা গত বারের জয়ের ব্যবধানের সমান। আর কী লাগে!”

২০২১ সালে উত্তর নদিয়ার নাকাশিপাড়া কেন্দ্রে তৃণমূলের কল্লোল খাঁ জিতেছিলেন প্রায় ২১ হাজার ভোটে। লোকসভা ভোটে সেই ব্যবধান কমে দাঁড়ায় প্রায় ছ’হাজারে। এ বার এসআইআরের ধাক্কায় কার্যত বেসামাল দুর্গ রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন পাঁচ বারের বিধায়ক কল্লোল। প্রায় ৫৩শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটার থাকা তৃণমূলের এই ‘নিরাপদ’ কেন্দ্র এ বার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে।প্রায় একই অবস্থা মন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাসের কেন্দ্র কৃষ্ণনগর দক্ষিণ বা পলাশিপাড়াতেও। বিবেচনাধীন তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার শতাংশের বিচারে নদিয়া রাজ্যের শীর্ষে (প্রায় ৭৮ শতাংশ)। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ধর্মের ভিত্তিতে মেরুকরণের প্রবণতা।

পলাশিপাড়ার সাহেবনগর গ্রামে খেত থেকে ফিরেছেন জনা দশেক যুবক। গ্রামে আটটা বুথ, ভোটার আট হাজারের মতো। এক জন বলে দেন, “এই গ্রামে সবাই বিজেপি।এটা পুরো হিন্দুদের গ্রাম।” ও দিকে, সংখ্যালঘু প্রধান গ্রামগুলিতে আইএসএফ আর হুমায়ুন কবীরের আম জনতা উন্নয়ন পার্টি জমি পাওয়ার চেষ্টা করছে। দীর্ঘদিন পরে নিজেদের প্রতীক পেয়ে উচ্ছ্বসিত কংগ্রেস সমর্থকেরাও। এরা তৃণমূলের সংখ্যালঘু ভোট-ব্যাঙ্কে কতটা থাবা বসাবে, সেটাও প্রশ্ন।

গত বার কৃষ্ণনগর দক্ষিণে উজ্জ্বল বিশ্বাস জিতেছিলেন প্রায় ন’হাজার ভোটে। লোকসভা ভোটেতৃণমূলের মহুয়া মৈত্র ন’হাজার ভোটে পিছিয়ে ছিলেন। সেই জায়গায় প্রায় ২৪ হাজার নাম বাদ। পলাশিপাড়ায় সংখ্যালঘু ভোটার প্রায় ৫৩ শতাংশ। লোকসভা ভোটে এই কেন্দ্রে প্রায় ৩৪ হাজার ভোটে এগিয়ে ছিলতৃণমূল। সেখানে বাদ গিয়েছে প্রায় ২২ হাজার নাম। চাকরি-দুর্নীতিতে অভিযুক্ত মানিক ভট্টাচার্যকে সেখানে টিকিট দেয়নি দল। কিন্তু সে জায়গায় চাপড়ার বিধায়ক রুকবানুর রহমানকে এনে প্রার্থী করাও মানতে পারেনি দলের একাংশ। বিশেষত, জেলা পরিষদের কর্মাধ্যক্ষ প্রণয় ঘোষ টিকিট না পাওয়ায়হতাশ তাঁর অনুগামীরা। যদিও প্রার্থীকে নিয়ে প্রচারে নামতে দেখা যাচ্ছে অনেককে। পলাশিপাড়া বাজারে দাঁড়িয়ে বিজেপি কর্মীদের কটাক্ষ— “মিছিলে তো বেরোচ্ছেন, বুথে থাকবেন কি?” তবে উজ্জ্বলের দাবি, “কমিশনকে সামনে রেখেবিজেপি যত নাম কেটেছে, ততই মানুষ আরও বেশি করে আমাদের দিকে ঝুঁকছেন।”

কালীগঞ্জ কেন্দ্রে সংখ্যালঘু ভোটার প্রায় ৫৯ শতাংশ। সেখানেও অন্তর্ঘাতের গল্প আছে। কিন্তু মাথাব্যথার প্রধান কারণ সেই এসআইআর। এ বার এই কেন্দ্রে প্রার্থী প্রয়াত বিধায়কনাসিরুদ্দিন আহমেদের মেয়ে আলিফা আহমেদ। বছরখানেক আগে উপনির্বাচনে তিনি প্রায় ৪৭ হাজার ভোটে জিতলেও এ বার ততটা স্বস্তিতে নেই। গত লোকসভা ভোটে মহুয়া এই কেন্দ্রে প্রায় ৩১ হাজার ভোটে এগিয়ে ছিলেন। প্রধান সম্বল ছিল সংখ্যালঘু ভোট। কিন্তু এসআইআরে প্রায় ২৩ হাজার ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে এবং তার বেশির ভাগই সংখ্যালঘুদের নাম বলে জানাচ্ছেন স্থানীয় তৃণমূল নেতারা। ওই উপনির্বাচনের ফল প্রকাশের দিন বাড়িতে ছোড়া বোমায় মারা যায় সিপিএম সমর্থক পরিবারের দশ বছরের তামান্না শেখ। সুবিচারের দাবি নিয়ে সিপিএমের প্রার্থী হয়েছেন তার মা সাবিনা ইয়াসমিন। সেটাও তৃণমূলের পক্ষে স্বস্তির নয়।

তবে প্রায় ৭০ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটারের কেন্দ্র চাপড়ায় তৃণমূল তুলনামূলক ভাল জায়গায়রয়েছে। এই কেন্দ্রে প্রায় ৩০ হাজার ভোট কাটা গিয়েছে। গত বিধানসভা ভোটে চাপড়ায় রুকবানুর রহমান জিতেছিলেন প্রায় ১২ হাজার ভোটে। কিন্তু সে বার তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন দলেরই বিক্ষুব্ধ, নির্দল প্রার্থী হয়ে দাঁড়ানো জেবের শেখ। সেই জেবেরই এ বার দলের প্রার্থী। ফলে বড় সংখ্যক নাম বাদ গেলেও এই কেন্দ্র হাতছাড়া হবে না বলেই তৃণমূলের আশা।

উত্তর নদিয়ার আটটি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে একমাত্র কৃষ্ণনগর উত্তর ছাড়া, বাকি সব কেন্দ্রেই গত বার জিতেছিল তৃণমূল। গত বার এই কেন্দ্রে প্রায় ৩৫ হাজার ভোটে জেতেন মুকুল রায়।লোকসভা নির্বাচনে মহুয়া পিছিয়ে ছিলেন প্রায় ৫৩ হাজার ভোটে। এ বার এই কেন্দ্রে এসআইআরে বাদ গিয়েছে ২৬ হাজারের বেশি নাম। তবে বিজেপি প্রার্থী তারকনাথচট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে দলেরই একাংশ খুশি নয়— এমন কথাই ভরসা জোগাচ্ছে তৃণমূল কর্মীদের। অভিনেতা সোহম চক্রবর্তীকে করিমপুরে প্রার্থী করেছে তৃণমূল। সেখানে এখনও দলের একটা অংশ পুরোপুরি ময়দানে নামেনি। বাদ গিয়েছে প্রায় ১০ হাজার নাম। তার উপরে ধর্মীয় মেরুকরণ তীব্র।

সব মিলিয়ে ঘাসফুলের জমি নিয়ে চিন্তায় রয়েছে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের একাংশেই। পক্ষান্তরে, বিজেপির নদিয়া উত্তর সাংগঠনিক জেলা সভাপতি অর্জুন বিশ্বাসের কটাক্ষ, “মৃতেরা এ বার আর ভোট দিতে পারবে না! অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরাও পারবে না।”

গত বার তেহট্ট বিধানসভায় প্রায় সাত হাজার ভোটে জেতেন তৃণমূলের তাপস সাহা। আবার লোকসভা ভোটে তারা প্রায় আট হাজার ভোটে পিছিয়ে পড়ে। এই কেন্দ্রে প্রায় ১২ হাজার নাম বাদ গিয়েছে। সেই বাদের তালিকায় মতুয়া ও নমঃশূদ্র ভোটারেরাও আছেন। নাজিরপুরের এক মোটর গ্যারাজের মালিক তথা বিজেপির পরিচিত মুখ সুজয় বিশ্বাসের দাবি, “ওঁদের ভোট বাদ যাওয়ায় বিজেপির ভালই হয়েছে। তৃণমূল নেতারাই ওঁদের নথিপত্র বানিয়ে দিয়েছেন। ওঁরা তৃণমূলেরই ভোটার ছিলেন।” পাল্টা গলা চড়ছে তেহট্টের তৃণমূল প্রার্থী মতুয়া সম্প্রদায়ের দিলীপ পোদ্দারের। বলছেন, ‘‘যাঁরা ওঁদের ভোট দেন না, তাঁদের নাম কাটাটাই বিজেপির উদ্দেশ্য ছিল। সেটাই করেছে। মানুষ জবাব দেবেন।’’’

দিনের শেষেও গরম হাওয়া বইছে জাতীয় সড়কের এ পার থেকে ও পারে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

nakashipara TMC

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy