দু’দিনের সফরে কলকাতায় এসেছেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন। প্রথম দিনে যতগুলি বৈঠক করলেন এবং সেখানে যে বার্তা দিলেন বলে বিজেপি সূত্রে জানা যাচ্ছে, তাতে স্পষ্ট যে, আগামী পাঁচ সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গে নিজের দলের সর্বোচ্চ তৎপরতা নিশ্চিত করতে চাইছেন নিতিন। তবে সে প্রয়াসে কিছুটা ছন্দপতন ঘটল। নিতিনের সফরসূচিতে ‘কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক’-এর কথা স্পষ্ট ভাবে লেখা থাকলেও বাস্তবে তা ঘটল না। এ রাজ্যের দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর কেউই উপস্থিত হলেন না নিতিনের বৈঠকে। তাঁদেরকে এই বৈঠকের খবরই দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠল।
বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতির প্রথম দিনের সফরে চারটি বৈঠক নির্ধারিত ছিল। প্রথম বৈঠকটি ছিল কলকাতা এবং হাওড়া-হুগলি-মেদিনীপুর সাংগঠনিক জ়োনের সঙ্গে। বৈঠকে ডাক পেয়েছিলেন ওই দুই সাংগঠনিক অঞ্চলের শতাধিক প্রার্থী, সংশ্লিষ্ট জেলাগুলির বিজেপি নেতৃত্ব, বিধানসভা স্তরের পর্যবেক্ষক এবং বিস্তারকেরা। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তরফ থেকে নিতিন ছাড়াও ছিলেন সুনীল বনসল, ভূপেন্দ্র যাদব, মঙ্গল পাণ্ডে, বিপ্লব দেব, অমিত মালবীয়। রাজ্যের তরফ থেকে ছিলেন শমীক ভট্টাচার্য, শুভেন্দু অধিকারী, দিলীপ ঘোষ, রাহুল সিংহ, অমিতাভ চক্রবর্তী, সতীশ ঢোন্ড, লকেট চট্টোপাধ্যায়, জ্যোতির্ময় সিংহ মাহাতো, শশী অগ্নিহোত্রী। এক ঝাঁক নেতানেত্রীর এই হাজিরার মাঝে দুই উল্লেখযোগ্য গরহাজিরা নজর কেড়েছে। এ রাজ্য থেকে যে দু’জন নরেন্দ্র মোদীর মন্ত্রিসভায় রয়েছেন, সেই সুকান্ত মজুমদার এবং শান্তনু ঠাকুরকে দেখা যায়নি বৈঠকে। পরে শুধু কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে নিতিনের একটি ‘রুদ্ধদ্বার’ বৈঠক নির্ধারিত ছিল। বৈঠকটি হয়েছে। কিন্তু সুকান্ত-শান্তনু সেখানেও ছিলেন না। বিজেপি সূত্রের খবর, এ রাজ্যের দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে নিতিনের বৈঠকটির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে কোনও খবরই দেওয়া হয়নি।
সুকান্ত মঙ্গলবার সকালে কলকাতায় ছিলেন। নিতিনকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরেও গিয়েছিলেন। তার পরে তিনি উত্তরবঙ্গের উদ্দেশে রওনা হয়ে যান। আর সংসদের অধিবেশনে হাজির থাকতে শান্তনু রয়েছেন দিল্লিতে। সুকান্ত যে বৈঠকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পাননি, সে কথা তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল নিশ্চিত করেছে। শান্তনুও ফোনে আনন্দবাজার ডট কমকে বলেছেন, ‘‘আমাকে বৈঠকের বিষয়ে কেউ কিছু জানাননি।’’
দলের একাংশ আঙুল তুলছেন রাজ্য বিজেপির সংগঠন সম্পাদক অমিতাভ চক্রবর্তীর দিকে। এই ধরনের বৈঠকের খবর প্রথম সারির নেতৃত্বের কাছে পৌঁছে দেওয়া বা বৈঠকে প্রত্যাশিতদের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো সংগঠন সম্পাদক বা তাঁর দফতরেরই কাজ। তাই দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর আমন্ত্রণ না-পাওয়ার ঘটনায় অনেকেই অমিতাভকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন। বিজেপি সূত্র বলছে, গত সপ্তাহে প্রায় একই রকম ঘটনা অমিতাভ ঘটিয়েছেন আলিপুরদুয়ারের সাংসদ মনোজ টিগ্গার সঙ্গে। দ্বিতীয় দফার প্রার্থীতালিকা চূড়ান্ত করার জন্য সে দিন দিল্লিতে বিজেপির সর্বভারতীয় দফতরে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির বৈঠক ছিল। বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাঁদের ডাক পাওয়ার কথা ছিল, তাঁদের মধ্যে মনোজের নামও ছিল। বিজেপি সূত্র বলছে, মনোজকে অমিতাভ ফোন করে বৈঠকে যোগ দিতে বলেছিলেন। কিন্তু সন্ধ্যা ৭টা থেকে যে বৈঠক শুরু হওয়ার কথা, তাতে যোগ দেওয়ার জন্য মনোজ ফোন পেয়েছিলেন বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ। ডুয়ার্সের মাদারিহাট ব্লক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে দিল্লি পৌঁছোনো মনোজের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ফলে তিনি বৈঠকে যোগ দিতে পারেননি। এ বার সুকান্ত আর শান্তনুর ক্ষেত্রে আমন্ত্রণই না-পৌঁছোনোর অভিযোগ উঠল।
আরও পড়ুন:
মঙ্গলবার দু’টি সাংগঠনিক জ়োনের নেতৃত্ব এবং প্রার্থীদের নিয়ে যে বৈঠক হয়েছে, সেখানে নির্বাচনী প্রচার এবং জনসংযোগ নিয়ে একগুচ্ছ নির্দেশ দিয়েছেন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা। আরও এক বার সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে বুথ স্তরের কর্মীদের পূর্ণ মাত্রায় সক্রিয় করে তোলার উপরে। তাঁদের মাধ্যমে অন্তত তিন বার করে প্রত্যেক বাড়িতে পৌঁছে ভোট চাইতে বলা হয়েছে। দলের কোনও স্তরে কোনও নেতা বা কর্মী যাতে ক্ষুব্ধ হয়ে বসে না-থাকেন, তা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পুরনো কর্মী এবং প্রবীণ নেতাদের প্রত্যেককে ভোট অভিযানে সক্রিয় করে তুলতে বলা হয়েছে। দলের কোনও অংশ যাতে নিজেদের ‘অবাঞ্ছিত’ মনে না-করে, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। আর ভোটার তালিকা নিয়ে সক্রিয়তা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ যাঁদের নাম তালিকায় ওঠেনি বা বাদ পড়েছে, তাঁদের নাম তুলতে সক্রিয় হতে হবে। আর যাঁরা বিজেপির সম্ভাব্য ভোটার, তাঁদের সকলকে অবশ্যই ভোট দিতে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করতে হবে। রাজ্য বিজেপি-কে বলেছেন নিতিন, বনসল, ভূপেন্দ্ররা।