বসন্তের বেলা পশ্চিমে গড়িয়েছে। বিধাননগরের সেক্টর ফাইভে বিজেপির রাজ্য দফতরের সামনে জমজমাট ভিড়েও খানিক ভাটার টান। সকালের উৎসাহ-উদ্দীপনা বিকেলে খানিক কমেছে। সে সবের মধ্যেই গাড়ি থেকে নামলেন এক প্রবীণ। পড়ন্ত বেলার মতো শরীর-স্বাস্থ্যও পড়ন্ত, ঈষৎ অশক্ত। এক সতীর্থকে সঙ্গে নিয়ে গুটি গুটি ঢুকলেন বিজেপি দফতরে। এসেছেন সতীর্থকে প্রার্থী করার আর্জি পেশ করতে এবং সম্ভব হলে নিজের প্রার্থিপদের আবেদনটিও জমা দিয়ে যেতে।
কাজের মাঝেই বার বার ফোন বেজে উঠছিল কলকাতা হাই কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট নারায়ণচন্দ্র মণ্ডলের। প্রবীণ আইনজীবী নিজে তো বটেই, তাঁর সঙ্গীও বিরক্ত হচ্ছিলেন। শেষমেশ ফোন ধরে নারায়ণ যা শুনলেন, তা চমকপ্রদ!
নারায়ণের সঙ্গে বিজেপির সম্পর্ক অনেক পুরনো। ২০২১ সালে বসিরহাট উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রে তিনি বিজেপির প্রার্থী ছিলেন। হেরেছিলেন তো বটেই। তৃতীয় হয়েছিলেন। তার পরে আরও পাঁচটা বছর কেটে গিয়েছে। নারায়ণের বয়স সত্তর ছাড়িয়েছে। চালচলনে তার ছাপ বয়সের চেয়েও বেশি পড়েছে। এ হেন নারায়ণ গত ১৬ মার্চ যাঁকে সঙ্গে নিয়ে বিজেপি দফতরে ঢুকেছিলেন, তিনিও পেশায় আইনজীবী। আমডাঙা বিধানসভা কেন্দ্র থেকে তিনি প্রার্থী হতে চান। রাজ্য দফতরে নারায়ণের দীর্ঘ পরিচিতি কাজে লাগিয়ে তিনি নিজের আবেদনটি মসৃণ ভাবে জমা করাতে এসেছিলেন। কোন ঘরে, কার কাছে আবেদন জমা করতে হবে, সে সব নারায়ণ জানেন। নির্দিষ্ট ঘরে পৌঁছে প্রার্থিপদের আবেদন জমা নেওয়ার আর্জিও জানিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু বিজেপি দফতর তাঁদের জানায়, প্রার্থী হওয়ার আবেদন জমা নেওয়ার সময়সীমা পেরিয়ে গিয়েছে।
আরও পড়ুন:
কথাটা ঠিকই। যাঁরা প্রার্থী হতে চেয়ে আবেদন করছিলেন বা যাঁদের নাম বিভিন্ন সমীক্ষায় উঠে এসেছিল, তাঁদের নিয়ে রাজ্য নেতৃত্বের সঙ্গে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকদের বৈঠক তার আগেই হয়ে গিয়েছিল। প্রতিটি আসনের জন্য তিন-চারটি নামের তালিকা হাতে নিয়ে রাজ্য নেতৃত্ব তার পরে দিল্লি যান। সেখানে জেপি নড্ডার বাড়িতে দু’দফা বৈঠক করে আসনপ্রতি একটি করে নাম বেছে নেওয়ার কাজও সারা। তার পরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাড়িতে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির বৈঠকে শ’দেড়েক আসনে প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করা হয়ে গিয়েছে। বাকি শুধু ঘোষণা। সে কথাই নারায়ণ এবং তাঁর সঙ্গীকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন রাজ্য স্তরের দুই পদাধিকারী।
কিন্তু নারায়ণ সে সব শুনতে নারাজ। সঙ্গীর আবেদন তো তিনি জমা করাবেনই। সঙ্গে নিজের জন্যও তদ্বির শুরু করেছেন। বারবার বলছেন, তাঁর নিজের জন্য কোনও আবেদন তখনও জমা পড়েনি। আবেদন জমা না দিয়ে ফিরবেন না, এমনও মনস্থ করছেন। কিন্তু বারবার তাঁর ফোন বাজছে। সবই পরিচিতদের ফোন। নারায়ণ কোনওটা ধরছেন না। কোনওটা ধরে দরজার বাইরে গিয়ে বলে আসছেন, পরে ফোন করবেন। তবু ফোন বাজছেই। পরিস্থিতি দেখে নারায়ণের সঙ্গীর খানিক বিরক্তি, ‘‘এত বার ফোন বাজছে কেন!’’
নারায়ণ বিব্রত। যাঁকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন, তাঁর কাজ সুষ্ঠু ভাবে মেটাতে পারছেন না। নিজের কাজটাও করে উঠতে পারছেন না। আবার ফোন বাজল। এ বার তাঁর পুত্র। এ ফোন তো ধরতেই হয়। নারায়ণ ফোন ধরলেন এবং একরাশ বিরক্তি প্রকাশ করে জানতে চাইলেন, বলেই তো এসেছেন যে, জরুরি কাজে বিজেপি দফতরে এসেছেন! কেন সকলে বারবার ফোন করছে!
জবাব যা শুনলেন, তার জন্য সম্ভবত নারায়ণ তৈরি ছিলেন না— বিজেপির প্রথম দফার প্রার্থিতালিকা দিল্লি থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এবং সেই তালিকায় বসিরহাট উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থী হিসাবে তাঁর নাম রয়েছে! খবর শুনে যথারীতি বিস্মিত নারায়ণ। পরে বলছিলেন, ‘‘সত্যিই জানি না, কী ভাবে আমার নাম ঘোষিত হল। পার্টি অফিসে বসে ফোনটা পেয়ে অবাকই হয়েছিলাম!’’
তবে তাঁর চেয়েও বেশি অবাক হয়েছিলেন তাঁর সঙ্গী। যে নারায়ণ অতক্ষণ পাশে বসে আক্ষেপ করছিলেন প্রার্থী হওয়ার আবেদন জমা দিতে পারেননি বলে, তাঁর নামই প্রার্থী হিসাবে ঘোষিত হয়ে গেল! বিস্মিত হয়েছিলেন ঘটনাস্থলে হাজির সকলেই। আবেদন না-জানানো সত্ত্বেও কী করে প্রার্থী হলেন নারায়ণ?
বিজেপি সূত্রে নানা ব্যাখ্যা মিলছে। অনেকের মতে, নারায়ণ আগেও বসিরহাট উত্তরে বিজেপির টিকিটে লড়েছেন বলে সমীক্ষায় তাঁর নাম উঠে এসে থাকতে পারে। কেউ কেউ বলছেন, বিকল্প মুখ খুঁজে না-পেয়ে সংগঠনের তরফে ফের নারায়ণের নামই পাঠিয়ে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। অনেকে আবার বলছেন, নারায়ণ নিজে হয়তো স্থানীয় স্তরে আবেদন জানিয়েছিলেন বা ইচ্ছাপ্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু দলের রাজ্য দফতরে পৌঁছে আবেদন জমা না-দিলে এ বার টিকিট মিলবে কি না, সে বিষয়ে সম্ভবত নিশ্চিত ছিলেন না। তাই আরও একবার আবেদন জমা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
তার অবশ্য প্রয়োজন পড়েনি। আবেদন জমা দেওয়ার আগেই অভিনন্দন বার্তা পেয়ে গিয়েছেন নারায়ণ। ৪ মে ভোটগণনার দিনও কি তিনি এমনই কোনও ‘বিস্ময়কর আনন্দ’ পাবেন?