Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ ই-পেপার

চিত্র সংবাদ

Godman: কৃষক থেকে সন্ন্যাসী, জারদের ‘বশ করে’ রাশিয়ার সর্বেসর্বা, বিষেও মারা যায়নি রাসপুতিনকে

নিজস্ব প্রতিবেদন
১৩ জুন ২০২১ ০৯:০৪
জন্ম হয়েছিল দারিদ্র মাথায় নিয়ে। কিন্তু খেটে খাওয়া মানুষের দলে পড়তে চাননি তিনি। তাই সন্ন্যাসীর বেশকেই ভাগ্য পরিবর্তনের চাবিকাঠি বানিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। ফলও মিলেছিল হাতেনাতে। দু’বেলা দু’মুঠো না খেতে পাওয়া অবস্থা থেকে রাশিয়ার শাসন ক্ষমতার উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে ফেলেছিলেন।

বশ করে ফেলেছিলেন রাশিয়ার শেষ জার এবং তাঁর গোটা পরিবারকে। তাঁর কথায় উঠতেন বসতেন রাশিয়ার শাসক। জারের স্ত্রী তো বটেই, কন্যারাও রীতিমতো প্রেমে মজেছিলেন এই ‘সন্ন্যাসী’র। মৃত্যুর শতবর্ষ পরেও রাসপুতিনের নাম শুনলে কেঁপে ওঠেন রাশিয়ার মানুষ। আজও তাঁকে নিয়ে নানা কাহিনি ঘুরে বেড়ায় লোকমুখে। আলো-আঁধারির খেলা যাঁকে ঘিরে, কে সেই রাসপুতিন?
Advertisement
১৮৬৯ সালে রাশিয়ার প্রত্যন্ত গ্রাম পোক্রোভস্কোয়েতে এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম রাসপুতিনের। পুরো নাম গ্রিগরি ইয়েফিমোভিচ রাসপুতিন। শোনা যায়, রাসপুতিনের আগে আরও ৭ সন্তানের জন্ম দেন তাঁর বাবা-মা। কিন্তু কেউই বাঁচেনি। রাসপুতিনের জন্মের পর তাঁদের আরও এক সন্তান হয় বলে জানা যায়। কিন্তু ইতিহাসে তাঁর সম্পর্কে তেমন কোনও তথ্য নেই।

দরিদ্র পরিবারে যেখানে দু’মুঠো খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হত, সেখানে রাসপুতিনকে লেখাপড়া করাতে পারেননি তাঁর বাবা-মা। ছোট থেকে রাসপুতিন মুখচোরা হলেও, বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে নাম জড়াতে শুরু করে তাঁর। চুরি, মামলায় মিথ্যে সাক্ষী দেওয়া, ধর্মবোধে আঘাত করা, কৈশোর থেকে এই ধরনের নানা ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন তিনি।
Advertisement
যৌবনে প্রেমেও পড়েন রাসপুতিন। বিয়ে করেন প্রাসকোভিয়া দুব্রোভিনাকে। ৭ সন্তান হয় তাঁদের, যার মধ্যে ৩ জন বেঁচেছিল। তবে সংসার, দায়-দায়িত্ব এবং দারিদ্র একেবারেই পোষাত না রাসপুতিনের। বরং ধীরে ধীরে ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়েন তিনি। তবে তাঁর ধর্মবিশ্বাস ছিল আলাদা। রাসপুতিনের বিশ্বাস ছিল, একমাত্র অপরাধের মাধ্যমেই ঈশ্বরের কাছাকাছি পৌঁছনো সম্ভব।

সেই বিশ্বাস নিয়েই ধর্ম প্রচারে বেরিয়ে পড়েন রাসপুতিন। কয়েক বছরের মধ্যেই বেশ কিছু অনুগামী জুটিয়ে ফেলেন। সেই সূত্রে রাশিয়ার অভিজাত মহলেও তাঁর নাম শোনা যেতে শুরু করে। লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে, অসম্ভব শক্তিশালী রাসপুতিন। রোগীকে সামনে থেকে দেখে এবং স্পর্শ করেই দূরারোগ্য রোগ সারিয়ে ফেলেন। তাঁর কাছে আধুনিক চিকিৎসা নাকি ব্যর্থ।

সেই সময় রাশিয়ার শেষ জার দ্বিতীয় নিকোলাস আলেকজান্দ্রোভিচ রোমানভের শাসনকাল। তাঁর সন্তান এবং সিংহাসনের উত্তরাধিকারী অ্যালেক্সিস রক্ত জমাট না বাঁধার রোগে আক্রান্ত ছিলেন। সন্তান বাঁচবে কি না সেই আশঙ্কায় দিন কাটত দ্বিতীয় নিকোলাস এবং তাঁর স্ত্রী জারিনা আলেকজান্দ্রার। সেই সময় বন্ধুবান্ধবদের মাধ্যমে রাসপুতিনের কথা জানতে পারেন জারিনা।

সন্তানকে বাঁচাতে রাসপুতিনকে রাজধানীতে ডেকে পাঠান জারিনা। শোনা যায়, মন্ত্রবলে অ্যালেক্সিসের রক্তপাত বন্ধ করে দেন রাসপুতিন। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি। ছেলেকে মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচানোর জন্যই জার এবং তাঁর পরিবারের কাছে রাতারাতি রাসপুতিন ঈশ্বর-স্বরূপ হয়ে ওঠেন।

পারিবারিক সমস্যা তো বটেই, রাশিয়ার শাসনকার্যেও রাসপুতিনের মতামত নিতে শুরু করেন দ্বিতীয় নিকোলাস। সেই সময় অভিজাতরা বুঝতে পারেন, রাসপুতিনের ইশারাতেই চলছেন জার। রাসপুতিনের পছন্দের লোকজনকেই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হচ্ছে। এমনকি শোনা যায় রাসপুতিনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন জারের স্ত্রী। শুধু জারিনা নন, তাঁর মেয়েদের সঙ্গে রাসপুতিনের সম্পর্কের কথা ছড়িয়ে পড়ে। মত্ত অবস্থায় নানা পার্টিতে রাসপুতিন নিজে সে কথা সকলকে রসিয়ে রসিয়ে শোনাতে শুরু করেন। জার পুরোপুরি তাঁর নিয়ন্ত্রণে বলেও সদর্পে ঘোষণা করতে শোনা যায় তাঁকে।

এতেই রাশিয়ার অভিজাত সম্প্রদায়ের ক্ষোভের কারণ হয়ে ওঠেন রাসপুতিন। রাসপুতিনকে সরিয়ে জারকে সিংহাসনচ্যূত করতে উঠেপড়ে লাগেন তাঁরা। সেই মতো অভিজাতদের একটি গোষ্ঠী ১৯১৬ সালে একটি পার্টিতে রাসপুতিনকে ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে ওয়াইনে বিষ মিশিয়ে তাঁকে পান করানো হয়। কিন্তু তাতেও রাসপুতিনের শরীরে কোনও প্রতিক্রিয়া দেখা না দেওয়ায়, সায়ানাইড মেশানো পেস্ট্রি খাওয়ানো হয় তাঁকে।

কিন্তু বিষ মেশানো ওয়াইন এবং পেস্ট্রি খেয়েও রাসপুতিনের মধ্যে অসুস্থতার কোনও লক্ষণ দেখা যায়নি। বরং বিষ খাওয়ানো হয়েছে বুঝতে পেরে ষড়ন্ত্রকারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন রাসপুতিন। তাতে অস্থির হয়ে রাসপুতিনকে গুলি করা হয়। তার পর অজস্র বার কোপানো হয় তাঁকে। শেষমেশ তাঁর দেহ বরফ ঢাকা নেভা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।

রাসপুতিনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তে দেরি হয়নি। জার গোটা ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দেন। কিন্তু তত দিনে জারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ চরমে উঠেছে। সিংহাসন টিকিয়ে রাখতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয় জারকে। কিন্তু রাসপুতিনের মৃত্যুর তিন মাসের মধ্যেই সিংহাসনচ্যূত হন তিনি। তাঁর পরিবারকে জেলবন্দি করা হয়।

দ্বিতীয় নিকোলাসের হাত ধরেই রাশিয়ায় জার সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে। রাসপুতিনকেই জারদের পতনের জন্য দায়ী করেন ইতিহাসবিদরা। প্রাণের ভয়ে রাসপুতিনের পরিবার চিরকাল পালিয়ে বেঁচেছে। তাঁর মেয়ে মারিয়া শেষ জীবনে আমেরিকাতে ছিলেন। সার্কাসে নেচে প্রথম জীবনে রোজগার করতেন তিনি। বাবাকে নিয়ে বইও লিখেছেন মারিয়া। রাসপুতিনের সঙ্গে তাঁর মেয়ের মিল পান অনেকে। বাবার মতো তাঁর মধ্যেও অলৌকিক ক্ষমতা রাখেন বলে দাবি করতেন মারিয়া।