French President Emmanuel Macron adopts India Model to secure strategic partnerships in East Africa dgtl
France Adopts India Model
রাফাল জেট ও এইচ-১২৫ কপ্টারের চুক্তি! এ বার ‘ভারত মডেলে’ আফ্রিকায় পা রাখবেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁ?
ভারতের সঙ্গে একাধিক প্রতিরক্ষা এবং অস্ত্রচুক্তি সেরে ফেলেছে ফ্রান্স। আফ্রিকায় ‘কৌশলগত অংশীদারে’র সংখ্যা বাড়াতে এ বার দিল্লি মডেলকে অনুসরণ করবেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ?
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৭:১৪
Share:Save:
এই খবরটি সেভ করে রাখার জন্য পাশের আইকনটি ক্লিক করুন।
০১২০
ভারতসফরে এসে নয়াদিল্লির সঙ্গে একগুচ্ছ প্রতিরক্ষা চুক্তি সেরেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ। কী নেই তাতে! রাফাল লড়াকু জেট থেকে শুরু করে যৌথ উদ্যোগে এইচ-১২৫ কপ্টার নির্মাণ। শুধু তা-ই নয়, পুরনো প্রতিরক্ষা সমঝোতাগুলির পুনর্নবীকরণ করেছে দুই দেশ। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, গত কয়েক বছরে আফ্রিকার উপর অনেকটাই রাশ আলগা হয়ে গিয়েছে প্যারিসের। ‘অন্ধকার মহাদেশে’ হারানো জমি ফিরে পেতে মাক্রোঁর ভরসা ‘ভারত মডেল’?
০২২০
১৯ শতক থেকে আফ্রিকার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে উপনিবেশ গড়ে তোলে ফ্রান্স। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-’৪৫) পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে স্বাধীনতার স্বাদ পায় সেগুলি। কিন্তু তা সত্ত্বেও ‘অন্ধকার মহাদেশে’ প্যারিসের প্রভাব ফুরিয়ে যায়নি। মালি, বুরকিনা ফাসো, নাইজার, চাদ এবং সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকের মতো রাষ্ট্রগুলিতে ছিল বড় বড় ফরাসি সামরিক ঘাঁটি। ফলে প্যারিসে বসে তাদের ঘরোয়া রাজনীতিতে দিব্যি ‘নাক গলাতেন’ সেখানকার রাজনীতিবিদেরা।
০৩২০
তবে ২১ শতক আসতে আসতে এই অবস্থার ঘটে আমূল পরিবর্তন। মালি, বুরকিনা ফাসো, নাইজার, চাদ এবং সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকের মতো দেশগুলি থেকে পাততাড়ি গোটাতে বাধ্য হয় ফরাসি সেনা। একসময় সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী পদক্ষেপের নামে ‘অন্ধকার মহাদেশের’ বিভিন্ন এলাকায় শক্তি প্রদর্শন করত প্যারিসের ফৌজ। পরবর্তী কালে সেগুলিকেই ‘নব্য উপনিবেশবাদ’ এবং ‘আগ্রাসন’ হিসাবে দেখতে শুরু করে আফ্রিকাবাসী।
০৪২০
মালি, চাদ বা বুরকিনা ফাসোর মতো দেশগুলি থেকে ফরাসি সৈন্য সরতেই আফ্রিকার উপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করে প্যারিস। পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর (পড়ুন ২০২৫ সাল) ‘অন্ধকার মহাদেশ’টির ফ্রাঙ্কোফোন এলাকাগুলির উপরেও প্রভাব হারিয়ে ফেলে মাক্রোঁ প্রশাসন। ফ্রান্সের বিকল্প হিসাবে আফ্রিকাবাসী রাশিয়া এবং চিনকে বেছে নিয়েছে বললে অত্যুক্তি করা হবে না। ফলে সেখানকার নীতি পুনর্বিবেচনায় বাধ্য হয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট।
০৫২০
বর্তমানে ইউরোপ, আফ্রিকা এবং উত্তর আমেরিকা মিলিয়ে বিশ্বের ২৮টি দেশের নাগরিকদের মাতৃভাষা ফরাসি। এই তালিকায় সবচেয়ে এগিয়ে আফ্রিকা। সেখানকার ২০টা দেশে যাবতীয় কাজকর্ম হয় ফরাসি ভাষায়। সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলিকে ‘ফ্রাঙ্কোফোন’ বলে উল্লেখ করে থাকেন প্যারিসের রাজনৈতিক নেতৃত্ব। এ-হেন মালি, চাদ বা বুরকিনা ফাসোর মতো দেশগুলির উপরে প্রভাব হারিয়ে ফেলা যে প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁর জন্য বড় ধাক্কা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
০৬২০
১৯ এবং ২০ শতকে ফ্রান্সের অধিকাংশ উপনিবেশ ছিল পশ্চিম আফ্রিকাকেন্দ্রিক। সেখানকার রাশ আলগা হতেই ‘অন্ধকার মহাদেশ’টির পশ্চিম দিকে নজর দেয় প্যারিস। সম্প্রতি পুরনো অবস্থান থেকে সরে এসে কেনিয়ার সঙ্গে বহুপ্রতীক্ষিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি বা ডিসিএ-তে (ডিফেন্স কোঅপারেশন এগ্রিমেন্ট) সই করেন প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁ। এর মাধ্যমে যাবতীয় পুরনো কথা ভুলে গিয়ে আফ্রিকার সঙ্গে নতুন করে ফরাসিরা সম্পর্ক পাতল বলেই মনে করা হচ্ছে।
০৭২০
গত দু’দশক ধরে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি করতে ফ্রান্সের সঙ্গে কূটনৈতিক দৌত্য চালিয়ে গিয়েছে কেনিয়া। কিন্তু তা সত্ত্বেও ‘নাকউঁচু ভাব’ বজায় রেখেছিল প্যারিস। তবে শেষ পর্যন্ত ওই সমঝোতায় প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁর সবুজ সঙ্কেতকে বিশ্লেষকদের একাংশ ‘মাস্টারস্ট্রোক’ বলে মনে করছেন। কারণ এর জেরে ফের ‘অন্ধকার মহাদেশ’টির একাংশে পা রাখার সুযোগ পেতে পারে ফরাসি ফৌজ, যেটা তাদের সামনে রুশ ও চিনের উপর নজরদারির সুযোগ খুলে দেবে।
০৮২০
বিশ্লেষকদের দাবি, ফরাসি সৈন্য তাড়ানোর নেপথ্যে মালি, চাদ বা বুরকিনা ফাসোর মতো পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলির শাসকদের মনে একাধিক চিন্তাভাবনা কাজ করেছে। প্রথমত, এর মাধ্যমে সম্পূর্ণ স্বাধীনতার স্বাদ ফিরে পেয়েছেন তাঁরা। দ্বিতীয়ত, প্যারিসের শূন্যস্থান পূরণ করতে আসা রুশ ভাড়াটে বাহিনী ‘ওয়াগনার গ্রুপ’কে সামান্য শর্তে যে কোনও ধরনের কাজের জন্য রাজি করতে কোনও অসুবিধা হয়নি তাঁদের। উল্টে মিলেছে নিরাপত্তাজনিত আশ্বাস।
০৯২০
অন্য দিকে, আফ্রিকার উপরে প্রভাব হারিয়ে ফেলা ফ্রান্সের দিক দিয়েও কেনিয়াকে বেছে নেওয়ার নেপথ্যে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, মৌলিক ভাবে প্যারিসের উপর বিদ্বেষ পোষণ করে না পূর্ব আফ্রিকার এই দেশ। দ্বিতীয়ত, ধারাবাহিক ভাবে সামরিক অভ্যুত্থানের মুখে কখনওই পড়েনি নাইরোবি। বরং স্থিতিশীল ও নির্বাচিত একটি সরকার রয়েছে সেখানে, যা ‘অন্ধকার মহাদেশে’ ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম।
১০২০
তৃতীয়ত, ১৯ ও ২০ শতকে কেনিয়ায় ছিল না কোনও ফরাসি উপনিবেশ। ফলে মালি বা নাইজারের মতো প্যারিসের পরাধীনতার ‘দগদগে ঘা’ গায়ে নিয়ে চলতে হচ্ছে না তাদের। তা ছাড়া গত কয়েক দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সমঝোতা করেছে নাইরোবি। এই কারণে পূর্ব আফ্রিকার দেশটিতে বেড়েছে পশ্চিমি প্রভাব। ফলে সেখানে প্রবেশের রাস্তা যে ফ্রান্সের জন্য চওড়া হয়েছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
১১২০
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা মনে করেন, কেনিয়া-তানজ়ানিয়ার সোয়াহিলি উপকূল থেকে উত্তর আফ্রিকার সাহারা মরুভূমি সংলগ্ন সাহিল এলাকা পর্যন্ত সামরিক প্রভাব বিস্তারের স্বপ্ন রয়েছে ফ্রান্সের। নাইরোবির সঙ্গে প্রতিরক্ষা সমঝোতা চুক্তিকে তারই প্রথম ধাপ হিসাবে দেখছেন তাঁরা। যদিও এর মাধ্যমে পুরনো গৌরব প্যারিস ফিরে পাবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
১২২০
ফ্রান্সের সঙ্গে হওয়া প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিটির ব্যাপারে অবশ্য এখনও চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়নি কেনিয়ার পার্লামেন্ট। নাইরোবির আইনসভায় এই নিয়ে বিতর্কের ঝড় ওঠার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সমঝোতা অনুমোদন পেলে প্যারিসের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি করে নেবে পূর্ব আফ্রিকার ওই দেশ। পাশাপাশি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সামরিক প্রশিক্ষণ, শান্তিরক্ষা মিশন এবং মানবিক সহায়তার মতো বিষয়গুলিতে একসঙ্গে কাজ করতে দেখা যাবে দু’দেশের ফৌজকে।
১৩২০
এ ছাড়া চুক্তি অনুযায়ী কেনিয়ার থেকে আপৎকালীন পরিস্থিতিতে হাতিয়ার, গোলা-বারুদ, জ্বালানি এবং খাবারের মতো প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সাহায্য পাবে ফরাসি বাহিনী। তবে পাকাপাকি ভাবে তাদের কোনও সামরিক ঘাঁটি তৈরির অনুমতি দিচ্ছে না নাইরোবির প্রশাসন। এ-হেন প্রতিরক্ষা সমঝোতাকে একটা প্রশাসনিক কাঠামো এবং আইনি সুরক্ষার আওতায় রাখতে আগ্রহী পূর্ব আফ্রিকার ওই দেশ, যাতে কোনও আপত্তি দেখাচ্ছে না মাক্রোঁ সরকারও।
১৪২০
‘অন্ধকার মহাদেশ’টির পূর্ব দিকে ফ্রান্সের পা জমানোর চেষ্টা কোনও নতুন ঘটনা নয়। বর্তমানে জিবুতিতে ইউরোপীয় দেশটির সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। তা ছাড়া কোমোরোস দ্বীপপুঞ্জেও কয়েক লিজ়িয়ান বাহিনী মোতায়েন রেখেছে প্যারিস। সেখানকার মায়োত দ্বীপে আছে বেশ কিছু ফরাসি নৌসেনার একটা বড়সড় ছাউনি। গত কয়েক বছরে আফ্রিকায় কয়েক কোটি ডলার লগ্নি করেছে ফ্রান্স। কিন্তু সেখানে প্রভাব হ্রাস পাওয়ায় সেগুলির সবই হুমকির মুখে পড়েছে বলা চলে।
১৫২০
উদাহরণ হিসাবে মোজ়াম্বিকের প্রাকৃতিক গ্যাসের খনিগুলির কথা বলা যেতে পারে, যেখান থেকে ফি বছর মোটা টাকা রোজগারের সুযোগ রয়েছে ফরাসি সরকারের। কিন্তু, দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকার এই দেশটিতে স্থানীয় বিদ্রোহীদের যথেষ্ট দাপাদাপি রয়েছে, যা প্যারিসের কপালের ভাঁজকে গভীর করেছে। একই কথা রোয়ান্ডার প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
১৬২০
মাক্রোঁ সরকারের পূর্ব আফ্রিকা নিয়ে মাতামাতির নেপথ্যে আরও একটি কারণ রয়েছে। সাবেক সেনাকর্তাদের অনেকেই মনে করেন, ওই এলাকায় নিয়ন্ত্রণ পেলে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় প্রবেশ করা ফরাসি ফৌজির পক্ষে অনেক বেশি সহজ হবে, আগামী দিনে যা সংঘাতের নতুন ক্ষেত্রে বদলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে ষোলো আনা।
১৭২০
ফ্রান্সের নতুন আফ্রিকা নীতিকে মাক্রোঁর ‘ভারত মডেল’-এর সঙ্গে তুলনা টানা একেবারেই অমূলক নয়। কারণ, তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই নয়াদিল্লি ও প্যারিসের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রভূত উন্নতি হয়েছে। একসময় আন্তর্জাতিক মঞ্চে বহু ক্ষেত্রে পাকিস্তানের পাশে দাঁড়াত আইফেল টাওয়ারের দেশ। কিন্তু, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেখান থেকে ফ্রান্স যে পুরোপুরি সরে এসেছে, একথা অনস্বীকার্য।
১৮২০
গত বছর (পড়ুন ২০২৫ সাল) ভারতীয় অর্থনীতিকে ‘মৃত’ বলে তোপ দাগেন মার্কিন প্রেসি়ডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নয়াদিল্লির পণ্যের উপর চাপিয়ে দেন ৫০ শতাংশ শুল্ক। ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি ঘটে। সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে ছাড়েননি মাক্রোঁ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশ হিসাবে তখন থেকেই ভারতের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তির পক্ষে কথা বলতে শোনা যাচ্ছিল তাঁকে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এতে সই করে দু’পক্ষ।
১৯২০
‘কৌশলগত অংশীদার’ হিসাবে বর্তমানে প্যারিসের কাছে নয়াদিল্লির আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে মার্কিন নির্ভরশীলতা কমাতে চাইছে ফ্রান্স। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন’ বা নেটো সামরিক জোটের সদস্যপদ রয়েছে তাদের। ট্রাম্পের আমলে সংশ্লিষ্ট চুক্তিটি হুমকির মুখে পড়ায় সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো প্যারিসের জন্য অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে। আর তাই ভারতকে কাছে পেতে এতটা মরিয়া ভাব দেখাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁ।
২০২০
ভারত-ফ্রান্স প্রতিরক্ষা সমঝোতা এবং অস্ত্র চুক্তি দুই দেশের ‘বন্ধুত্ব’কে আরও নিবিড় করবে বলেই মনে করেন বিশ্লেষকদের একাংশ। সেই একই মডেল আফ্রিকার ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে চাইছেন প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁ। তবে ‘অন্ধকার মহাদেশ’টির বহু এলাকাই পুড়ছে গৃহযুদ্ধের আগুনে। ফলে সেখানে কী ভাবে নিজেদের অবস্থান ইউরোপীয় দেশটি মজবুত করতে পারে, সেটাই এখন দেখার।