খনিজ তেল সমৃদ্ধ আলবার্টা প্রদেশটিকে কানাডা থেকে আলাদা করার চেষ্টা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানকার বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে আমেরিকার বিদেশ মন্ত্রকের কর্তা-ব্যক্তিদের ঘন ঘন বৈঠকে উঠছে সেই প্রশ্ন।
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:৫৪
Share:Save:
এই খবরটি সেভ করে রাখার জন্য পাশের আইকনটি ক্লিক করুন।
০১১৮
গ্রিনল্যান্ড দখলের স্বপ্ন এখনও পূরণ হয়নি। তার মধ্যেই কানাডার জমি কব্জা করার ছক কষছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প? অটোয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর নেতাদের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের ঘন ঘন বৈঠকে ঘনীভূত হচ্ছে সেই রহস্য। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই ওয়াশিংটনকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। যদিও উত্তরের প্রতিবেশীর যাবতীয় অভিযোগ নাকচ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশ মন্ত্রক।
০২১৮
সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের তরফে অটোয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মদত দেওয়ার খবর প্রকাশ্যে আনে সংবাদমাধ্যম দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমস। সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী, কানাডা থেকে আলবার্টাকে আলাদা করতে একরকম আদাজল খেয়ে লেগে পড়েছে ওয়াশিংটন। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ‘ম্যাপল পাতার দেশ’টির অন্যতম খনিজ তেল সমৃদ্ধ প্রদেশ হল আলবার্টা। তরল সোনার লোভেই কি সংশ্লিষ্ট এলাকাটির উপর নজর পড়েছে পোটাসের (প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস)? উঠছে প্রশ্ন।
০৩১৮
আমেরিকার উত্তরের প্রতিবেশী কানাডা ১০টি প্রদেশ এবং তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল (টেরিটোরিজ়) নিয়ে গঠিত। সংশ্লিষ্ট প্রদেশগুলির মধ্যে আলবার্টার অবস্থান দেশের পশ্চিম প্রান্তে। যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানার সঙ্গে আন্তর্জাতিক সীমান্ত ভাগ করে নিয়েছে অটোয়ার ওই খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সমৃদ্ধ এলাকা। তরল সোনার জন্যই কানাডার অর্থনীতিতে আলবার্টার গুরুত্ব অপরিসীম। তা ছাড়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে ফুলেফেঁপে উঠেছে সেখানকার পর্যটন ব্যবসা।
০৪১৮
এ-হেন আলবার্টা প্রদেশটির কানাডা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সাধ কিন্তু আজকের নয়। সেই লক্ষ্যে দীর্ঘ দিন ধরেই গণভোটের দাবি জানিয়ে আসছেন সেখানকার বাসিন্দারা। তাঁদের যুক্তি, অটোয়ার মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপির (গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট) সিংহভাগ দিচ্ছে আলবার্টা। আর তাই আলাদা দেশ হিসাবে তার স্বীকৃতি পাওয়া উচিত। এ ব্যাপারে উস্কানি দিতে সেখানে গজিয়ে উঠেছে আলবার্টা প্রসপেরিটি প্রজেক্ট (এএপি) নামের একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী।
০৫১৮
দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের এপ্রিল থেকে শুরু করে এ বছরের জানুয়ারির মধ্যে কানাডার ওই বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর নেতাদের সঙ্গে অন্তত তিন বার বৈঠক করেছেন মার্কিন বিদেশ মন্ত্রকের পদস্থ কর্তারা। বিষয়টি নজরে আসতেই তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ তোলেন আলবার্টার প্রতিবেশী ব্রিটিশ কলম্বিয়ার মুখ্যমন্ত্রী ডেভিড এবি। শুধু তা-ই নয়, ‘আগ্রাসী’ ট্রাম্পের ‘দৌরাত্ম্যের’ কথাও প্রধানমন্ত্রী কার্নির কানে তোলেন তিনি।
০৬১৮
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বিষয়টি নিয়ে বিবৃতি দেন কার্নি। তিনি বলেন, ‘‘কানাডার সার্বভৌমত্বকে অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের সম্মান করা উচিত।’’ তাঁর ওই মন্তব্যের পর সংবাদসংস্থা সিএনএনের প্রশ্নের মুখে পড়েন হোয়াইট হাউসের এক পদস্থ কর্তা। জবাবে অন্য যুক্তি দেন তিনি। বলেন, ‘‘অটোয়ার কোনও বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতার সঙ্গে বৈঠক করা হয়নি। আমরা সেখানকার সুশীল সমাজের কয়েক জনের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁদের সমর্থন জানানোর কোনও প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়নি।’’
০৭১৮
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, আলবার্টা প্রসপেরিটি প্রজেক্ট কোনও রাজনৈতিক দল নয়। কিন্তু তার পরেও রাজ্যের ৫০ লক্ষ বাসিন্দার মধ্যে তাদের বেশ জনভিত্তি রয়েছে। সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীটির ওয়েবসাইটে লেখা আছে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সমৃদ্ধি ও স্বাধীনতা রক্ষায় কাজ করছে তারা। নিজেদের শিক্ষামূলক সংগঠন হিসাবে দাবি করে এএপি। তবে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী যে আলবার্টাকে কানাডা থেকে আলাদা করার জনমত গড়ে তুলতে কিছুটা সক্ষম হয়েছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
০৮১৮
এএপির বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা-নেত্রীদের দাবি, আলবার্টার বাসিন্দাদের স্বার্থে কিছুই করছে না অটোয়া। উল্টে জলবায়ু পরিবর্তনের দোহাই দিয়ে তাদের খনিজ তেলের শিল্পকে ‘ভাতে মারার’ পরিকল্পনা রয়েছে কার্নি প্রশাসনের। তা ছাড়া কানাডার করব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারা মনে করেন, সংশ্লিষ্ট প্রদেশটি থেকে করবাবদ যে পরিমাণ অর্থ কানাডা সরকার পায়, তার সিকিভাগও সেখানকার বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে খরচ করছে না তারা।
০৯১৮
সম্প্রতি এই ইস্যুতে এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) একটি বিস্ফোরক পোস্ট করেন কানাডার এক বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা। তাঁর কথায়, ‘‘মার্কিন ট্রেজ়ারি দফতরের কর্তারা ৫০ হাজার কোটি ডলার ঋণ দিতে চাইছেন। মুক্ত ও স্বাধীন আলবার্টা গড়ে তুলতে যথেষ্ট আগ্রহী তাঁরা। আমাদের অবশ্যই তাঁদের প্রস্তাব গ্রহণ করা উচিত।’’
১০১৮
অন্য দিকে, এ ব্যাপারে গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন মার্কিন ট্রেজ়ারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট। রিয়্যাল আমেরিকাজ় ভয়েসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘‘আলবার্টার অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। কিন্তু কানাডার সরকার সেখান থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে কোনও পাইপলাইন বিছোবে না। ফলে ওই প্রদেশটিকে আমাদের দিকে আসতে দেওয়া উচিত। কারণ ওরা আমাদের স্বাভাবিক অংশীদার।’’
১১১৮
বিশেষজ্ঞরা অবশ্য মনে করেন, ট্রাম্পের পক্ষে আলবার্টাকে কব্জা করা মোটেই সহজ নয়। কারণ, সেখানকার রাজনীতিতে রক্ষণশীল দলের বড় ভূমিকা রয়েছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী কার্নিও একজন আলবার্টান। খনিজ তেল সমৃদ্ধ প্রদেশটির এডমন্টনে কেটেছে তাঁর ছেলেবেলা। এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা অটোয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামে সেখানকার বাসিন্দারা ছিলেন সামনের সারিতে।
১২১৮
২০২৪ সালের নভেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হন ট্রাম্প। ভোটে জিতেই কানাডাকে নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন তিনি। উত্তরের প্রতিবেশীটিকে আমেরিকার ৫১তম প্রদেশ বানাতে চান বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেন তিনি। তাঁর ওই মন্তব্যের জেরে দুনিয়া জুড়ে পড়ে যায় শোরগোল। শুধু তা-ই নয়, শপথ নিয়েই তিনি অটোয়া আক্রমণের নির্দেশ দিতে পারেন বলে জল্পনা ছড়িয়েছিল।
১৩১৮
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করেন কানাডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। তাঁকে সে ভাবে পাত্তাই দেননি পোটাস। উল্টে প্রকাশ্যে ট্রুডোকে গভর্নর বলে সম্বোধন করেন ট্রাম্প। বলেন, ‘‘কানাডা ৫১তম প্রদেশ হলে ওই পদ পাবেন জাস্টিন।’’ এতে কানাডার প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক জীবন প্রায় শেষ হয়ে যায়।
১৪১৮
ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ সেরে দেশে ফেরার পরই প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েন ট্রুডো। তখনই প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন তিনি। তাঁর জায়গায় আসেন কার্নি। দু’জনে অবশ্য একই রাজনৈতিক দলের নেতা। তবে সরকার পরিচালনায় কিছুটা ভিন্ন মত রয়েছে কার্নির। কুর্সিতে বসেই তিনি জানিয়ে দেন, কোনও অবস্থাতেই আমেরিকার কাছে মাথা নত করবে না অটোয়া।
১৫১৮
এই আবহে গত বছর (২০২৫ সাল) কানাডাকে আমেরিকার অংশ করতে বড় প্রস্তাব দেন ট্রাম্প। বলেন, ‘‘যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম প্রদেশ হলেই ‘গোল্ডেন ডোম’ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে অটোয়া। নইলে গুনতে হবে ৬১০০ কোটি ডলার। আমাদের সঙ্গে থাকলে খরচ শূন্য ডলার!’’ ট্রাম্পের ওই মন্তব্যের পর সরাসরি কোনও প্রতিক্রিয়া দেয়নি কার্নি প্রশাসন। তবে সার্বভৌমত্ব যে সবার আগে সেটা বুঝিয়েছে অটোয়া।
১৬১৮
গত বছরের মে মাসে ‘গোল্ডেন ডোম’ তৈরির কথা ঘোষণা করেন ট্রাম্প। আমেরিকাকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে বাঁচাতে এই নতুন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়াশিংটন। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে আমেরিকার কোষাগার থেকে দিতে হবে প্রায় ১৭ হাজার ৫০০ কোটি ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৫ লক্ষ কোটি টাকা)। ট্রাম্পের অনুমান, ২০২৯ সালের মধ্যেই আমেরিকার হাতে চলে আসবে এই নয়া আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
১৭১৮
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আলবার্টাকে ভাঙার দ্বিতীয় সমস্যা হল, পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলির সঙ্গে কার্নির সুসম্পর্ক। গত বছর শপথ নিয়েই ব্রিটেন এবং ফ্রান্স সফর করেন তিনি। সম্প্রতি ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখল করতে চাইলে সরাসরি তার বিরোধিতা করেছে অটোয়া। এ ব্যাপারে পশ্চিম ইউরোপীয় ‘বন্ধু’দের পাশে দাঁড়াতে দেখা গিয়েছে কার্নিকে।
১৮১৮
ক্ষমতায় থাকাকালীন ভারতের খলিস্তানপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মদত দিচ্ছিলেন ট্রুডো। ফলে অটোয়ার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক যথেষ্ট খারাপ হয় নয়াদিল্লির। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর রাতারাতি ঘুরে গিয়েছে সেই বাজি। এখন নিজেদের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সামলাতেই হিমসিম খেতে হচ্ছে কানাডাকে। কার্নি শেষ পর্যন্ত এই চ্যালেঞ্জ কী ভাবে সামলান সেটাই এখন দেখার।