Follow us on
Powered by
Co-Powered by
Co-Sponsors
Powered by
Co-Powered by
Co-Sponsors

শিল কাটাও থেকে শানওয়ালা, লকডাউন ফিরিয়ে দিল হারিয়ে যাওয়া ফেরিওয়ালার ডাক

রাস্তায় কোনও সমস্যায় পড়ে কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করলে এখনও উত্তর পাই। এখনও এই শহরে মিছিল হয়। এখনও এই শহর নিয়ম না মেনে চলে। এই সব কারণের জন্যই জন্যই কলকাতা খুব প্রিয়।

লোপামুদ্রা মিত্র
কলকাতা| ০৩ মার্চ ২০২১ ১৮:৪৪ শেষ আপডেট: ০৩ মার্চ ২০২১ ১৮:৪৪
লোপামুদ্রা মিত্র, সঙ্গীতশিল্পী
লোপামুদ্রা মিত্র, সঙ্গীতশিল্পী

অনেক সমস্যা থাকলেও কলকাতাই আমার প্রিয়তম শহর। এখনও এ শহরে আমি প্রাণের ছোঁয়া পাই। রাস্তায় কোনও সমস্যায় পড়ে কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করলে এখনও উত্তর পাই। এখনও এই শহরে মিছিল হয়। এখনও এই শহর নিয়ম না মেনে চলে। এই সব কারণের জন্যই জন্যই কলকাতা খুব প্রিয়।

কলকাতা আমার কাছে খুব সুন্দরীও। কিছু কিছু জায়গায় এই শহরকে দেখতে আমার এত ভাল লাগে যে বিদেশের যে কোনও শহরও তার কাছে হার মেনে যাবে। যেমন, দ্বিতীয় হুগলি সেতু থেকে এই শহরের আকাশসীমা এত অপূর্ব আমার কাছে, পৃথিবীর যে কোনও শহরের রূপ তার কাছে ম্লান।

ভাষা-ধর্ম-জাতি নির্বিশেষে সকলে মিলেমিশে কলকাতায় থাকেন। কলকাতার সেই বৈশিষ্ট আমার কাছে অনন্য। আর একটা ভাললাগার জিনিস ইদানীং একটু কমে গিয়েছে। আগে দেখতাম, কলকাতার অবাঙালিরাও খুব সুন্দর বাংলা বলছেন। এখন সেই প্রবণতা একটু কমে গিয়েছে। সেটা শুধু অবাঙালি বলে নয়। আসলে, এই প্রজন্মে বাংলা বলার প্রবণতাই কিন্তু বেশ কমে গিয়েছে।

এ রকম প্রবণতা, পরিবর্তন তো আসা-যাওয়া করবেই। কিন্তু কলকাতার কিছু জিনিস চিরকালীন। তার মধ্যে প্রথমেই বলব খাবারের স্বাদ। এ শহরের রাস্তার কিছু দোকান কি সাঙ্ঘাতিক জনপ্রিয়! হয়তো সে রকম চকচকে নয়। কিন্তু শুধু খাবারের স্বাদ ও গুণমানকে ভরসা করে বাজিমাত করে চলেছে দশকের পর দশক। লেক মার্কেটে রাধুবাবুর চায়ের দোকানের কথাই ধরুন। ছোট থেকে দেখে আসছি দোকানটিকে। তার সেই পুরনো স্টিলের থালা, কাচের কাপ প্লেটই আমার কাছে খুব প্রিয়। তার পর চিনেপাড়া, টেরিটি বাজারের চিনে খাবার তো আছেই। কলকাতার রাস্তায়, বিশেষত বিবেকানন্দ পার্কে যে ফুচকা পাওয়া যায়, তার স্বাদকেই কোনও গোলগাপ্পা বা পানিপুরি টেক্কা দিতে পারবে না।

এখন তো অনেক দোকান হয়েছে। কিছু দিন আগে অবধি কলকাতার ছোট্ট দোকানেও যে রোল পাওয়া যেত, তার স্বাদ ছিল সেরার সের। কলকাতার খাবারের কথা বললে মিষ্টির তো আসবেই। আচ্ছা বলুন তো, গিরীশচন্দ্র দে-এর দোকানের নলেনগুড়ের কড়াপাকের ছোট্ট সন্দেশ কলকাতা ছাড়া অন্য কোথাও পাব?

গত এক বছরে লকডাউনের কলকাতায় কিন্তু বেশ কিছু অন্যরকম ছবি দেখলাম। হঠাৎ করে কোথা থেকে যেন শহরের রাজপথে হাজির ছোটবেলার বাঁশিওয়ালা। নিস্তব্ধ দুপুরে পাড়ার গলিতে হেঁকে যাচ্ছে ‘শিল কাটাও’ অথবা গৃহস্থের কাছ থেকে পুরনো বেনারসী কেনার ডাক। ছুটির সকালে বঁটি, ছুরিতে ধার বাড়ানোর জন্য তাঁর সাইকেল নিয়ে হাজির হচ্ছেন শানওয়ালা। একটু বেলা বাড়তেই আসছে চাবি করানোর কারিগরের ঝনঝনাৎ আওয়াজ। সদ্য পড়া গরমের তপ্ত দুপুর পেরিয়ে বিকেল পড়তেই শোনা যাচ্ছে ঘটিগরমওয়ালার ঘুঙুরের শব্দ। তাঁরা তো কেউ হাঁক দেন না। ওই শব্দই তাঁদের পরিচয়। ভালমন্দ জানি না, আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, অতিমারি আর লকডাউনই কলকাতাকে ফিরিয়ে দিয়েছে হারিয়ে যাওয়া এই ফেরিওয়ালাদের। হয়তো তাঁরা অন্য কাজে ছিলেন। কাজ হারিয়ে ফিরে এসেছেন পারিবারিক পুরনো পেশায়।

কলকাতার বাসিন্দা হিসেবে আমি কিন্তু ঘোরতর দক্ষিণী। থাকার জন্য দক্ষিণ কলকাতা ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেই পারি না। তবে উত্তর কলকাতার যে জিনিসটা সবথেকে বেশি ভাল লাগে তা হল আঁকড়ে থাকা। আমার প্রচুর বন্ধু বান্ধব আছেন সেখানে। পুরনো ঐতিহ্যকে রক্ষা করে থাকতে ভালবাসে উত্তর কলকাতা।

যতই বাইরে যাই না কেন, ফিরে আসি এই শহরেই। আসলে, কলকাতার ভালমন্দ সব কিছু জীবনের সঙ্গে এত জড়িয়ে গিয়েছে যে, মন্দ দিকগুলো চোখে পড়ে না। মাঝে মাঝে কলকাতা ছেড়ে বাইরে বেড়াতে যেতে মন্দ লাগে না। খোলা হাওয়ায় খোলামেলা ভাবে কিছু দিন কাটিয়ে এলাম। কিন্তু পাকাপাকি ভাবে থিতু হওয়ার জন্য কলকাতার কোনও বিকল্পের প্রশ্নই ওঠে না। এত ভাল গণপরিবহণ কোথায় পাব? গাড়ি না থাকলেও দিব্যি অটোয় অটোয় শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে আসা যায়। এত সস্তায় মাছভাতের পাইস হোটেল অন্য কোথাও আছে? তাদের রান্নার স্বাদও অপূর্ব। আমি খুব ভালবাসি সেখানে খেতেও। কলকাতার মতো সুদর্শন এবং সপ্রতিভ পুলিশও ভারতবর্ষের অন্য কোনও শহরে দেখিনি।

কলকাতার মতো নির্ভেজাল আড্ডাও অন্য শহরে নেই। অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পরে ওই যে বলে না, ‘যাই, একটু ঘুরে আসি’, মানে একটু পাড়া বেরিয়ে আসি— এই বলাটাও দেশের অন্য শহরে সম্ভব নয়। কারণ সেখানে এই পাড়া সংস্কৃতি নেই। এটা বোধহয় বাঙালিদের বিশেষত্ব।

আমি চাই, কলকাতা যেমন আছে, তেমনটাই থাক। শুধু হোর্ডিং কমে গিয়ে আকাশটাকে যদি আরও একটু বেশি দেখতে পেতাম, ভাল হত। আমরা ভালটাকে এড়িয়ে খুঁতটাকে দেখতে খুব ভালবাসি। আমাদের কারও চোখেই পড়ে না কলকাতার কী সুন্দর একটা গড়ের মাঠ আছে। তার পাশ দিয়ে ট্রাম গেলে দেখতে কী ভাল লাগে। আমাদের খেয়ালই থাকে না সুন্দরী এই শহরে বসন্তও আসে। এই সময়ে গড়ের মাঠের চারপাশ-সহ সারা শহরের রূপই পাল্টে যায়। আমপানে অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তার পরেও মধুমাসে কলকাতায় ছড়িয়ে থাকে শিমুল আর পলাশ।

তার পরেও অনেকের কাছে কলকাতার সমালোচনা শুনি। কিন্তু আমার মনে হয়, কলকাতা তো পরিকল্পিত শহর নয়। তার পরেও যে সে এতটা পথ পাড়ি দিয়েছে, সেটা কলকাতা বলেই সম্ভব হয়েছে।

আরও পড়ুন