Follow us on
Powered by
Co-Powered by
Co-Sponsors
Powered by
Co-Powered by
Co-Sponsors

বাঙালির পর্যটন মানচিত্রে জনপ্রিয় হোক খাজুরাহোর ভাস্কর্যও

১৩৩৫ থেকে ১৩৪২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতে থাকার সময়ে ইবন বতুতার সফরনামায় উঠে এসেছে ‘কাজারা’-র মন্দিরের কথা।

অর্পিতা রায়চৌধুরী
| ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৫:৪৮ শেষ আপডেট: ০৬ মার্চ ২০২১ ২৩:১৪
ছতরপুর জেলার খাজুরাহো মন্দির প্রাঙ্গণ
ছতরপুর জেলার খাজুরাহো মন্দির প্রাঙ্গণ

তীব্র রোদ থেকে বাঁচতে বার বার ঢাউস টুপি ঠিক করে নিচ্ছেন তরুণী। করোনার অতিমারি সে সময় ভবিষ্যতের গর্ভে। কিন্তু তখনও তাঁর মুখে মাস্ক। হাতে একটা মোটা বই। তার মলাটে জ্বলজ্বল করছে ‘ইন্ডিয়া’। এক বার বই, তার পরক্ষণেই মন্দিরের দেওয়ালে চলে যাচ্ছে চশমার আড়ালে থাকা উজ্জ্বল চোখ। দেখে মনে হয়, সম্ভবত সূর্যোদয়ের দেশ থেকে একাই এসেছেন ভারতভ্রমণে। হাতের বইটাই এই মনোযোগী ছাত্রীর ‘গাইড’। আর এক দল সোনালি চুল অবশ্য জীবন্ত গাইডই নিয়েছেন। কিন্তু সকল গাইডের পর্যটকভাগ্য তো আর ‘রাজু’-র মতো হয় না। সে বেচারির সঙ্গে ওই দলটির নেত্রী ঝোড়ো স্প্যানিশে অসন্তোষ প্রকাশ করে চলেছেন। মলিন মুখে ঘাড় নাড়ছেন গাইড। তাঁর ভাঙা ভাঙা স্প্যানিশে তর্ক করে যাওয়ার ক্ষমতা নেই। পরে জানা গেল, পর্যটকদের অভিযোগ ছিল, তাঁরা বইয়ে যা পড়ে এসেছেন, তার সঙ্গে গাইডের ‘গল্প’ কিছুই মিলছে না!

 খাজুরাহোর ভাস্কর্য

খাজুরাহোর ভাস্কর্য

এই ছবির কোলাজ ছিল মধ্যপ্রদেশের ছতরপুর জেলার খাজুরাহো মন্দির প্রাঙ্গণের। বিদেশি পর্যটকদের সঙ্গে ভারতীয় পর্যটকদের দৃষ্টিভঙ্গির সেখানে আকাশপাতাল তফাৎ। নিজের দেশের মন্দিরের গায়ের ভাস্কর্য সেখানে আমাদের কাছে নিষিদ্ধ ‘মুচকি হাসি’ ছাড়া বেশি কিছু আশা করতে পারে না। অন্য দিকে, বিদেশিদের আগ্রহ এবং নিষ্ঠা শিক্ষণীয়।খাজুরাহোর ভাস্কর্য দেখে তাঁদের চোখেমুখে অতল বিস্ময়।

ঠিক এ রকমই বিস্মিত হয়তো হয়েছিলেন আর এক ভিন্‌দেশিও। নাম তাঁর ইবন বতুতা। ১৩৩৫ থেকে ১৩৪২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতে থাকার সময়ে তাঁর সফরনামায় উঠে এসেছে ‘কাজারা’-র মন্দিরের কথা। তাঁর বিবরণ বলছে, মন্দিরগুলিতে সে সময়েও বিগ্রহ ছিল। তবে মরক্কোর ভূপর্যটককে বিস্মিত করেছিল মন্দিরে থাকা যোগীপুরুষরা। তাঁদের দেহ পাণ্ডুর বর্ণের। মাথার জটা নাকি ভূমি স্পর্শ করেছিল। স্থানীয় মানুষজন, এমনকি ভিনধর্মীরাও আসতেন তাঁদের কাছে।


শুধু ইবন বতুতাই নয়। বুন্দেলখণ্ডের খাজুরাহো অঞ্চলের বিবরণ ধরা পড়েছে বহু ভূপর্যটকের বিবরণে। ৬৪১ খ্রিস্টাব্দে হিউয়েন সাং বা জুয়াংঝ‌ং যখন দেখছেন, তখন এখানে ছিল বেশ কিছু বৌদ্ধ মঠ। কিন্তু সেগুলি তখন নিষ্প্রদীপ। বরং কিছু মন্দিরে সে সময় এখানে তখন পুজো শুরু হয়েছে। কিন্তু সেগুলি আজকের বিশ্বখ্যাত ‘খাজুরাহো মন্দির’ নয়। বরং, তাদের পূর্বসূরি। হিউয়েন সাঙের ৪০০ বছর পরে প্রথম খ্রিস্টাব্দে অল বিরুনির ভারত ভ্রমণকালে অবশ্য খাজুরাহোর মন্দিরের স্বর্ণযুগ।


আজ যে মন্দিরগুলি আমরা দেখি, তাদের গোড়াপত্তন হয়েছিল চান্দেলা বংশের শাসনে। ৮৮৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১০৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে শেষ হয়েছিল বেশির ভাগ মন্দির তৈরির কাজ। নথি বলছে, দ্বাদশ শতকে ২০ বর্গ কিমি এলাকায় ছিল ৮৫টি মন্দির। সেগুলির মধ্যে এখনও অস্তিত্ব রয়েছে ২৫টি মন্দিরের। তবে তিনটি মন্দিরপুঞ্জে ভাগ করা যায় নির্মাণগুলিকে। পোশাকি নাম ‘ওয়েস্টার্ন’, ‘ইস্টার্ন’ এবং ‘সাদার্ন’ ক্লাস্টার। এর মধ্যে সবথেকে বেশি এবং সেরা মন্দিরগুলি আছে পশ্চিম দিকের মন্দিরপুঞ্জেই। সবুজ গাছগাছালির মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিস্তীর্ণ জমিতে। নির্মাণগুলির মধ্যে সবথেকে বিখ্যাত কাণ্ডারিয়া ‘কাণ্ডারিয়া মহাদেব মন্দির’, ‘লক্ষ্মণ মন্দির’ এবং ‘বিশ্বনাথ মন্দির’। এর মধ্যে প্রথমটি তৈরি হয়েছিল চান্দেলা বংশীয় রাজা বিদ্যাধরের সময়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় মন্দিরের নির্মাণকাল দশম খ্রিস্টাব্দে, রাজা যশোবর্মনের শাসনকালে।

 সবুজ গাছগাছালির মধ্যে বিস্তীর্ণ জমিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মন্দিরগুলি।

সবুজ গাছগাছালির মধ্যে বিস্তীর্ণ জমিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মন্দিরগুলি।

নতুন রাজ্য জয়ের স্মারক-সহ বিভিন্ন উপলক্ষে চান্দেলা শাসকরা মন্দির নির্মাণ করেছেন এই অংশে। তাঁদের স্থাপত্যের স্বর্ণযুগ শেষ হয়ে যায় ত্রয়োদশ শতকে। গুর্জর প্রতিহারদের পরে ক্ষমতায় এসেছিল চান্দেলা বংশ। ৪০০ বছর ধরে শাসনের পরে এক দিকে দিল্লিতে সুলতানি শাসনের শক্তিবৃদ্ধি এবং অন্য দিকে ভিন্‌দেশিদের আক্রমণে ক্ষয়িষ্ণু পর্যায়ে পৌঁছে যায় চান্দেলা বংশ। ভিন্‌দেশিদের আক্রমণ সহ্য করে দাঁড়িয়ে থাকা মন্দিরগুলিও ধীরে ধীরে চলে যায় বিস্মৃতির আড়ালে। অনবদ্য এই স্থাপত্যের ভগ্নদশাতেই তাদের দেখেছিলেন ইবন বতুতা। তার পর কালের স্রোতে মন্দির ঢাকা পড়ে জঙ্গলে। গরিমা হারিয়ে গেলেও তার স্মৃতি জেগে থাকে স্থানীয় বাসিন্দাদের লোক পরম্পরার স্মৃতিতে।

তাঁদের কাছে শুনেই খেজুর গাছের আড়ালে মন্দিরের কাছে হাজির হয়েছিলেন ব্রিটিশ জরিপকর্মী টি এস বার্ট। তিনি আবার মন্দিরগুলির অস্তিত্ব তুলে ধরেন। কিন্তু তখনও সেগুলির অস্তিত্ব গণ্ডিবদ্ধ ছিল স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছেই। পরে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার আলেকজান্ডার কানিংহ্যাম মন্দিরগুলিকে তুলে ধরেন বিশ্বমঞ্চে।

আজ ‘খাজুরাহো’ ইউনেস্কোর হেরিটেজ সাইট। সংস্কৃত শব্দ ‘খর্জুরবাহো’ থেকেই এই নামের জন্ম। ‘খর্জুর’ হল খেজুর, ‘বাহো’ শব্দের অর্থ বহনকারী। আবার অনেক ইতিহাসবিদের মতে, ‘খর্জুর’ এখানে বৃশ্চিক এবং ‘খর্জুরবাহো’ হলেন স্বয়ং মহাদেব। হিন্দু ধর্মের পাশাপাশি একই প্রাঙ্গণে আছে জৈন মন্দিরও।

‘নাগারা’ ঘরানায় তৈরি খাজুরাহো মন্দিরগুলির বৈশিষ্ট্য হল এর গঠনশৈলি। প্রতিটা মন্দিরের অন্যতম অংশ ‘অর্ধমণ্ডপ’, ‘মণ্ডপ’, ‘মহামণ্ডপ’, ‘অন্তরাল’, ‘গর্ভগৃহ’, এবং ‘প্রদক্ষিণ’। বহিরাংশ বেলেপাথরে তৈরি প্রতি মন্দিরের গর্ভগৃহ তৈরি হয়েছে গ্র্যানাইটে। আদিরসের বাইরেও বহু কিছু উপজীব্য হয়েছে এই মন্দিরের ভাস্কর্যের। পাথরের গায়ে তক্ষণ জাদুতে ফটে উঠেছে সম্রাটের শিকারযাত্রার পাশাপাশি সাধারণ রমণীর কেশবিন্যাস ও প্রসাধনীর বাইরে কুমোরের মৃৎপাত্র তৈরির দৃশ্যও।

সাধারণ রমণীর কেশবিন্যাস ও প্রসাধনীর দৃশ্য ফুটিয়েতোলা হয়েছিল মন্দিরের দেওয়ালে।

সাধারণ রমণীর কেশবিন্যাস ও প্রসাধনীর দৃশ্য ফুটিয়েতোলা হয়েছিল মন্দিরের দেওয়ালে।

কিন্তু কেন আদিরস ধর্মস্থানের গায়ে? খাজুরাহো ঘিরে এই প্রশ্নই আবর্তিত হয়ে এসেছে। দৃষ্টি নান্দনিকতাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে পিছনের সারিতে। এ নিয়ে গবষেকদের বহু মত। অনেকে মনে করেন, তান্ত্রিক সাধনার প্রভাব পড়েছে ভাস্কর্যে। আবার অনেকের মতে, সে সময় আদিরস বা কামের প্রকাশ, কোনওটাই সমাজের চোখে ‘অপরাধ’ বা ‘নিষিদ্ধ’ ছিল না।

কার্যকারণের এই সম্পর্ক নিয়ে অনেক পর্যটকই ভাবের ঘরে চুরি করেন। মধ্যপ্রদেশের অন্যান্য জায়গায় বেড়াতে গেলেও তালিকায় রাখেন না ঝাঁসি থেকে ১৭৫ কিমি দক্ষিণপূর্বে থাকা এই ছোট্ট শহরকে। যাঁরা যান, তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিও নিখাদ নয়। অধিকাংশের কাছেই এ যেন অনেকটা ‘বিশেষ’ দৃশ্যের সন্ধানে চলচ্চিত্র উৎসবের ছবি দেখার জন্য ভিড় করার মতো ব্যাপার। ফলে প্রাপ্য কুর্নিশ থেকে বঞ্চিতই থেকে যান হাজার বছর আগের অস‌ংখ্য অনামী ভাস্কর এবং তাঁদের অবিনশ্বর শিল্প।

কলকাতা থেকে কীভাবে যাবেনঃ

খাজুরাহোতে ডোমেস্টিক এয়ারপোর্ট আছে। তবে সরাসরি কলকাতা থেকে যেতে পারবেন না। আপনাকে ভোপাল, বারাণসী, নয়াদিল্লি, মুম্বই, ইলাহাবাদ হয়ে পৌঁছতে পারবেন। মধ্যপ্রদেশের সব বড় শহরের সঙ্গে রেলপথে যুক্ত খাজুরাহো। আপনি সেভাবেও পৌঁছতে পারেন এই ঐতিহাসিক শহরে।

আরও পড়ুন