জঙ্গিপুরের বিদায়ী বিধায়ক তথা তৃণমূল প্রার্থী জাকির হোসেন। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
জঙ্গিপুরে তৃণমূলের বিদায়ী বিধায়ক তিনি। একই সঙ্গে মুর্শিদাবাদ জেলার অন্যতম বড় ব্যবসায়ীও তিনি। মুর্শিদাবাদের বিড়ি ব্যবসায়ীদের মধ্যে অন্যতম বড় নাম জাকির হোসেন। এ বারও জঙ্গিপুর থেকে তাঁকে প্রার্থী করেছে তৃণমূল। কোটিপতি তিনি আগে থেকেই ছিলেন। গত পাঁচ বছরে বিড়ি ব্যবসায়ী জাকিরের সম্পত্তি আরও ফুলেফেঁপে উঠেছে। স্থাবর এবং অস্থাবর উভয় সম্পত্তিই বৃদ্ধি পেয়েছে তাঁর।
নির্বাচনী ময়দানে জাকির প্রথম বার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটে। জঙ্গিপুর থেকেই প্রার্থী হন। সেই থেকে পর পর দু’বার জঙ্গিপুর থেকে তৃণমূলের টিকিটে জিতে বিধায়ক হন জাকির। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য কয়েক দিন আগেই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন তিনি। তাঁর সম্পত্তির হিসাবনিকাশ, জমিজমা-সহ বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে হলফনামায়। ব্যবসায়ী তথা বিদায়ী বিধায়কের সম্পত্তির শ্রীবৃদ্ধির পাশপাশি গত পাঁচ বছরে তাঁর বার্ষিক আয়ের তথ্যও হলফনামায় জানিয়েছেন জাকির।
পাঁচ বছর আগে, ২০২১ সালের এপ্রিলে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, জাকিরের কাছে ২৭ কোটি ৭৯ লক্ষ ৯০ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পত্তি ছিল। স্থাবর সম্পত্তি (জমিজমা, বাড়ি ইত্যাদি)-র তৎকালীন বাজারমূল্য ছিল ১৪ কোটি ৯২ লক্ষ ২৮ হাজার টাকা। এখন সেই সম্পত্তি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি জমা দেওয়া হলফনামায় জাকির জানিয়েছেন, তাঁর ৪৪ কোটি ৭১ লক্ষ ২১ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পত্তি রয়েছে। তাঁর কাছে যত স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে, তার বর্তমান বাজারদর ৪৬ কোটি ১৩ লক্ষ ১৭ হাজার টাকা। জাকিরের স্ত্রীও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। বিদায়ী বিধায়কের স্ত্রীর নামেও বর্তমানে ২৬ কোটি ৫৭ লক্ষ ৫৩ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পত্তি রয়েছে। স্ত্রীর নামে থাকা স্থাবর সম্পত্তির বর্তমান বাজারদর ৯ কোটি ৭১ লক্ষ ৬২ হাজার টাকা।
জঙ্গিপুরের বিদায়ী বিধায়ক তথা তৃণমূল প্রার্থীর নামে প্রচুর জমিজমা রয়েছে। ভাগে ভাগে বিভিন্ন সময়ে কৃষিজমি এবং অন্য জমি কিনেছেন তিনি। এখন জাকিরের নিজের নামেই রয়েছে ৯৯টি চাষজমি। অকৃষিজমি রয়েছে ৩৫টি। তাঁর নামে ৬টি বাণিজ্যিক ভবন আছে। ফ্ল্যাট এবং বাড়ি মিলিয়ে চারটি বসত সম্পত্তি রয়েছে তাঁর। জাকিরের স্ত্রীর নামেও ৬০টি চাষজমি এবং ১২টি অকৃষিযোগ্য জমি রয়েছে। স্ত্রীর নামে পাঁচটি বসত সম্পত্তিও রয়েছে। এর মধ্যে রাজরাহাট এবং বহরমপুরে দু’টি ফ্ল্যাটও রয়েছে। বাজারে ঋণও রয়েছে ব্যবসায়ী দম্পতির। হলফনামা অনুযায়ী, জাকিরের ৮ কোটি টাকার উপরে ঋণ রয়েছে বাজারে। তাঁর স্ত্রীরও ৪০ লক্ষ টাকার উপরে ঋণ রয়েছে।
২ এপ্রিল জমা দেওয়া হলফনামায় জাকির জানিয়েছেন, তাঁর হাতে ওই সময়ে নগদে ৭৪ লক্ষ ৩৮ হাজার ২১৮ টাকা ছিল। এ ছাড়া তাঁর নিজের ১২টি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। তার মধ্যে একটি অ্যাকাউন্টে অবশ্য সেই সময়ে কোনও টাকা ছিল না। বাকি অ্যাকাউন্টগুলিতে সর্বনিম্ন ১৩৭৬ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫৭ লক্ষ ৮৬ হাজার টাকা পর্যন্ত রয়েছে। মিউচুয়াল ফান্ড-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগও রয়েছে তাঁর। ইকুইটি শেয়ারে তাঁর ১৩ কোটি টাকার উপরে বিনিয়োগ রয়েছে। বিদায়ী বিধায়কের ১৪টি বিমা রয়েছে। যার জন্য তিনি মোট ২৮ লক্ষ ৪০ হাজার টাকার প্রিমিয়াম দেন। জাকিরের বেশ কিছু দামি আসবাবও রয়েছে, যার দাম দেড় লক্ষ টাকারও বেশি। তৃণমূলের ব্যবসায়ী নেতার কাছে ২৮ লক্ষ ৯১ হাজার টাকার সোনার কয়েনও রয়েছে। কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়ার পরেও জাকিরের নিজের নামে কোনও গাড়ি নেই। গাড়ি নেই স্ত্রীর নামেও।
তৃণমূলের ব্যবসায়ী নেতা জাকিরের বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনও থানায় কোনও এফআইআর নেই। পাঁচ বছর আগে, ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের আগে যে মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন জাকির, তখনও মামলাহীন প্রার্থীই ছিলেন তিনি। এ বারও তা-ই। তবে বিদায়ী বিধায়কের নামে একটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। সেটির দাম ৬৮,৭০৫ টাকা। পাঁচ বছর আগেও এই আগ্নেয়াস্ত্র ছিল তাঁর কাছে। উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক বার তাঁর উপর হামলা হয়েছিল। কলকাতামুখী ট্রেন ধরার জন্য নিমতিতা স্টেশনে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে তাঁকে লক্ষ্য করে বোমা ছোড়া হয়। হামলায় জখম হয়েছিলেন তিনি।
হলফনামা অনুযায়ী, ২০০৯ সালে মাধ্যমিক পাশ করেন জাকির। জঙ্গিপুরের তৃণমূল প্রার্থী নিজের পেশাগত পরিচয় দিয়েছেন ব্যবসায়ী এবং সমাজকর্মী হিসাবে। জানিয়েছেন, ব্যবসাই তাঁর আয়ের উৎস। স্ত্রীরও আয়ের উৎস একই। জাকির এবং তাঁর স্ত্রী উভয়েই গত পাঁচ বছর ধরে বছরে কোটি টাকার উপরে আয় করেছেন। ২০২০-২১ সালে জাকিরের বার্ষিক আয় ছিল ৬ কোটি ২৯ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা। ২০২১-২২ সালে আয় ছিল ৬ কোটি ৩৮ লক্ষ ১৩ হাজার টাকা। পরের তিন বছরে তিনি যথাক্রমে ৭ কোটি ০৩ লক্ষ ৫৬ হাজার টাকা, ৯ কোটি ৮২ লক্ষ ১২ হাজার টাকা এবং ৫ কোটি ৭৬ লক্ষ ৭১ হাজার টাকা আয় করেছেন। এই পাঁচ বছরে জাকিরের স্ত্রীরও বার্ষিক আয় ছিল এক কোটি টাকার উপরে।