আর্থিক লেনদেন হোক বা প্রশাসনিক কাজকর্ম, প্রায় সব কিছুকেই ডিজিটাল করার পক্ষপাতী নরেন্দ্র মোদীর সরকার। সেই অনুযায়ী, চটের বস্তা কেনার প্রক্রিয়াও এ বার অনলাইনে সারতে চাইছে বস্ত্র মন্ত্রক। যেখানে চটকলগুলির কাছ থেকে পোর্টাল (গর্ভমেন্ট ই-মার্কেট বা জেম) মারফত চাওয়া হবে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র। যারা কম দাম দেবে, তারাই পেতে পারে বস্তা সরবরাহের বরাত। আসন্ন মরসুমে নতুন পদ্ধতিতে কিছু বস্তা কেনার প্রাথমিক সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। তবে ই-দরপত্র নিয়ে ইতিমধ্যেই আপত্তি তুলেছেন রাজ্যের চটকল মালিকেরা। তাঁদের আশঙ্কা, এর জেরে পাট শিল্পে অসম প্রতিযোগিতা মাথাচাড়া দিতে পারে। এমনকি এর ধাক্কায় বহু ছোট চটকল বন্ধ হতে পারে, এই যুক্তিতে প্রস্তাবটি পুনর্বিবেচনার দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা। কেন্দ্র অবশ্য বলছে, আসলে প্রশাসনিক কাজে সংস্কার ও স্বচ্ছতা আনতেই এই উদ্যোগ।

সূত্রের খবর, পোর্টালে দরপত্রের মাধ্যমে বস্তা কেনার বিরোধিতা করে চটকলগুলির সর্বভারতীয় সংগঠন (আইজেএমএ) বস্ত্রমন্ত্রী স্মৃতি ইরানিকে চিঠি দিয়েছে। নিজেদের আশঙ্কার কথা জানিয়ে আলোচনায় বসতে চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে রাজ্যের শ্রমমন্ত্রী মলয় ঘটককেও।

চটকল মালিকদের একাংশের অভিযোগ, এই ব্যবস্থা চালু হলে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেক ছোট মিল বন্ধ হতে পারে। কাজ হারাতে পারেন বহু শ্রমিক। উপরন্তু বস্তার দাম কম রাখা নিয়ে চটকলগুলির প্রতিযোগিতায় পাটের ন্যায্য দর থেকে বঞ্চিত হতে পারেন চাষিরাও। কারণ সস্তায় বস্তা বেচতে তখন মিলগুলি খোলা বাজার থেকেই কম দামে পাট কেনা শুরু করবে। তাঁদের মতে, প্রস্তাবিত প্রক্রিয়ায় বস্তার দামের ন্যূনতম সীমা না থাকায়, যেমন খুশি দর হাঁকা যাবে দরপত্রে। যা ধাক্কা দেবে পুরো শিল্পকেই।

এখন বস্তার দাম ঠিক করেন জুট কমিশনার। সেই দামেই ছোট-বড় সব চটকলের থেকে তা কেনা হয়। এই ব্যবস্থায় কেন্দ্র প্রতি বছর ৫,৫০০ কোটি টাকা খরচ করে। আইন অনুযায়ী (জুট প্যাকেজিং মেটিরিয়ালস অ্যাক্ট), ৪০ লক্ষ পাট চাষি ও পাট শিল্পে যুক্ত কয়েক লক্ষ শ্রমিকের জীবিকা সুরক্ষিত রাখতেই বাধ্যতামূলক ভাবে খাদ্যশস্য ভরার ক্ষেত্রে ৯০% ও চিনির জন্য ২০% চটের বস্তা কেনার এই নিয়ম।

তবে বাণিজ্য ও অর্থ মন্ত্রক বহু দিন ধরেই বস্তা কেনার প্রক্রিয়াকে অনলাইন করার পক্ষে সওয়াল করছে। কেন্দ্রের মতে, এখনকার পদ্ধতিতে তথ্য যাচাই, তা বিভিন্ন দফতর বা সংস্থাকে জানানো-সহ নানা কাজে বিপুল সময় লাগে। কাগজপত্র চালাচালিও করতে হয় অনেক বেশি। কিন্তু অনলাইনে সেই সমস্যা হবে না। স্বচ্ছতা আসবে। চটকলগুলিও সরকারের উপর নির্ভর করে না থেকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে।

সূত্রের খবর, মে মাসে ২৬তম কেন্দ্রীয় স্থায়ী পরামর্শদাতা কমিটির শেষ বৈঠকেও পোর্টাল মারফত বস্তা কেনার বিষয়টি বিবেচনার জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল। বস্ত্র মন্ত্রক চাইছে এ বার তা পরীক্ষামূলক ভাবে চালু হোক। কিন্তু বস্তার বাঁধা দাম না থাকায় ক্ষতির আশঙ্কায় কাঁটা পাট শিল্পমহল তা মানতে নারাজ।

এখন নিয়ম

• জেনে নেওয়া হয় কোন রাজ্যের কতগুলি বস্তা লাগবে।

• নির্দিষ্ট সূত্র মেনে তার দাম ঠিক করেন জুট কমিশনার।

• চটকলগুলির পরিকাঠামো, উৎপাদন ক্ষমতা, দক্ষতা
ইত্যাদি মেপে বস্তা তৈরির বরাত ভাগ করে দেন।

• নির্ধারিত দামে সেগুলি জোগায় সমস্ত চটকল।

নতুন প্রস্তাব

• ‘জেম’ পোর্টালে চটকলগুলিকে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র জমা দিয়ে দাম জানাতে হবে।

• কম দাম দিলে, বস্তার বরাত পাওয়ার সুযোগ থাকবে।

• জুট কমিশনারের তেমন ভূমিকা থাকবে না।

• থাকছে না নির্দিষ্ট দাম।

• কেন্দ্রের দাবি, এই ব্যবস্থায় তথ্য যাচাই সহজ হবে। সময় লাগবে কম। প্রক্রিয়া হবে স্বচ্ছ।

চটকলগুলির দাবি

• নতুন প্রস্তাবে অসম প্রতিযোগিতার শিকড় লুকিয়ে।

• ব্যবস্থাটি চালু হলে বহু ছোট চটকল বন্ধ হতে পারে।

• কাজ হারাতে পারেন অনেক শ্রমিক।

• চাষিরা পাটের ন্যায্য দাম না-ও পেতে পারেন।

• বর্তমান ব্যবস্থায় ছোট-বড় সব চটকলের ব্যবসা সুরক্ষিত।

• বরাত অনুযায়ী তৈরি সব চটের বস্তাই কেন্দ্র নির্দিষ্ট দামে কিনে নেয়। তা বজায় থাকুক।