রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সুদ সাধারণত বাড়ে-কমে ২৫ বেসিস পয়েন্ট করে বা তার গুণিতকে। সেই অর্থে বুধবার প্রথা ভেঙেই তা বাড়ল ৩৫ বেসিস পয়েন্ট। এই নিয়ে টানা চার বারের ঋণনীতিতে সুদ ছাঁটাই হল ১১০ বেসিস পয়েন্ট বা ১.১০ শতাংশ বিন্দু। কিন্তু তার পরেও বাড়ি, গাড়ি এবং অন্যান্য ঋণের কিস্তি আদৌ সেই সুদ কমার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সস্তা হবে কি না, বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন ঝুলে রইল তার উপরে। স্টেট ব্যাঙ্ক এ দিন ১০ অগস্ট থেকে ঋণে সুদ ১৫ বেসিস পয়েন্ট কমানোর কথা ঘোষণা করার পরেও।

অর্থনীতির চাকায় গতি ক্রমশ কমতে থাকা যে দুশ্চিন্তার কারণ, ঋণনীতির ঘোষণায় তা স্পষ্ট করেছে শীর্ষ ব্যাঙ্ক। বৃদ্ধির পূর্বাভাস ৭% থেকে কমিয়ে ৬.৯% করেছে তারা। এই ধাক্কাকে সাময়িক বলে দাবি করলেও, গভর্নর শক্তিকান্ত দাস জানিয়েছেন যে, অর্থনীতির পালে হাওয়া টানতেই ছাঁটাই করা হয়েছে রেপো রেট (যে সুদে বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলিকে স্বল্প মেয়াদি ধার দেয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক)। তা দাঁড়িয়েছে ন’বছরে সব থেকে নীচে (৫.৪%)। কমেছে রিভার্স রেপো রেটও (যে সুদে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলির কাছ থেকে স্বল্প মেয়াদি ধার নেয়)।   

শীর্ষ ব্যাঙ্কের ঘোষণার পরেই স্টেট ব্যাঙ্ক জানিয়েছে, তহবিল সংগ্রহের খরচের ভিত্তিতে ঋণে ঠিক হওয়া সুদ (এমসিএলআর) ১০ অগস্ট থেকে ১৫ বেসিস পয়েন্ট কমাচ্ছে তারা। যার দৌলতে বাড়ি, গাড়ি-সহ প্রায় সব ঋণে সুদের বোঝা কিছুটা কমার সম্ভাবনা। কিন্তু শক্তিকান্ত চান যে, অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে শীর্ষ ব্যাঙ্কের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে সুদ কমাক বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলি। যাতে তার হাত ধরে শিল্পের মূলধন সংগ্রহের খরচ কমে। চাঙ্গা হয় চাহিদাও। ওই একই লক্ষ্যে ভোগ্যপণ্য কিনতে নেওয়া ঋণেও (ক্রেডিট কার্ড বাদে) ঝুঁকির ‘ওজন’ ২৫ শতাংশ বিন্দু কমিয়ে ১০০% করেছে শীর্ষ ব্যাঙ্ক। 

সুদ-ঘোষণা

• ৩৫ বেসিস পয়েন্ট সুদ কমাল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। রেপো রেট কমে ৫.৪%।
• সাধারণত শীর্ষ ব্যাঙ্কের ওই সুদ বাড়ে-কমে ২৫ বেসিস পয়েন্ট কিংবা তার গুণিতকে। সেই অর্থে এই ঋণনীতি প্রথাভাঙা।
• এই নিয়ে টানা চার ঋণনীতিতে ছাঁটাই হল রেপো রেট। মোট ১১০ বেসিস পয়েন্ট। রাস্তা খোলা রইল তা আরও কমানোর। 
• রিভার্স রেপো রেটও ৩৫ বেসিস পয়েন্ট কমে হল ৫.১৫%।
• ১০ অগস্ট থেকে ঋণে সুদ ১৫ বেসিস পয়েন্ট কমাচ্ছে স্টেট ব্যাঙ্ক। সবে ১০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়েছে এইচডিএফসি ব্যাঙ্ক। আগামী দিনে একই পথে হাঁটতে পারে অন্য ব্যাঙ্কগুলিও।
• রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মতে অবশ্য তারা যে পরিমাণে সুদ ইতিমধ্যেই কমিয়েছে, বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কের সুদ ছাঁটাই এখনও তার তুলনায় নগণ্য।

প্রসঙ্গ অর্থনীতি

• ফের চলতি অর্থবর্ষের আর্থিক বৃদ্ধির পূর্বাভাস ছাঁটাই। ৭% থেকে কমিয়ে তা করা হল ৬.৯%।
• অর্থনীতি ঝিমিয়ে পড়ার কথা কবুল। তবে দাবি, এই শ্লথ গতি সাময়িক। এই ঝঞ্ঝাট স্বাভাবিক ওঠা-পড়ার চক্রের কারণেই।
• খুচরো মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে। ২০১৯-২০ অর্থবর্ষের দ্বিতীয়ার্ধে তা ৩.৫-৩.৭ শতাংশে থাকার সম্ভাবনা।
• পাখির চোখ চাহিদাকে চাঙ্গা করা। অগ্রাধিকার বেসরকারি বিনিয়োগের চাকায় গতি ফেরানোর উপরে। 

ডিজিটালে জোর

• নেফ্‌টে টাকা পাঠানোর সুবিধা সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘণ্টাই। চালু ডিসেম্বর থেকে।
• গ্যাস, টেলিফোন, 
বিদ্যুতের  বিল দেওয়া সহজ করতে উদ্যোগ।
• অনলাইনে জালিয়াতি দেখলেই তা দ্রুত রুখতে বন্দোবস্ত।

লক্ষ্য এনবিএফসি

• ব্যাঙ্ক অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকা ঋণ দিতে পারবে এনবিএফসি মারফত।
• ওই সব ক্ষেত্রে (কৃষি, গৃহ ঋণ, ছোট-মাঝারি শিল্প) বাড়ছে এনবিএফসি-কে ব্যাঙ্কের দেওয়া ঋণের ঊর্ধ্বসীমাও।
• নিজেদের টিয়ার-১ মূলধনের ২০% পর্যন্ত একটি এনবিএফসিকে ধার দিতে পারবে ব্যাঙ্ক। ছিল ১৫%।

গভর্নরের অভিযোগ, এখনও পর্যন্ত শীর্ষ ব্যাঙ্ক যে পরিমাণে সুদ কমিয়েছে, বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কের সুদ ছাঁটাই তার তুলনায় নস্যি। যেমন, এর আগের তিন ঋণনীতিতে ২৫ বেসিস পয়েন্ট করে মোট ৭৫ বেসিস পয়েন্ট সুদ ছাঁটাই করেছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। সেখানে বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলি ঋণে সুদ কমিয়েছে ২৯ বেসিস পয়েন্ট মতো। ইঙ্গিত, এ বার অন্তত আরও বেশি করে সুদ ছাঁটাইয়ের সুবিধা গ্রাহকের দরজায় পৌঁছে দিক ব্যাঙ্কগুলি।

একই সুর কেন্দ্র এবং শিল্প মহলের কথাতেও। সুদ ছাঁটাইকে স্বাগত জানিয়ে অর্থ সচিব রাজীব কুমারের আহ্বান, এই সুবিধা এ বার গ্রাহকের কাছে পৌঁছক ব্যাঙ্কগুলি। শিল্পের মতেও, যতক্ষণ না রেপো কমার পুরো সুবিধা মানুষের কাছে পৌঁছচ্ছে, ততক্ষণ চাহিদা ও লগ্নির ছবি বদলানো শক্ত। এ দিন শীর্ষ ব্যাঙ্কের সুদ কমানোকে স্বাগত জানিয়েছে বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলি। তবে সুদ কমার সুবিধা তারা গ্রাহকের কাছে কতটা পৌঁছোবে, উত্তর দেবে সময়ই।