গভীর রাতে তখন ঘুমে আচ্ছন্ন সকলেই। রাত সাড়ে তিনটে নাগাদ লেপ-তোষকের দোকান থেকে হঠাৎ দাউ দাউ করে আগুন বেরোতে থাকে। ঘুম  হাল্কা হতেই তা টের পান দোকান মালিক মহম্মদ মুস্তাফি। তাঁর চিৎকারে অন্য ব্যবসায়ীরা ঘুম থেকে উঠে দেখেন, পরপর দোকানগুলি আগুনে জ্বলছে। খবর পেয়ে দমকলের দশটি ইঞ্জিন প্রায় দেড় ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও তত ক্ষণে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে যাদবপুরের লর্ডস মোড়ের কাছে সতেরোটি দোকান। আগুনের তাণ্ডবে প্রাণ হারিয়েছে ষাটটি মুরগি।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের খবর, প্রিন্স গোলাম মহম্মদ শাহ রোডের পাশে লর্ডস মোড়ে কাছে দোকানগুলির বেশির ভাগেই লেপ-তোষক বিক্রি হয়। তা ছাড়া রয়েছে একটি চায়ের এবং আর একটি মুরগির দোকান। পনেরোটি দোকানে তুলোর মতো দাহ্য বস্তু ভর্তি থাকায় আগুন নিমেষে ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্কে বাজারের আশপাশের বাসিন্দারা বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন রাস্তায়। আগুনের লেলিহান শিখায় প্রায় চারটি বড় গাছ পুড়ে গিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা দোকান থেকে কিছু সামগ্রী সরাতে হাত লাগান। পরে যাদবপুর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। দমকলের প্রাথমিক অনুমান, তুলোর দোকান থেকেই আগুন ছড়িয়েছে। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, সিলিন্ডার ফাটার মতো বিকট আওয়াজ হচ্ছিল। প্রকৃত কী কারণে আগুন লেগেছে, সে বিষয়ে তদন্ত করছে দমকল।

রবিবার সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেল, সব হারিয়ে হাউহাউ করে কাঁদছেন চায়ের দোকানের মালিক গীতা দাস। গীতাদেবীর স্বামী জগন্নাথ দাসের কথায়, ‘‘তখন ঘুমোচ্ছিলাম। বিকট শব্দ শুনে ঘুম ভাঙতেই দেখি, চারপাশে গলগল করে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। চারদিকে আগুন-আগুন চিৎকার। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও দোকানের কিছুই বাঁচাতে পারিনি।’’ দোকান লাগোয়া টালির ঘরে গত কয়েক বছর ধরে স্বামী জগন্নাথবাবুকে নিয়ে সংসার গীতাদেবীর। তাঁর ছেলেরা কর্মসূত্রে বাইরে থাকেন। শাড়ির আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে গীতাদেবী বলছিলেন, ‘‘ঘরের মধ্যে টিভি, নগদ টাকা ছাড়াও সংসারের যাবতীয় জিনিসপত্র ছিল। আধার কার্ড-সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিও ছিল। সব কিছু পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে।’’

আগুনের খবর পেয়ে এ দিন সকালে ঘটনাস্থলে আসেন স্থানীয় বরো চেয়ারম্যান তপন দাশগুপ্ত। তপনবাবুর অভিযোগ, ‘‘রাস্তার ধারে যে দোকানগুলি পুড়েছে, সেখানকার জমি দীর্ঘদিন ধরেই জবরদখল হয়ে রয়েছে। এখানকার ব্যবসায়ীদের কোনও ট্রেড লাইসেন্সও নেই।’’ জমির মালিকানা সরকারি হওয়া সত্ত্বেও কেনই বা লর্ডস মোড়ের প্রায় এক বিঘা জমি দীর্ঘদিন ধরে জবরদখল রয়েছে, সে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের খবর, জবরদখল হওয়া প্রায় এক বিঘা জমির বর্তমান মালিকানা কেএমডিএ-র। ১৯৭০ সালে কলকাতা উন্নয়ন সংস্থা ( কেআইটি) ওই জমি দখল নেওয়ার পরে এলাকাটি টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ‘‘এর আগেও এখানে ৪-৫ বার আগুন লেগেছিল। সরকারি তরফে জমি ঘিরে দেওয়া হলেও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা টিনের বেড়া সরিয়ে ফের দোকান তৈরি করে ব্যবসা করতে শুরু করেন। সরকারি জমি সত্ত্বেও প্রশাসনের তরফে কোনও ব্যবস্থা না নেওয়ায় এই এলাকায় বারবার আগুন লাগে।’’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দার অভিযোগ, ‘‘বারবার আগুন লাগার পরেও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মদতে ব্যবসায়ীরা বেআইনি ভাবে দোকান তৈরি করার প্রশ্রয় পাচ্ছেন।’’ 

বরো চেয়ারম্যানের কথায়, ‘‘ওই জমির মালিকানা নিয়ে কলকতা পুরসভার সার্ভে বিভাগকে অনেক আগে জানানো হয়েছিল। সার্ভে বিভাগ জমি সংক্রান্ত নথি দিতে স্থানীয় দশ নম্বর বরোকে জানিয়েছিল। কিন্তু জমির কোনও নথি বরো থেকে পাওয়া যায়নি।’’ তিনি  আরও বলেন, ‘‘অনেক আগে শোনা গিয়েছিল, ওই জায়গায় পরিবহণ দফতর বাস টার্মিনাস করবে। কিন্তু সেটাও হয়নি। পরবর্তীকালে তথ্য-সংস্কৃতি দফতর একটি প্রকল্প গড়বে বলে শোনা গিয়েছিল। কিন্তু সে ব্যাপারে কোনও দিশা মেলেনি।’’ জবরদখল হওয়া সত্ত্বেও পুরসভা কেনই বা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে না? এ প্রসঙ্গে তপনবাবু বলেন, ‘‘পুরসভা সতেরোটি দোকানের তালিকা দিতে বলেছিল। কিন্তু সেই তালিকা ওরা দিয়েছিল কি না, জানা নেই।’’ যদিও ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, তাঁরা এ বিষয়ে নিয়মিত পুরসভার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।

 লর্ডস বেকারি হকার্স সংগঠনের সম্পাদক তপন দত্ত বলেন, ‘‘লর্ডস মোড়ে প্রায় সত্তর বছর ধরে পারিবারিক ব্যবসা এখানকার দোকানিদের। সরকারি তরফে নিশ্চয়ই এখানে প্রকল্প গড়া হোক। কিন্তু আমাদের উচ্ছেদ করে নয়। ব্যবসায়ীদের জন্য নীচের তলায় দোকান গড়ে উপরে সরকারি অফিস গড়ার ব্যাপারে সরকারকে আগেই প্রস্তাব দিয়েছি। কিন্তু সরকার নীরব হয়ে থাকায় বাধ্য হয়েই আমরা এখানে ব্যবসা করছি।’’ আগুন লাগার জায়গা ব্যবসায়ীরা জবরদখল করে রয়েছেন বলে বরো চেয়ারম্যান  জানালেও স্থানীয় কাউন্সিলর তথা মেয়র পারিষদ (রাস্তা) রতন দে এ প্রসঙ্গে কোনও মন্তব্য করতে চাননি। বারবার আগুন লাগার পরেও প্রশাসন কি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে না? উত্তরে স্থানীয় বরো চেয়ারম্যান তপন দাশগুপ্ত বলেন, ‘‘পুরো বিষয়টি স্থানীয় বিধায়ক তথা মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসকে জানিয়েছি। অরূপবাবু মেয়রের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে জানিয়েছেন।’’