বাবাকে হাত ধরে টেনে তুলতে পারল। কিন্তু দাদাকে পারল না! মঙ্গলবার রাত থেকে আমার ছোট ছেলে শুভজিৎকে দেখলেই এই কথা মনে হচ্ছে। বহু বার বলেছি, পারলি না দাদাকে বাঁচাতে? ওকেই বা দোষ দিই কী করে? আসলে আমার বড় ছেলে, প্রসেনজিতের নিয়তিই খারাপ। আমি, ওর বাবা— সকলে পারলাম। শুধু ও-ই পারল না!

আমার মাসি, মীরা কুন্ডু কিছু দিন ধরেই ভুগছিলেন। সন্ধ্যায় ওঁর মেয়ে অন্বেষা খবর দিল, মাসি মারা গিয়েছেন। নিমতলায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমরা থাকি শ্যামপুকুরের নিবেদিতা লেনে। নিমতলা বাড়ির কাছেই। প্রসেনজিৎ বলল, ‘বাবা আর তুমি যাও। আমি ভাইকে নিয়ে যাচ্ছি।’ তখন ভাবিনি, তিন জন বাড়ি ফিরব আর ও পারবে না।

রাত পৌনে ১০টা নাগাদ অন্বেষাকে নিয়ে গঙ্গায় নেমেছিলাম। কেউ বলেননি, বান আসছে। হঠাৎ বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ল আমাদের উপরে। অন্বেষার হাত ছাড়িয়ে আমি একটা সিঁড়িতে গিয়ে পড়ি। এর পরে জলের তোড়ই টেনে নিয়ে ফেলে গঙ্গায়। মাথায় তখন প্রবল যন্ত্রণা। হাত-পা কেটে গিয়েছে। কোনওমতে সাঁতরে পাশের ঘাটের কাছে যাই। এক যুবক টেনে তোলেন। আর কিছু মনে নেই। জ্ঞান ফিরতে দেখি, আমি অ্যাম্বুল্যান্সে। হাসপাতালে আমার স্বামী ইন্দ্রজিতের সঙ্গে দেখা হল। ওর মাথায় তখন ব্যান্ডেজ করা। বলল, শুভজিৎ ওকে টেনে তুলেছে।

ঘটনার আগে শুভজিৎ গিয়েছিল গামছা আনতে। চিৎকার শুনে ছুটে এসে দেখে, বাবা সিঁড়িতে পড়ে। কিন্তু দাদাকে দেখতে পায়নি। হাসপাতালেই কয়েক মিনিট পরে দেখলাম, প্রসেনজিৎকে নিয়ে এসেছে। দেখতে চাইলাম। তত ক্ষণে যে সব শেষ হয়ে গিয়েছে, বুঝিনি। পরে দেখলাম, ওর দেহটা পড়ে আছে একটি ট্রলির উপরে। মুখে কথা নেই।

ছেলে আমার খুব ভাল। কয়েক দিন আগেই সল্টলেকের তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় কাজে যোগ দিয়েছিল। গত ৭ তারিখ ওর জন্মদিন ছিল। কত মজা করলাম। এ বছরেই ওর বিয়ে দেব ভেবেছিলাম। 

আমাদের সে সব স্বপ্ন আর সত্যি হল না!