প্রস্থে মেরেকেটে ফুট তিনেক। ফুট ওভারব্রিজের সেই সরু সিঁড়ি যেন মরণফাঁদ। যে সিঁড়ি দিয়ে দু’জনই পাশাপাশি নামতে পারেন না, সেই সিঁড়ি দিয়েই চলছে একসঙ্গে অনেক মানুষের ব্যস্ত যাতায়াত। ফল যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। সিঁড়িতে হুড়োহুড়ির চোটে প্রায়ই পড়ে যাচ্ছেন যাত্রীরা। কেউ কেউ আহতও হচ্ছেন। নিত্যযাত্রীদের আশঙ্কা, মাঝেরহাটের ওই সরু ফুটব্রিজেও কোনও দিন ঘটে যেতে পারে সাঁতরাগাছির মতো দুর্ঘটনা।

দুপুর ২টো ১০। দমদম থেকে ট্রেন এসে দাঁড়াল মাঝেরহাট স্টেশনের পাঁচ নম্বর প্ল্যাটফর্মে। ট্রেন প্ল্যাটফর্মে এসে পড়েছে দেখে দ্রুত ফুটব্রিজ দিয়ে নামছিলেন যাত্রীরা। আর উল্টো দিক থেকে তখন ট্রেন থেকে নামা যাত্রীরা ফুটব্রিজ ধরে উপরে উঠছেন। সিঁড়িতেই মুখোমুখি ধাক্কা খেল দুই দল যাত্রী। গুঁতোগুঁতির চোটে কেউ আঘাত পেলেন। কেউ আবার কোনও মতে সামলে নিয়ে দৌঁড়লেন ট্রেন ধরতে।

নিত্যযাত্রীরা জানাচ্ছেন, মাঝেরহাট স্টেশনের চার ও পাঁচ নম্বর প্ল্যাটফর্মে যাওয়ার জন্য যে ফুট ওভারব্রিজ রয়েছে, তার উপরে ধাক্কাধাক্কির এই দৃশ্য খুবই পরিচিত। মাঝেরহাট সেতু ভাঙার পরে সেই সমস্যা অনেক বেশি তীব্র হয়েছে। আগে যাঁরা বাসে করে বেহালা আসতেন, তাঁরা অনেকেই এখন ট্রেন ধরে মাঝেরহাট স্টেশনে আসছেন। ভিড়ে ঠাসা চার ও পাঁচ নম্বর প্ল্যাটফর্ম পেরোনোর একমাত্র ভরসা ওই তিন ফুট চওড়া ফুট ওভারব্রিজ।

মাঝেরহাট স্টেশনে রয়েছে মোট পাঁচটি প্ল্যাটফর্ম। তার মধ্যে এক, দুই ও তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মে যাওয়ার জন্য যে ফুট ওভারব্রিজ রয়েছে, সেটি স্বাভাবিক চওড়া। সমস্যা শুরু হয় ওই ফুট ওভারব্রিজ ধরে চার ও পাঁচ নম্বর প্ল্যাটফর্মে যেতে গিয়ে। কারণ, কিছুটা এগিয়েই হঠাৎ সরু হয়ে গিয়েছে ওই ফুট ওভারব্রিজটি। সেই সরু অংশেই চলে ধাক্কাধাক্কি। দেবাশিস প্রামাণিক নামে ওই স্টেশনের এক নিত্যযাত্রী বলেন, ‘‘ফুটব্রিজে ধাক্কাধাক্কি হয় বলে ট্রেন ধরার জন্য নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগে স্টেশনে চলে আসার চেষ্টা করি। কিন্তু সব সময়ে তো আগেভাগে আসতে পারি না। যে দিন দেরি হয়ে যায়, সে দিন মারাত্মক ধাক্কাধাক্কির মধ্যে পড়তে হয়।’’

মাঝেরহাট সাঁতরাগাছির মতো ব্যস্ত স্টেশন নয়। তবু পদপিষ্ট হয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে বলে জানাচ্ছেন নিত্যযাত্রীরা। তাঁদের অভিযোগ, সকালে ও বিকেলে যখন নিত্যযাত্রীদের ভিড় থাকে, সমস্যা তখন মারাত্মক আকার নেয়। অনেক সময়ে চার ও পাঁচ নম্বর প্ল্যাটফর্মে একসঙ্গে দু’টি ট্রেন চলে আসে। কল্লোল বসু নামে এক নিত্যযাত্রীর অভিযোগ, ‘‘সকালের ব্যস্ত সময়ে ভিড়ে ঠাসা ফুটব্রিজে দাঁড়িয়ে মনে হয়, এই বুঝি ভেঙে পড়ল
ব্রিজটা। মাঝেমধ্যে সিঁড়িতে ধাক্কাধাক্কির মধ্যে পড়লে শ্বাসকষ্ট পর্যন্ত হয়। কিন্তু এই ভাবে যন্ত্রণা সহ্য করাটাই আমাদের অভ্যাস হয়ে গিয়েছে।’’ যাত্রীদের অভিযোগ, অনেক সময়ে বড় বড় বস্তা বা ব্যাগও ওই ফুটব্রিজ দিয়ে নামানো হয়। যাত্রীদের গায়ের উপরে ওই বস্তা পড়ে দুর্ঘটনাও ঘটেছে। নিত্যযাত্রীদের অভিযোগ, ফুট ওভারব্রিজটি কেন অস্বাভাবিক রকম সরু করা হল, তার উত্তর মাঝেরহাট স্টেশন কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার জানতে চাওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনও উত্তর মেলেনি।

যদিও সাঁতরাগাছির দুর্ঘটনার পরে টনক নড়েছে বলে দাবি রেল কর্তৃপক্ষের। পূর্ব রেলের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক রবি মহাপাত্র বলেন, ‘‘যাত্রীদের ওই ব্রিজ পারাপার করতে একটু অসুবিধা হয়। ওখানে আর একটি ফুট ওভারব্রিজ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।’’