• ঋজু বসু
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

পার্ক সার্কাসের প্রতিবাদ নিয়ে গবেষণা

Protest
পার্ক সার্কাসের প্রতিবাদীরা। নিজস্ব চিত্র

কলকাতাকে জানতে হলে পার্ক সার্কাসকে চিনুন! কিংবা বলা ভাল, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন নিয়ে শহরের প্রতিবাদকে চিনুন কলকাতাকে বুঝতে। এ ভাবে বলাই যায় বিষয়টা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের তত্ত্বাবধানে দক্ষিণ এশিয়ার নগর-জীবন নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রকল্পের আওতায় এখন পার্ক সার্কাসের প্রতিবাদী অবস্থান নিয়ে কাটাছেঁড়া চলছে।

কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের অধীনে রাষ্ট্রীয় উচ্চতর শিক্ষা অভিযান (রুসা) প্রকল্পের আওতায় শুরু হয়েছিল গবেষণা। ‘দ্য স্পেসিফিক্স অব দি আর্বান কন্ডিশন ইন দ্য গ্লোবাল সাউথ: আ হিস্টোরিক্যাল পার্সপেক্টিভ’ শীর্ষক গবেষণা-প্রকল্পে গত এক বছর ধরে কলকাতার মুখে মুখে ফেরা ইতিহাস (ন্যারেটিং দ্য সিটি) খুঁজে চলেছেন যাদবপুরের গবেষকেরা। ‘‘এই কাজটা করতে গিয়েই আমাদের পার্ক সার্কাসের প্রতিবাদ-ক্ষেত্রটিকে বিশ্লেষণ করা জরুরি বলে মনে হয়।’’— বলছিলেন প্রোজেক্ট কোঅর্ডিনেটর, যাদবপুরে ইতিহাসের অধ্যাপিকা সুদেষ্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন?

কলকাতার সাধারণ বাসিন্দাদের চোখে শহরটা কী, এটা বুঝতে খোলা মনে এগোতেই কয়েকটি বৈশিষ্ট্য উঠে আসছিল। যেমন, এখনও শহরের মধ্যে পাঁচমিশেলি পাড়া বেশ কম। এমনকি, কয়েকটি পাড়ায় সাম্প্রতিক অতীতে হিন্দু-মুসলিম মিলেমিশে থাকলেও এখন সে ইতিহাস কার্যত বিস্মৃত। এই গবেষণার কাজে যুক্ত যাদবপুরের প্রাক্তনী ইষ্টি ভট্টাচার্য বা সেন্ট পলস কলেজের ইতিহাসের শিক্ষিকা অনমিত্রা সরকারেরা দেখেছেন, যাদবপুরেই ‘বুড়ির বাগান’ বলে একটি এলাকায় বছর ৪০ আগেও বিরাট বাগান ঘেরা বাড়িতে এক মুসলিম প্রৌঢ়া থাকতেন, যা এখন প্রায় কারও মনে নেই। সাধারণ বাসিন্দাদের স্মৃতির সূত্র ঘেঁটেই গবেষকেরা লক্ষ করেছেন, দেশ ভাগ থেকে শুরু করে নানা পর্বে কলকাতার বিভিন্ন পাড়ার চরিত্র পাল্টেছে। শহরের বিভিন্ন এলাকার মুসলিম জনসংখ্যার একাংশ অন্য জায়গা থেকে সরে পার্ক সার্কাসেই বসবাস শুরু করেছেন। আবার গরিব মুসলিমদের একাংশ সরে গিয়েছেন শহরের বাইরে বারুইপুর বা বজবজ লাইনের কয়েকটি জায়গায়। কারও কারও মতে, কয়েকটি জনগোষ্ঠীর ঝাঁক বেঁধে থাকার বা এক ধরনের ‘ঘেটো’ সৃষ্টির প্রবণতাও কলকাতায় ভালই টের পাওয়া যায়।

শহরের জনজীবনের নানা প্রবণতা বিশ্লেষণ করেই সিএএ-প্রতিবাদের পরিসরগুলির গুরুত্ব টের পাচ্ছেন যাদবপুরের গবেষকেরা। সুদেষ্ণার কথায়, ‘‘কেউ কেউ বলছেন, পার্ক সার্কাসের মাঠে নিপাট গেরস্ত, সাধারণ মহিলাদের ক্ষমতায়নের একটা আঁচ মিলছে। পার্ক সার্কাসকে অনেকে বৃহত্তর কলকাতার থেকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখলেও সেখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে সবাইকে পাশে নিয়ে চলার একটা তাগিদও অনেকে লক্ষ করছেন। আমরা ঘটমান ইতিহাসের দলিল হিসেবেই অবস্থানকারীদের চিন্তাভাবনার খতিয়ান তৈরি করছি।’’

ইতিমধ্যে গত মাসে যাদবপুরের একটি আলোচনাসভায় পার্ক সার্কাস এলাকার বৈশিষ্ট্য এবং পার্ক সার্কাসের প্রতিবাদ-আন্দোলন— দু’টি বিষয় নিয়েই আলাদা ‘পেপার’ পড়েছেন গবেষকেরা। কলকাতার সংস্কৃতির বহুত্বের প্রসারে সক্রিয় ‘নো ইয়োর নেবার’ (পড়শিকে জানুন) বলে একটি মঞ্চের সহায়তায় পার্ক সার্কাস, খিদিরপুর, মেটিয়াবুরুজ, বেলগাছিয়ার মতো কয়েকটি এলাকার সিএএ-বিরোধী অবস্থানকে বিশ্লেষণের কাজটিও এগোচ্ছে। সাধারণ সমাজকর্মী থেকে নামী কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-গবেষক, অনেকেই কাজটির শরিক। সেন্ট জ়েভিয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্বের শিক্ষিকা সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়, ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ়ের ইতিহাসের শিক্ষিকা অন্বেষা সেনগুপ্ত বা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণারত হিবা আহমেদরা আলোচনায় ঠিক করছেন, বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে প্রতিবাদের মুখ বা তাঁদের আশপাশের লোকজনের থেকে কোন বিষয়গুলি বুঝতে চাওয়া হবে।

যাদবপুরের গবেষকদের মতে, দিল্লির শাহিন বাগের পথ ধরে কলকাতায় পার্ক সার্কাসের প্রতিবাদ দানা বাঁধলেও তার সঙ্গে মিল-অমিল খুঁটিয়ে দেখার দরকার রয়েছে। এই আন্দোলনের ফলে মেয়েদের ক্ষমতায়নের চেষ্টা কতটা এগোতে পারল কিংবা এই আন্দোলনের সূত্রে কলকাতার বিভিন্ন ভাষা-ধর্মের গোষ্ঠী কতটা কাছাকাছি আসছে— খতিয়ে দেখছে এই গবেষণা-প্রকল্প। ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকেও এই প্রতিবাদের ধারা আজকের কলকাতাকে সামগ্রিক ভাবে বুঝতেই সাহায্য করছে। 

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন