শুক্রবার গভীর রাতে মৃত্যু হয়েছে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসাধীন সেন্ট্রাল স্টেশনে মেট্রোর সামনে ঝাঁপ দেওয়া সেই পড়ুয়ার। মধ্য কলকাতার ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের দশম শ্রেণির পড়ুয়া ছিল সে। কয়েক বছর আগে তার মা মারা গিয়েছেন। জানা গিয়েছে, সম্প্রতি পড়াশোনা নিয়ে পরিজনেরা তাকে বকেছিলেন।

এই ঘটনার পরে ফের উঠে আসছে সেই প্রশ্নটাই। বছরের পর বছর ধরে মেট্রোয় মৃত্যু মিছিল চললেও কেন তা বন্ধ করতে তৎপর নন মেট্রো কর্তৃপক্ষ। শনিবার মেট্রোযাত্রীদের মধ্যে ঘুরে ফিরে আসছে এই সংক্রান্ত আলোচনাই। আত্মহত্যা ঠেকাতে এক সময়ে মেট্রোয় স্ক্রিন গেট বসানোর কথা বলা হলেও প্রযুক্তিগত অসুবিধার কারণে সেই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়নি। পাশাপাশি ব্যাপক স্তরে সচেতনতা বাড়ানোর কাজেও মেট্রো কর্তৃপক্ষের কোনও উদ্যোগ নেই বলেই অভিযোগ। কর্তৃপক্ষের দাবি, যাত্রীদের সচেতন করতে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার হেল্পলাইন নম্বর (২৪৬৩৭৪০১/ ২৪৬৩৭৪৩২) সোম থেকে শনি সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে। পোস্টারে সাঁটানো সেই বিজ্ঞপ্তি বিভিন্ন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের বাইরে এমন ভাবে রয়েছে, কার্যত তা কারও চোখেই পড়ে না বলে দাবি যাত্রীদের।

মেট্রোয় সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার পর থেকে যাত্রীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে প্রচারের মাত্রা বাড়িয়েছেন কর্তৃপক্ষ। তাতে কাজও হচ্ছে বলে দাবি মেট্রোর। অথচ আত্মহত্যা ঠেকাতে সচেতনতার প্রচারে এখনও পিছিয়েই কর্তৃপক্ষ বলে অভিযোগ উঠছে। বরং দাবি, এ নিয়ে আলোচনা করলে বা গুরত্ব দিলে আত্মহত্যার ঘটনা বাড়তে পারে, এমনই মান্ধাতার ভাবনাচিন্তায় আটকে মেট্রো কর্তাদের একাংশ।

কী ভাবে এই প্রবণতা রোখা যায়, তা জানতে বছর কয়েক আগে মুম্বইয়ের এক বিশেষজ্ঞ সংস্থার পরামর্শ নিয়েছিলেন মেট্রো কর্তৃপক্ষ। আত্মহননের ঘটনা যাতে সংবাদমাধ্যমে সে ভাবে গুরুত্ব না পায়, ওই সংস্থা তা দেখার পরামর্শ দিয়েছিল বলে দাবি মেট্রোর। এর পর থেকেই এ প্রসঙ্গে কোনও তৎপরতা মেট্রোর তরফে চোখে পড়ে না।

কিন্তু সচেতনতা বাড়ানোর পুরো প্রক্রিয়ায় সকলকে অংশগ্রহণ করাতে পারলে যে ফল মেলে, তা দেখা গেল শুক্রবারই। উল্টোডাঙার বেসরকারি স্বাস্থ্য ক্লিনিকের বছর তেত্রিশের এক কর্মী দুপুরে আচমকা অফিস 

থেকে বেরিয়ে যান। তিনি জানিয়েছিলেন, বেলগাছিয়া মেট্রোর দিকে যাচ্ছেন। কাজে এসে ওই দিন তাঁর এক সহকর্মীকে বলেছিলেন, মা ও স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর প্রবল অশান্তির কথাও। আগাম বিপদ আঁচ করে আগেই মেট্রো স্টেশনে ফোন করে বিষয়টি জানিয়ে দেন ওই সহকর্মী। সঙ্গে সঙ্গে তৎপর স্টেশন মাস্টার ওই বার্তা ও পোশাকের বিবরণ সংশ্লিষ্ট সকলকে জানিয়ে দেন। 

কিছু ক্ষণ পরে সিসি ক্যামেরার নজরদারিতে যুবকের উপস্থিতি ধরা পড়ে। প্ল্যাটফর্মে ঢোকার সময়েই আটক করা হয় তাঁকে। দীর্ঘ সময় কথা বলার পরে স্টেশন সুপারের ঘরে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। সময়োচিত পদক্ষেপ করলে যে বিপত্তি এড়ানো সম্ভব, তা মনে করেন মেট্রোয় আত্মহত্যার ঘটনা নিয়ে কাজ করা একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার প্রতিনিধি মলি থাম্বিও।

মনোরোগ চিকিৎসক রঞ্জন ঘোষের মতে, সারা পৃথিবী জুড়েই কম বয়সিদের মধ্যে মানসিক সমস্যা বাড়ছে। কলকাতাও তার ব্যতিক্রম নয়। ওই প্রবণতা ঠেকাতে না পারলে একটা প্রজন্মই বিপন্ন হয়ে পড়বে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে বিশেষ প্রচারের সাহায্য নিতে হবে, যাতে নির্দিষ্ট মানুষটির কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়া যায়। পাশাপাশি যাত্রীদেরও সতর্ক করতে হবে।