প্রবল বিরক্তিতে কয়েকটি খাতা টেবিলের উপরে ছুড়ে ফেললেন ভদ্রলোক। খাতাগুলির প্রতি পাতায় ঘর কাটা। সেই সব ঘরের মাথায় কোথাও লেখা ‘পুরসভা’, কোনওটায় ‘কাউন্সিলর কত’! প্রতি পাতার শেষের দু’টি ঘরে আবার লেখা, ‘আইনের খেলা’ এবং ‘অন্যান্য খরচ’!

প্রতি ঘরে লেখা টাকার অঙ্কে চোখ বোলাতে দেখে ভদ্রলোক বললেন, ‘‘দু’লক্ষ নব্বই হাজার টাকা দিয়ে পুরসভার কাছ থেকে পার্কিংয়ের টেন্ডার পেয়েছিলাম। তবে ব্যবসা আমি করতে পারিনি। টাকা খাওয়ার জন্য সব পিছনে লেগে গিয়েছিল। এত লোককে টাকা দিতে দিতে শেষে ব্যবসা তুলে দিতে হয়!’’ ‘আইনের খেলা’ কী? ভদ্রলোকের উত্তর, ‘‘বেআইনি টাকা তুলতে নেতারা তো আইনই দেখান। তাই ওই নাম দিয়েছিলাম।’’

পাইকপাড়ার বাসিন্দা ওই ব্যক্তির মতো পার্কিং ব্যবসায় নেমে ভুক্তভোগীর সংখ্যা কম নয়। তাঁদের অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর দলের নেতা-কর্মীদের কাটমানি ও তোলাবাজির টাকা ফেরত দিতে বলার পরে এ নিয়ে চর্চা হচ্ছে। কিন্তু শহরের সর্বত্রই পার্কিং ব্যবসা চালানোর একমাত্র চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হল, নেতা ও দাদাদের তুষ্ট রাখা। যাঁদের হাতে পুরসভার বৈধ অনুমোদন রয়েছে, তাঁদেরও টাকা দিতে হয় ‘শান্তি’তে ব্যবসা করার জন্য। আর যাঁদের কাছে পুরসভার অনুমোদন নেই, তাঁদের জন্য রয়েছে জনপ্রতিনিধিদের আলাদা ‘প্যাকেজ’। অর্থাৎ, যত টাকা পুরসভাকে টেন্ডার বাবদ দিতে হয়, তাঁকে তার অর্ধেক দিলেই হবে। এ ছাড়া, প্রতি মাসে আয়ের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ দিতে হবে। পুলিশি ঝামেলা তো বটেই, পার্কিংয়ে রাখতে না চাওয়া গাড়ির চালককেও তিনিই ‘বুঝে’ নেবেন! অভিযোগ, এই সুযোগেই শহর জুড়ে বেআইনি পার্কিংয়ের রমরমা ব্যবসা চলছে।

‘দাদার আশীর্বাদে’ দক্ষিণ কলকাতার দেশপ্রিয় পার্ক, ম্যাডক্স স্কোয়ার ও বালিগঞ্জ এলাকায় এমনই পার্কিং ব্যবসার রমরমার কথা শোনালেন এক ব্যক্তি। তাঁর দাবি, জনপ্রতিনিধির ‘সাহায্য’ ছাড়া এই এলাকায় পার্কিং ব্যবসার টেন্ডার কার্যত পাওয়াই যায় না। ‘সাহায্য’ পেতে গুনতে হয় মোটা টাকা। টেন্ডার পাওয়ার পরে শুরু হয় জনপ্রতিনিধির সঙ্গে মাসিক খাতার হিসেব। দিন কয়েক বাদে দেখা যায়, রাস্তার যে অংশে পার্কিং-ফি আদায়ের জন্য ওই ব্যবসায়ী পুরসভার টেন্ডার পেয়েছিলেন, তার বাইরের এলাকা থেকেও টাকা তুলছেন তিনি। তাঁর যুক্তি, ‘‘পুরসভাকে দেব, আবার নেতারাও খাবেন! বাইরের গাড়ি না ধরলে হবে? এত টাকা আনব কোথা থেকে?’’

দক্ষিণ কলকাতাতেই রেস্তরাঁবহুল একটি রাস্তায় পার্কিংয়ের ক্ষেত্রে আবার আলাদা নিয়ম। সেখানে পুরসভার টেন্ডারের ভিত্তিতে নয়, নেতা-দাদাদের ‘আশীর্বাদ’ নিয়েই পার্কিং চালান এক ব্যক্তি। অভিযোগ, গাড়ি তো বটেই, স্থানীয় রেস্তরাঁ থেকেও তোলা টাকার বখরা নিয়ে নেতার সঙ্গে মাসের খাতা চলে তাঁর। দক্ষিণ কলকাতায় পুরসভার ৮ নম্বর বরোর চেয়ারম্যান সন্দীপরঞ্জন বক্সী অবশ্য বলছেন, 

‘‘একজনের পুরসভার দেওয়া মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। বন্ধ করিয়ে দিয়েছি। কাটমানি খাইনি।’’

উত্তর কলকাতায় খাল সংলগ্ন জমি আবার পার্কিং ব্যবসার খাসতালুক। সেখানে কোথাও লরির লম্বা লাইন। কোথাও সৌন্দর্যায়নের জন্য পার্কের গেট আটকে পরপর দাঁড়িয়ে ছোট গাড়ি। অভিযোগ, গাড়ি-পিছু স্থানীয় পুর প্রশাসনের নেতৃত্বেই প্রতিদিন ২০০-৩০০ টাকা করে ওঠে। অভিযোগ কার্যত মেনে নিয়েই স্থানীয় তিন নম্বর বরোর চেয়ারম্যান অনিন্দ্য রাউত দাবি করলেন, ‘‘অভিযোগ এলেই পুলিশকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।’’

সেই ব্যবস্থায় অবশ্য কাজ না হওয়াতেই ব্যবসা তুলে দিতে হয়েছে বলে জানালেন বেলেঘাটার আর এক ব্যবসায়ী। তাঁর বক্তব্য, ‘‘২০০৯ সালে কলকাতা পুরসভার প্রায় ন’টি ওয়ার্ড মিলিয়ে চার বন্ধু মিলে পার্কিংয়ের টেন্ডার নিয়েছিলাম। তখন বুঝিনি। প্রথম মাস থেকেই দেখি, নেতা-মন্ত্রী মিলিয়ে প্রায় এক লক্ষ টাকা করে বেরিয়ে যাচ্ছে। ২০১১ সালে ব্যবসা বন্ধ করে দিই!’’

কলকাতা পুরসভার পার্কিং বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মেয়র পারিষদ দেবাশিস কুমার অভিযোগ মেনে নিয়ে বলেন, ‘‘এমন অভিযোগ একেবারেই আসে না বলা ভুল। খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। মুখ্যমন্ত্রীও ব্যবস্থা নেওয়ার কথাই বলেছেন।’’

ভুক্তভোগী ওই ব্যবসায়ী অবশ্য বলছেন, ‘‘অনেক মন্ত্রীর কাছে ঘুরেও কিছু হয়নি। সকলেই সব জানেন, তবু কিছুই বদলায় না।’’

মুখ্যমন্ত্রীর কড়া অবস্থানে এ বার বদল হবে কি? প্রশ্ন অবশ্য থেকেই 

যায়। (শেষ)

এবার শুধু খবর পড়া নয়, খবর দেখাও। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের YouTube Channel - এ।