বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও অঙ্কশাস্ত্রে (একত্রে ‘স্টেম’) ভারতীয় মহিলাদের উল্লেখযোগ্য অবদানের ইতিহাস রয়েছে। মহিলাদের মধ্যে বিজ্ঞানে দেশের প্রথম পিএইচডি অসীমা চট্টোপাধ্যায়, কর্নাটক থেকে প্রথম ইঞ্জিনিয়ার রাজেশ্বরী চট্টোপাধ্যায়, অঙ্কে তুখোড় ‘হিউম্যান কম্পিউটার’ শকুন্তলা দেবী— উদাহরণ আছে বেশ কিছু। তা সত্ত্বেও ওই চার ক্ষেত্রে ভারতীয় মহিলাদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে কম। তবু মেয়েদের আরও এগিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারেন মেয়েরাই, এই ভাবনা থেকে রাজ্যের বিভিন্ন কলেজের মুষ্টিমেয় কয়েক জন ছাত্রীকে নিয়ে যৌথ ভাবে কর্মশালা করিয়েছিল মার্কিন তথ্যকেন্দ্র এবং শহরের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। ছ’মাসের সেই কর্মশালার শেষে বুধবার এক অনুষ্ঠানে ওই ছাত্রীরা জানালেন, কর্মক্ষেত্র এবং অন্যত্র যুদ্ধ চালানোর রসদ কী ভাবে এই কর্মশালা থেকে সংগ্রহ করেছেন তাঁরা। 

অঙ্কে মাথা নেই। পরিবারের প্রতি অতিরিক্ত দায়িত্ব। পিতৃতান্ত্রিক সমাজের নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা। কর্মক্ষেত্রে কাজ করেও উঁচু পদে না পৌঁছতে পারার হতাশা। এই সমস্ত নানা কারণে অনেক সময়েই ‘স্টেম’-এর কোনও ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ পেয়েও ইস্তফা দিতে বাধ্য হন ভারতীয় মহিলারা। কেউ আবার প্রথমেই বাধ্য হন না এগোতে। ‘ইউনেস্কো ইনস্টিটিউট ফর স্ট্যাটিস্টিক্স’-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে গবেষকদের মধ্যে মাত্র ১৪ শতাংশ মহিলা। আর বিভিন্ন সংস্থা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে উঁচু পদে থাকা ভারতীয় মহিলাদের সংখ্যা মাত্র ২৫ শতাংশ।

তাই নারীর ক্ষমতায়ন এবং সমানাধিকারের কথা মাথায় রেখেই শহর ও শহরতলির কয়েকটি কলেজের স্নাতক স্তরে পড়াশোনা করা বাছাই ছাত্রীদের নিয়ে ‘উইমেন ফর উইমেন’ কর্মশালার আয়োজন করেছিল মার্কিন তথ্যকেন্দ্র এবং শহরের একটি 

স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ, গোখেল মেমোরিয়াল কলেজ, যোগমায়াদেবী কলেজ, বিজয়কৃষ্ণ গার্লস কলেজ, নরসিংহ দত্ত কলেজ থেকে মোট ২৮ জন ছাত্রীকে লিখিত পরীক্ষা, আলোচনা এবং ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে বাছাই করা হয়েছিল। ধাঁধার সমাধান করা থেকে শুরু করে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা তৈরি, বহুজাতিক সংস্থার দফতরে ওই ছাত্রীদের নিয়ে গিয়ে সে সম্পর্কে খানিকটা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা— ছ’মাসের কর্মশালায় ছাত্রীরা শিখেছেন অনেক কিছুই। ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখা থেকে শুরু করে নিজেদের লক্ষ্য থেকে কোনও অবস্থাতেই পিছু না হটা, তা-ও শিখিয়েছেন মেন্টরেরা। 

কলকাতায় মার্কিন কনসাল জেনারেল প্যাটি হফম্যান মেনে নিচ্ছেন, মহিলাদের সমানাধিকারের লড়াইটাই আগামী দিনে সব চেয়ে বড় লড়াই হতে চলেছে। আয়োজক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার প্রধান ঝুম্পা ঘোষ রায়ও বলছেন, ‘‘সামাজিক চাপের সঙ্গে যুঝে নিয়ে নিজেদের লড়াইটা যেন ওরা নিজেরাই লড়ে নিতে পারে, সেটাই ছিল উদ্দেশ্য।’’ মার্কিন তথ্যকেন্দ্রের ডেপুটি ডিরেক্টর জে ট্রেলোয়ার বলছেন, ‘‘এই কর্মশালার উদ্দেশ্যই হল, মেয়েদের সফল হতে সাহায্য করা। কারণ ওঁরা সফল হলে তবেই দেশ এগোবে।’’ আয়োজকদের তরফে জানানো হয়েছে, আগামী দিনে নিজেদের কলেজে এই ছাত্রীরাই কর্মশালার আয়োজন করবে বাকি ছাত্রীদের জন্য। যাতে ওয়ার্কশপে অর্জিত মনোবল তাঁরা চারিয়ে দিতে পারেন বাকি বন্ধুদের মধ্যেও। আগামী বছরে গুয়াহাটিতেও এমন কর্মশালার আয়োজন করা হবে।

আর ছাত্রীরা? নরসিংহ দত্ত কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী, ধূলাগড়ের বাসিন্দা ঝিলিক হাজরা বলছেন, ‘‘পদার্থবিদ্যা পড়েও যে বহুজাতিক সংস্থায় চাকরির সুযোগ আছে, তা এখানে এসেই জানলাম।’’ যোগমায়াদেবী কলেজের প্রাণিবিদ্যার ছাত্রী সুতীর্থা রায়ের কথায় উঠে এসেছে পিতৃতান্ত্রিক সমাজে লিঙ্গবৈষম্য এবং #মিটু প্রসঙ্গ। বলছেন, ‘‘এ দেশে আমাদের দেবী বলে মনে করা হয়। দেবী হতে নয়, সমানাধিকার চাই। কর্মশালায় সেটাই শিখেছি।’’