Advertisement
E-Paper

তিনিই নিজের মন্দিরের প্রধান পুরোহিত

আচ্ছা, ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে কেনিয়ার বিরুদ্ধে শতরান করার পর সচিন তেন্ডুলকর আকাশের দিকে তাকিয়ে কাকে খুঁজছিলেন, জানেন? অথবা, তাঁর জীবনের শেষ টেস্টে তাঁর ব্যাটে জাতীয় পতাকার রঙ ব্যবহার করেছিলেন? তিনি আন্তর্জাতিক তারকা হওয়ার পরেও সাহিত্য সহবাসের বন্ধুদের সঙ্গে টেনিস বলে ক্রিকেট খেলতেন? কিন্তু, জানেন কি, ম্যাচ গড়াপেটা কেলেঙ্কারি ধরা পড়ার পর ভারতীয় ক্রিকেটের ড্রেসিংরুমে কতটা ঝড় বয়েছিল? বিনোদ কাম্বলির সঙ্গে তাঁর কৈশোরের বন্ধুত্ব ভেঙে গেল কেন? কপিল দেব কেন নিমন্ত্রণ পান না তাঁর বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে?

অমিতাভ গুপ্ত

শেষ আপডেট: ২৯ নভেম্বর ২০১৪ ০০:০১

আচ্ছা, ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে কেনিয়ার বিরুদ্ধে শতরান করার পর সচিন তেন্ডুলকর আকাশের দিকে তাকিয়ে কাকে খুঁজছিলেন, জানেন? অথবা, তাঁর জীবনের শেষ টেস্টে তাঁর ব্যাটে জাতীয় পতাকার রঙ ব্যবহার করেছিলেন? তিনি আন্তর্জাতিক তারকা হওয়ার পরেও সাহিত্য সহবাসের বন্ধুদের সঙ্গে টেনিস বলে ক্রিকেট খেলতেন? কিন্তু, জানেন কি, ম্যাচ গড়াপেটা কেলেঙ্কারি ধরা পড়ার পর ভারতীয় ক্রিকেটের ড্রেসিংরুমে কতটা ঝড় বয়েছিল? বিনোদ কাম্বলির সঙ্গে তাঁর কৈশোরের বন্ধুত্ব ভেঙে গেল কেন? কপিল দেব কেন নিমন্ত্রণ পান না তাঁর বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে?

যদি আপনি প্রথম তিনটি প্রশ্নের উত্তর জানেন, এবং পরের তিনটে প্রশ্নের উত্তর জানতে আগ্রহী হন, তা হলে সচিন তেন্ডুলকরের আত্মজীবনী প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে পড়ে আপনার কোনও লাভ নেই। সচিন জানা প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েছেন বিস্তারিত ভাবে, আর অজানা বিতর্কিত প্রসঙ্গগুলোকে এড়িয়ে গিয়েছেন, যে ভাবে অফ স্টাম্পের বাইরের বল ছাড়তেন দক্ষিণ আফ্রিকার পিচে। অথবা, যে ভাবে সারা জীবন সমস্ত বিতর্ক থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলেন, সেই ভাবে।

সচিন তেন্ডুলকর যে অনেকেরই আরাধ্য দেবতা, সন্দেহ নেই। কিন্তু, সেই দেবতার মন্দিরে প্রধান পুরোহিতের নাম যদি সচিন তেন্ডুলকর হয়, তবে খানিক বিচিত্র পরিস্থিতি তৈরি হয় বটে। আত্মজীবনীর সাড়ে চারশো পাতা জুড়ে ঠিক এই কাজটিই করেছেন তিনি। চব্বিশ বছর ব্যাপী কেরিয়ারে তিনি নিজের যে ভাবমূর্তি তৈরি করেছেন, আত্মজীবনী তার প্রতি অকুণ্ঠ শ্রদ্ধার্ঘ্য।

নিজের ভাবমূর্তি নিয়ে সচিন চিরকালই সচেতন। তাঁর আকাশছোঁয়া সাফল্য সত্ত্বেও মধ্যবিত্ত মন, পাশের বাড়ির ছেলের মতো; দেশের প্রতি অবিচলিত শ্রদ্ধা; এবং, কখনও কোনও বিতর্কে জড়িয়ে না পড়ার রেকর্ড— এগুলো সচিন তেন্ডুলকর নামক ব্র্যান্ডের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। বইয়ের প্রায় প্রতি পাতাতেই তাঁর এই দিকগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন সচিন। এগুলো তিনি, সত্যিই। কিন্তু, এইটুকুই তিনি, এমনটা ধরে নেওয়ার কোনও কারণ আছে কি? সচিন-ঘনিষ্ঠ এক ক্রিকেট সাংবাদিক দিনকয়েক আগে লিখেছিলেন, জনসমক্ষে সচিন যতটা পলিটিক্যালি কারেক্ট, ব্যক্তিগত জীবনে ঠিক ততখানিই ইনকারেক্ট, এবং সেটা বেশ মশলাদার রকমের রাজনৈতিক বেঠিকতা। নিজের সেই দিকগুলোকে অন্তত এই বার প্রকাশ্যে আনতে পারতেন তিনি। আর কিছু না হোক, বইটা পড়তে খানিক ভাল লাগত। এমনিতে, সচিন-উন্মাদ ছাড়া আর কারও পক্ষে বইটা শেষ করা কঠিন। কারণ, এটা মূলত ধারাভাষ্য ১৯৮৯ সালের পাকিস্তান সফর থেকে ২০১৩ সালের ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভারত সফর অবধি ২৪ বছর যত ম্যাচ খেলেছেন সচিন, সাল তারিখ মেনে পর পর সেগুলোর কথা বলে গিয়েছেন পাতার পর পাতা। বস্তুত, বইয়ের দ্বিতীয়াংশে পৌঁছে বার কয়েক সন্দেহও হল, ম্যাচের স্কোরকার্ড ধরে তার পর কিছু কথা জুড়ে দিয়েই বই লেখার কাজটা শেষ করেননি তো তিনি?

সচিনের আত্মজীবনী পড়তে যাঁরা আগ্রহী হবেন, ধরে নেওয়া যেতেই পারে, তাঁদের বেশির ভাগই ক্রিকেট ভক্ত। বস্তুত, ক্রিকেট-পাগল। এই খেলাগুলোর কথা তাঁদের অনেকেরই মনে আছে। অনেকের সবক’টা ম্যাচের কথাও মনে থাকা বিচিত্র নয়। তাঁরা ফের এক বার সেই কথাগুলোই পড়তে চাইবেন কেন? এমন কিছু চাইবেন না, যেগুলো তাঁদের আগে জানা নেই? সচিন সাড়ে চারশো পাতায় সেই পথ মাড়াননি বললেই হয়। তিনি মনে রাখতে পারতেন, তাঁর সম্বন্ধে যেটুকু জানা যায়, ততটুকু মানুষ এমনিতেই জানে। বলতে হলে নতুন কথা বলাই ভাল। পুরনো ক্ষত, পুষে রাখা রাগ, না পারার যন্ত্রণাগুলো এ বার পাঠকের সামনে আনার সময় হয়েছিল। সচিন সযত্নে এড়িয়ে গেলেন।

যতটুকু মন খুলেছেন, সেটা জানার জন্য বই পড়ার দরকার নেই। সবার ওপরে বিপণন সত্য, ফলে বই প্রকাশিত হওয়ার আগেই তার অংশবিশেষ চলে এসেছিল মিডিয়ায়, যেখানে জানা গেল, গ্রেগ চ্যাপেল কতখানি দমবন্ধ করে রেখেছিলেন ভারতীয় দলের। জানা গেল, মুলতানে ১৯৪ রানে নট আউট থাকার সময় ইনিংস ডিক্লেয়ার করে দেওয়ার জন্য সচিন আজও ক্ষমা করেননি রাহুল দ্রাবিড়কে। কিন্তু, ওই পর্যন্তই। যেমন, যে ম্যাচ গড়াপেটা কেলেঙ্কারিতে টালমাটাল হয়ে পড়েছিল ক্রিকেট দুনিয়া, তার সম্বন্ধে কোনও কথা নেই। সচিন জানিয়েছেন, ম্যাচ গড়াপেটার কথা প্রত্যক্ষ ভাবে জানতেন না তিনি, তাই এই প্রসঙ্গে ঢোকেননি। তর্কের খাতিরে না হয় বিশ্বাস করে নেওয়াই গেল যে সেই তুমুল কেলেঙ্কারির শব্দও ওয়াকম্যানের হেডফোন ভেদ করে তাঁর কানে প্রবেশ করেনি। কিন্তু, গড়াপেটা ধরা পড়ার পর দলের ভিতরে কী হয়েছিল, কী ভাবে সেই তীব্র অবিশ্বাসের মধ্যে থেকে ভারতীয় ক্রিকেটকে ফের নির্মাণ করেছিলেন তাঁরা, সেটাও কি উল্লেখযোগ্য নয়? দলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, অঞ্চলভিত্তিক ক্রিকেটার খেলানোর চাপ, কোনও বিষয়েই তাঁর কিছু বলার নেই?

কারও আত্মজীবনী পড়ার একটা বড় কারণ, তাঁর চোখ দিয়ে তাঁর সময়টাকে দেখতে পাওয়া। বিশেষত, তিনি যদি সচিন তেন্ডুলকরের মতো কেউ হন, যিনি আড়াই দশক ধরে ভারতীয় ক্রিকেটের উত্থান-পতন, দিকবদল দেখেছিলেন একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে। কী ভাবে উদার অর্থনীতির হাওয়ায় বদলে গেল ভারতীয় ক্রিকেট, কী ভাবে বিজ্ঞাপন মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠল, লিখতেই পারতেন। কী ভাবে শুধু বাজারের জোরে ভারত বিশ্বক্রিকেটের নিয়ন্তা হয়ে উঠল, সেই গল্পও পাঠকের ভাল লাগতে পারত। কিন্তু, কোনও বিতর্কের আঁচ গায়ে না লাগানোই উদ্দেশ্য হলে এই প্রসঙ্গগুলো পরিহার্য। সচিন পরিহার করেছেন। তাঁর লেখায় এমন বহু ইনিংসের কথা এসেছে যেখানে তীব্র শারীরিক বা মানসিক যন্ত্রণা নিয়েও খেলে গিয়েছেন তিনি। কিন্তু, কেন বিদেশে তাঁর চতুর্থ ইনিংসে ম্যাচ জেতানো ইনিংস মাত্র দুটো, সেই প্রসঙ্গ আসেনি।

তবে, এমন কিছু ঝলক আছে, যেখানে ‘মানুষ সচিনের’ দেখা পাওয়া যায়। অঞ্জলির সঙ্গে তাঁর প্রেমকাহিনি উপভোগ্য। সচিনের বিনয়ের বাহুল্য টপকেও সেই প্রায়-কৈশোর প্রেমের তাজা ভাবটা অনুভব করা যায়। সাহিত্য সহবাসে নিজের শৈশবের কথা বলার সময়েও সচিন সময়টাকে ধরতে পেরেছেন। আবার, শারীরিক চোট প্রসঙ্গে যখন তিনি ভারতে ক্রীড়া-চিকিত্‌সার পরিকাঠামোর অভাবের কথা উল্লেখ করেন, তখনও তাঁর সত্যিকারের ক্ষোভ, হতাশাগুলোকে দেখতে পাওয়া যায়। তাঁর শততম শতরান নিয়ে মিডিয়ায় অনন্ত আলোচনা, গোটা দেশের প্রত্যাশা কী ভাবে তাঁর ওপর চেপে বসেছিল, পড়তে পড়তে আশ্চর্য লাগে। আত্মজীবনী তো আসলে সেটাই। নিজের ভিতরটাকে পাঠকের সামনে মেলে ধরা। যে আত্মজীবনী প্রায় কাউকে চটায় না, তেমন বাবুরাম সাপুড়ের সাপমার্কা লেখা দিয়ে পাঠক কী করবেন? তবে, সহলেখক বোরিয়া মজুমদারকেও এই দায় খানিকটা বহন করতেই হবে। তাঁর কাজ ছিল সচিনকে দিয়ে তাঁর মনের ভিতরের কথা বলিয়ে নেওয়া। তিনি প্রথম বলে বোল্ড হয়েছেন।

সচিন উপমহাদেশের যে পিচে হাজার হাজার রান করেছেন, এই বইটা সেই পিচের মতো— পাটা, কোনও রকম বাউন্সের সম্ভাবনাহীন। তবে, সেই পিচে সচিনের ধুন্ধুমার ব্যাটিং যতটা উপভোগ্য, পিচটা ততখানি নয়। বইটাও।

amitabha gupta sachin tendulkar autobiography playing it my way book review
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy