বাড়ি সারাইয়ের কাজ চলছে। তাই বাইরে জাতীয় সড়কের পাশে মাচা তৈরি করে রাতে ঘুমিয়ে ছিল এক পরিবারের চার ছেলে। গভীর রাতে নিয়ন্ত্রণ হারানো এক ডাম্পারের ধাক্কায় মৃত্যু হল চার জনেরই।

মঙ্গলবার রাতে রানিগঞ্জে পুরসভার ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডে এই দুর্ঘটনায় মৃত রোহিত যাদব (১৭), ছত্রিশ যাদব (১৭) ও শিশুপাল যাদব (১১) সহোদর। মৃত্যু হয়েছে তাদের জেঠতুতো দাদা সুরজের যাদবেরও (১৯)। সে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ত। রোহিত দশম, ছত্রিশ সপ্তম ও শিশুপাল পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। বুধবার সকালে মৃতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও বেপরোয়া ভাবে গাড়ি চলাচল বন্ধের দাবিতে ৬০ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পুলিশের আশ্বাসে অবরোধ ওঠে।

রানিগঞ্জে আমরাসোঁতার সুজি মিল এলাকায় জাতীয় সড়কের পাশেই বাড়ি বাহাদুর যাদবের। তাঁর খাটাল ব্যবসা রয়েছে। স্ত্রী মারোদেবী, তিন ছেলে রোহিত, ছত্রিশ ও শিশুপাল এবং বছর পাঁচেকের মেয়ে রজনীকে নিয়ে তাঁর সংসার। তাঁদের সঙ্গেই থাকত বাহাদুরবাবুর দাদা, প্রয়াত শ্রীকান্ত যাদবের ছেলে সুরজ। সে ও রোহিত রানিগঞ্জের মাড়োয়াড়ি সনাতন বিদ্যালয়ে পড়ত। ছত্রিশ দুর্গা বিদ্যালয় ও শিশুপাল গুরু নানক বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল।

পরিজনেরা জানান, বাড়ি সংস্কারের কাজ চলায় চার ভাই গত কয়েক রাতেই রাস্তার পাশে বাঁশের মাচা তৈরি করে ঘুমোচ্ছিল। মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১২টা নাগাদ বীরভূমের পাঁচামি থেকে আসা পাথরের গুঁড়ো বোঝাই একটি ডাম্পার ওই মাচায় ধাক্কা দিয়ে উল্টে যায়। তাতে চাপা প়ড়ে যায় চার ভাই। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তাদের।

বাহাদুরবাবু ও মারোদেবী মেয়েকে নিয়ে বাড়িতে ঘুমোচ্ছিলেন। বাহাদুরবাবুর ভাই পিন্টু যাদব জানান, তিনি রাতে দাদার বাড়িতে আসছিলেন। রানিগঞ্জ স্টেশনে রাত ১টা নাগাদ ট্রেন থেকে নেমে সেখানে পৌঁছে দেখেন একটি ডাম্পার উল্টে পড়ে রয়েছে। নীচে চাপা পড়ে আছে কয়েকজন। তাঁর কথায়, ‘‘ওই দৃশ্য দেখে আঁতকে উঠি। দাদাকে ডেকে তুলে ওই ঘটনা দেখানোর পরে জানতে পারি, ডাম্পারে চাপা পড়েছে ভাইপোরা।’’

ঘটনার পর থেকে কথা বলার মতো অবস্থা নেই মারোদেবী। বাহাদুরবাবু বিলাপ করছেন। বুধবার দুপুর ১২টা নাগাদ ঝাড়খণ্ডের জামুইয়ের সাপোগ্রাম থেকে সুরজের দাদা রাকেশ ও মা রাধেদেবী রানিগঞ্জে পৌঁছন। রাধেদেবী শোকে ভেঙে পড়েন। রাকেশ বলেন, “আমরা তিন ভাই মাকে নিয়ে গ্রামে থাকি। সেজো ভাই সুরজ কাকার কাছেই থাকত। খাটাল থেকে দুধের ব্যবসা করে কাকার সংসার চলে। এক সঙ্গে চার ছেলেকে হারিয়ে পরিবারের সবাই ভাষা হারিয়েছে।” এ দিন হাঁড়ি চড়েনি প্রতিবেশী অনেকের বাড়িতেও।

প্রতিবেশী মোহন সাউ, বিজয় যাদব, পিন্টু তারবেদের অভিযোগ, “নিয়ম না মেনে অতিরিক্ত জিনিস বোঝাই করে ট্রাক-ডাম্পার যাতায়াতের জন্য বিপদ বাড়ছে। তার জেরেই এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেল। প্রশাসনের উচিত এ দিকে নজর দেওয়া।” এ দিন দুপুরে মৃতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন রানিগঞ্জের বিধায়ক রুনু দত্ত ও রানিগঞ্জের প্রাক্তন পুরপ্রধান অনুপ মিত্র। রুনুবাবু বলেন, “মর্মান্তিক ঘটনা। সরকারের তরফে যাতে পরিবারটি আর্থিক সহয়তা পায়, সেই আবেদন জানাব।” স্থানীয় কাউন্সিলর সুচেতা পাল বলেন, ‘‘সব রকম সরকারি সাহায্যের চেষ্টা করব পরিবারটির জন্য।’’

পুলিশ জানায়, দুর্ঘটনার পরেই ডাম্পারের চালক পালিয়ে যায়। তবে খালাসিকে ধরে ফেলেন আশপাশের লোকজন। ডাম্পারটির মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা চলছে।