ছেলে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছে, রাতে ফোনে খবর পেয়েছিলেন তিনি। তার পর থেকে জামাল শেখকে বারবার ফোন করে খোঁজ নিয়েছিলেন, ছেলের কোনও হদিস মিলেছে কি না। পর দিন দুপুরে ছেলের মৃত্যুসংবাদ পান জামালের কাছেই। কিন্তু ছেলেকে খুনের পিছনে জামাল থাকতে পারে, তা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি বলে জানান মোর্শেদ শেখ। পূর্বস্থলীর বাবুইডাঙায় স্কুলছাত্রকে খুনের অভিযোগে পুলিশ জামালকে গ্রেফতার করেছে জেনে স্তম্ভিত হয়ে যান তিনি।

স্ত্রী যখন সন্তানসম্ভবা, সেই সময়ে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায় কাটোয়ার অগ্রদ্বীপের বাসিন্দা মোর্শেদের। বাবুইডাঙায় বাপেরবাড়িতে আর্শেদ শেখের জন্ম দেন তাঁর স্ত্রী। ছেলের জন্মের কথা জানলেও স্ত্রী-শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে আর যোগাযোগ ছিল না মোর্শেদের। তিনি কেরলে রাজমিস্ত্রির কাজ করতে চলে যান। বছর চারেক আগে দ্বিতীয় বিয়েও করেন। আর্শেদ মানুষ হচ্ছিল মামারবাড়িতেই। বছর ছয়েক আগে মৃত্যু হয় তাঁর মায়ের। ৪ ডিসেম্বর গ্রামের সর্ষেখেত থেকে আর্শেদের রক্তাক্ত দেহ মেলে। ২৪ ডিসেম্বর খুনের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় জামালকে।

বৃহস্পতিবার ফোনে মোর্শেদ জানান, প্রথমপক্ষের সন্তান আর্শেদকে দেখার জন্য ছটফট করতেন তিনি। মাস দুয়েক আগে কেরলে কাজে যাওয়া পূর্বস্থলীর এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়। তিনিই জানান, ফোনে ছেলের সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। তাঁর মাধ্যমেই বাবুইডাঙার বাসিন্দা জামালের নম্বর পান মোর্শেদ।

মোর্শেদ বলেন, ‘‘জামালকে ফোন করলে সে জানাত, বাড়ি থেকে আর্শেদকে ডেকে নিয়ে আসবে। সে জন্য দশ মিনিট পরে আবার ফোন করতে বলত। তখন ফোন করলেই উল্টো দিক থেকে কমবয়সী ছেলের গলায় বাবা বলে ডাক শুনতাম। ছেলেকে ফিরে পাওয়ায় আনন্দ হত। প্রথমে দু’চার দিন অন্তর, তার পরে ঘনঘন ফোন করতাম। তখন পড়াশোনা, মোবাইল কেনার জন্য টাকা চাইত।’’ তিনি জানান, প্রথমে পড়াশোনার জন্য তিন হাজার ও তার পরে মোবাইল কেনার জন্য দশ হাজার টাকা পাঠান একটি অ্যাকাউন্টে।তার পরে মোটরবাইক কিনে দেওয়ার আব্দার আসে। তখনই পরীক্ষা শেষ হলে গ্রামে গিয়ে ছেলেকে  নিজের কাছে নিয়ে আসবেন বলে জানান তিনি।

পুলিশের দাবি, ফোনে কমবয়সী ছেলের গলা নকল করে ছেলে সেজে মোর্শেদের সঙ্গে জামালই কথা বলত। মোর্শেদ গ্রামে আসার কথা বলায় সে প্রতারণা ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করে। তখনই আর্শেদকে খুনের পরিকল্পনা করে। ৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় অষ্টম শ্রেণির ওই ছাত্রকে রাস্তা থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে প্রথমে মাথায় ইটের আঘাত, তার পরে শ্বাসরোধ করে জামাল খুন করে বলে অভিযোগ।

মোর্শেদ বলেন, ‘‘৩ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ১০টা নাগাদ জামালকে ফোন করে ছেলের খোঁজ নিই। আর্শেদের হদিস মিলছে না শুনে চিন্তা হচ্ছিল। পর দিন সকাল পৌনে ৭টা নাগাদ আবার জামালকে ফোন করলে সে জানায়, তখনও কোনও খোঁজ নেই। দুপুর দেড়টা নাগাদ জামাল ফোন করে জানায়, ছেলে মারা গিয়েছে। তা শুনে আমার হাত থেকে ফোনটা পড়ে যায়।’’

মোর্শেদ জানান, এর পরে তিনি রীতিমতো ভেঙে পড়েছিলেন। দিন কয়েক পরে পুলিশ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে। পুলিশের কথামতো কেরল থেকে ফিরে এসে অ্যাকাউন্টের নথিপত্র-সহ নানা প্রমাণ তুলে দিয়েছেন বলে জানান তিনি। মোর্শেদ বলেন, ‘‘জামাল এ ভাবে ঠকাচ্ছে, বুঝতেই পারিনি। ও যদি আমার কাছে ভুল স্বীকার করে নিত, কোনও আক্ষেপ থাকত না। তার বদলে যা করেছে, সে জন্য চরম শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’’

মোর্শেদের খেদ, ‘‘ছেলের সঙ্গে আমার যোগাযোগ করার ইচ্ছেটাই কাল হল। তা না হলে ছেলেটা অন্তত বেঁচে থাকত। সারা জীবন এই দুঃখ বয়ে বেড়াতে হবে আমাকে!’’