নিছক একটি চিঠি! নাকি হুমকি! নাকি অপমানের ধারাপাত!

চন্দননগরের তৃণমূল পরিচালিত পুরবোর্ড ভেঙে যাওয়ার পিছনে সম্প্রতি পুর কমিশনারকে লেখা পুর চেয়ারম্যানের একটি চিঠিকেই অনেকাংশে দায়ী করছেন তৃণমূল নেতৃত্বের একাংশ। কিন্তু পুরকর্মীরা মনে করছেন, ওই চিঠি আসলে ‘আত্মঘাতী চিঠি’। যা পুরবোর্ডের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিল তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিদের। যার জেরে পুর কমিশনার পুরসভা চালানোর দায়িত্ব পেয়ে ‘পুরস্কৃত’ হলেন। আর পদ খোয়ানো মেয়র-সহ কাউন্সিলররা কার্যত ‘ভবঘুরে’ হয়ে গেলেন!

বোর্ড ভেঙে যাওয়ার পরে ছ’দিন কেটে গিয়েছে। কিন্তু সেই চিঠি নিয়ে এখনও তোলপাড় চলছে পুরসভার অন্দরে। শহরের আমজনতার চর্চাও চলছে পুরোদমে। কী আছে সেই চিঠিতে?

আট পাতার চিঠিটি আনন্দবাজারের হাতে এসেছে। গত ১০ অগস্ট পুর চেয়ারম্যান জয়ন্ত দাসের প্যাডে তাঁর সই ওই চিঠিতে পুর কমিশনার স্বপন কুণ্ডুকে প্রশ্ন করা হয়েছে, ‘আপনি কি কোনও মহামান্য আদালতের বিচারপতি? আইনবিদ? নাকি বেসরকারি মুনাফাখোর, জোচ্চোর, ব্যবসায়ী? প্রোমোটারের থেকে সুবিধাভোগী দালাল’? আরও প্রশ্ন, ‘মা-মাটি-মানুষের সৎ মমতাময়ী সরকারের ভাবমূর্তি কলঙ্কিত করতে রামভক্ত রাবণ ও বিরোধী অসুরকূলের সাম্প্রদায়িক সুপারি নিয়েছেন? এ ধরনের সীমা অতিক্রমকারী, অর্বাচীন, মিথ্যা কলঙ্ক লেপন করে চরিত্র হননকারী প্রচেষ্টার জন্য আপনার বিরুদ্ধে কেন মানহানির মামলা করা হবে না’?

মাত্র চার মাস আগে এই পুরসভায় যোগ দেওয়া স্বপনবাবুকে ওই চিঠিতে কার্যত অপমানও করা হয়েছে। লেখা হয়েছে, ‘আগেও ভুরি ভুরি অনিয়ম সম্পর্কে কাউন্সিলর, বরো চেয়ারম্যান, পূর্বতন কমিশনার, চন্দননগরের মহকুমাশাসক, স্থানীয় নাগরিক সমাজ, সরকারপন্থী বুদ্ধিজীবী— প্রত্যেকেই বারবার বক্তব্য পেশ করেছেন। এদের কণ্ঠরোধ করতে আপনার মতো ধান্দাবাজ ও মুনাফাখোর এত উদগ্রীব কেন? একজন প্রথম শ্রেণির জোচ্চোর, মিথ্যেবাদী, প্রতারক, কপট, ধূর্ত হিসেবে কোন পুরস্কারের জন্য নিজেকে যোগ্য মনে করছেন?’’

চিঠির একেবারে শেষে লেখা হয়েছে, ‘আপনার মতো এমন অকর্মণ্য, বাতেলাবাজ, নির্লজ্জ, চোর, দুর্নীতিগ্রস্ত, অপদার্থ, গর্দভ ও সরকারের ক্ষতিকারক অফিসার আমরা দেখিনি। দেখতে ইচ্ছাও করে না’।

কিন্তু জয়ন্তবাবু পুর কমিশনারকে এমন চিঠি দিতে গেলেন কেন? এ চিঠি কী তাঁরই লেখা?

জয়ন্তবাবুর বলেন, ‘‘ও চিঠি আমারই লেখা। সচেতন ভাবেই লিখেছি। উনি দুর্নীতিপরায়ণ। তার প্রমাণও জোগাড় করছি।’’

পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ২৭ জুলাই সেখানে কাউন্সিলরদের বৈঠক ছিল। সেই বৈঠকে জয়ন্তবাবু পুর কমিশনারকে নির্দেশ দেন, জি টি রোডের ধারে রথের সড়ক ও লিচুতলার মধ্যবর্তী এলাকার একটি বিতর্কিত আবাসনের ফাইলটি সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের কাউন্সিলরকে দেওয়ার জন্য। যাতে কাউন্সিলর ফাইলটি বাড়ি নিয়ে গিয়ে তার উপরে ‘নোট’ দিতে পারেন। পুর কমিশনার স্বপনবাবু তখনই চেয়ারম্যানকে জানান, পুর-আইন অনুযায়ী সরকারি ফাইল জনপ্রতিনিধিদের দেওয়ার নিয়ম নেই। অভিযোগ, রেগে জয়ন্তবাবু এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কাউন্সিলর পুর কমিশনারকে হেনস্থা করেন।

এখানেই শেষ নয়। স্বপনবাবু ৩ অগস্ট জয়ন্তবাবুকে একটি চিঠিতে লেখেন, ‘আপনি শিক্ষিত, জ্ঞানী ব্যক্তি। সরকারি নিয়ম-কানুন সবই আপনার জানা। আশা করব, সরকারি বৈঠকে আপনি সেই নিয়ম মেনেই সভা পরিচালনা করবেন। তা না হলে অন্য উদাহরণ তৈরি হবে, যা অনৈতিকও’।

পুরসভার আধিকারিকেরা মনে করছেন, এই চিঠির ভাষা কড়া হলেও সরকারি রীতির পরিপন্থী নয়। জয়ন্তবাবুর ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন, এই চিঠিতেই চটেন চেয়ারম্যান। তার পরেই তিনি ১০ অগস্ট স্বপনবাবুকে ওই চিঠি দেন। তাতে এই হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়, ‘কোনওদিন এ সব জালি চিঠিপত্র করবেন না। নিজের কাজ করুন বা দ্রুত বদলি নিয়ে অন্য কোথাও চলে যান’।

পুরসভার চৌহদ্দিতে না-থেকে স্বপনবাবুকে লেখা জয়ন্তবাবুর চিঠি পৌঁছে গিয়েছিল রাজ্য প্রশাসনের উপর মহলেও। স্বপনবাবুও বলেন, ‘‘চিঠির বিষয়ে যা জানানোর আমি উপর মহলে জানিয়েছি।’’

তবে, এই চিঠিই প্রথম নয়। চন্দননগরের পুর কমিশনার হওয়ার আগে স্বপনবাবু কল্যাণীর মহকুমাশাসক ছিলেন। সেখান থেকে বদলি হয়ে আসার কয়েকদিন আগেও তিনি চন্দননগর থেকে চিঠি পেয়েছিলেন। তাতেও ছিল ‘ওয়ার্নিং’। কে দিয়েছিল ওই চিঠি?