বারো বছরের মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছিল প্রতিবেশী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। অভিযোগ তো দূরের কথা, ঘটনার দু’দিন পর বসেছিল সালিশি।

সোমবার রাতে অভিযুক্ত ও নিগৃহীতার বাবা-মায়ের মধ্যে মধ্যস্থতা করে বিষয়টি মিটিয়ে দিতে চেয়েছিলেন গ্রামের অনেকে। গোল বাধালেন অভিযুক্তের স্ত্রী। যে জমিটি নির্যাতিতা নাবালিকার নামে লিখে দিতে বলেছিলেন গ্রামের ‘মাথা’রা তা দিতে রাজি হননি অভিযুক্তের স্ত্রী। রাত ১টা পর্যন্ত বাদানুবাদের সময়ই কে বা কারা খবর দেয় পুলিশে। তারপরই গ্রেফতার করা হয় অভিযুক্তকে।

হাওড়ার শ্যামপুরের কোলিয়া গ্রামের ঘটনা। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রামে গিয়ে ধর্ষিতা নাবালিকার বাবার অভিযোগ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে অভিযুক্ত বদিলাল মোল্লাকে। তার স্ত্রী অবশ্য দাবি করেছেন, ‘‘জমি বা টাকার বিনিময়ে এমন জঘন্য ঘটনা চেপে যাওয়া হোক এটা আমি চাইনি। আইন তার নিজের পথে চলুক।’’ নাবালিকার পরিবারের তরফ থেকে পাল্টা অভিযোগে বলা হয়েছে, সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে বিষয়টি চেপে যাওয়ার জন্য বদিলালের পরিবারের তরফ থেকে তাঁদের উপরে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল।

নাবালিকা ধর্ষণের আইন সম্প্রতি সংশোধন করা হয়েছে। ১২ বছর পর্যন্ত বয়সের নাবালিকাকে ধর্ষণের ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে আইনের সংশোধনীতে। সঙ্গে জরিমানাও। সংশোধিত আইনেই ধৃতের বিরুদ্ধে ৩৭৬ (৩) ধারা এবং পকসো আইনে মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের খবর, ধর্ষণের ঘটনাটি ঘটে ২৮ জুলাই, শনিবার দুপুরে। ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী ওই নাবালিকার বাবা দিনমজুর। মা সরকারি মাদ্রাসায় মিড-ডে মিল রান্নার কাজ করেন। ওই দিন দু’জনেই কাজে গিয়েছিলেন। অভিযোগ, সেই সুযোগে নাবালিকাকে ভুল বুঝিয়ে একটি ধানখেতে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে বদিলাল।

পরে মেয়েটিকে কান্নাকাটি করতে দেখে প্রতিবেশীরা জিজ্ঞাসা করে জানতে পারেন ঘটনার কথা। তাঁরাই নাবালিকার মা এবং বাবাকে খবর দেন। কিন্তু এর পর প্রতিবেশীদেরই অনেকে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ।

বদিলালের পক্ষ নিয়ে অনেকে নাবালিকার বাবা-মাকে প্রস্তাব দেন জমি এবং নগদ টাকার বিনিময়ে বিষয়টি মিটিয়ে নিতে। সেই মতো সোমবার রাতে গ্রামে সালিশি সভা বসে। সেখানে হাজির ছিল বদিলাল এবং ধর্ষিতার বাবা-মা। কিন্তু রফা প্রস্তাবে যে জমিটি নাবালিকার নামে লিখে দেওয়ার কথা হয়েছিল তা দিতে অস্বীকার করেন বদিলালের স্ত্রী। এই নিয়ে তুমু‌ল বিতন্ডার মধ্যেই গ্রামবাসীদের কেউ পুলিশে খবর দেন বলে জানা গিয়েছে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই হাজির হয়ে যায় পুলিশ। তখন রাত প্রায় ১টা। পুলিশ দেখে সালিশি সভা ফাঁকা হয়ে গেলেও পালাতে পারেনি বদিলাল। নাবালিকার বাবার কাছ থেকে অভিযোগ পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকেই বদিলালকে গ্রেফতার করে। বদিলালের পরিবারের সঙ্গে গ্রামবাসীদের একাংশ হাত মিলিয়েছিলেন বলে নাবালিকার পরিবারের অভিযোগ।

মঙ্গলবার সকালে গ্রামে যান গড়চুমুকের সিআই রাজা বন্দ্যোপাধ্যায়। নাবালিকার পরিবারের পাশে থাকার তিনি আশ্বাস দেন। এ দিনই উলুবেড়িয়া মহকুমা হাসপাতালে নাবালিকাটির শারীরিক পরীক্ষা করানো হয়।

হাওড়া গ্রামীণ জেলা পুলিশের এক কর্তা বলেন, ‘‘টাকা পয়সার প্রলোভন এবং চাপের মুখে পড়েই শেষ পর্যন্ত আইনের দ্বারস্থ হতে চান না নিগৃহীতার পরিবারগুলি। মামলা শুরু হলেও একই কারণে মাঝপথে তাঁরা সরে দাঁড়ান। তা হলে আর দোষীদের সাজা হবে কী করে?’’