চোর অপবাদ দিয়ে ডায়মন্ড হারবার, কলকাতার হরিদেবপুরে দুই ছাত্রকে পিটিয়ে মারার অভিযোগ উঠেছিল কয়েক মাস আগে। সোমবার চন্দননগরে ফের একই অপবাদে এক ছাত্রকে তুলে নিয়ে গিয়ে মারধর করা হয়েছে। রাতে ঋষভ চট্টোপাধ্যায় (১৯) নামে ওই ছাত্রের ঝুলন্ত মৃতদেহ ঘর থেকে উদ্ধার হয়। ঋষভের পরিবারের অভিযোগ, বাড়ি ফিরে অপমানে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে সে। আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয়েছে এক তৃণমূল কাউন্সিলরের দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে। ঋষভের মায়ের ওই অভিযোগের ভিত্তিতে প্রদীপ এবং বাবলু অগ্রবাল নামে দুই ভাইকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।

গত মে মাসে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডায়মন্ড হারবারে মোষ-চোর সন্দেহে কৌশিক পুরকাইত নামে এক ছাত্রকে পিটিয়ে মারার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ ওঠে তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্যের বিরুদ্ধে। তার মাস খানেকের মধ্যে ফের কলকাতার হরিদেবপুরে আমচোর সন্দেহে অনিরুদ্ধ বিশ্বাস নামে এখ উচ্চমাধ্যমিক ছাত্রকে পিটিয়ে মারার ঘটনা ঘটে। ফের একই অপবাদে ছাত্র পেটানোর ঘটনায় এ দিন চন্দননগরের খলিসানিতে উত্তেজনা ছড়ায়। 

ঋষভ এ বার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করে খলিসানি কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। সোমবার থেকে তাঁর ক্লাস চালু হওয়ার কথা ছিল। তাঁকে মারধরের ঘটনায় ধৃত প্রদীপ ও বাবলু অগ্রবাল জেরায় দোষ কবুল করেছেন বলে পুলিশের দাবি।

 ঘটনায় দলীয় কাউন্সিলরের ভাইরা জড়িত থাকায় স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বও অস্বস্তিতে। যদিও চন্দননগর পুরসভার ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর মুন্না অগ্রবালের বক্তব্য, ‘‘এফআইআর হয়েছে বলেই আমার দুই ভাইকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। তৃণমূলের জমানায় কাউন্সিলর বা মন্ত্রীর ভাইয়ের ক্ষেত্রেও আইন আইনের পথেই চলে। তবে যে অভিযোগ করা হয়েছে তা সত্যি নয়।’’ তাঁর দাবি, ‘‘ছোট ভাই প্রদীপের মোবাইল চুরি গিয়েছিল। ঋষভরা কয়েক জন বন্ধু মিলে সেটা চুরি করে। বিষয়টা জানাজানি হওয়াতেই ওই ঘটন‌া। মেজ ভাই বাবলু ঘটনার সঙ্গে কোনওভাবেই জড়িত নয়। তবু ওকে গ্রেফতার করা হল।’’

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে খবর, খলিসানি জেলেপাড়ায় একই বাড়িতে ভাড়া থাকেন ঋষভের পরিবার এবং প্রদীপ ও বাবলু। দিন কয়েক আগে বাবলুদের ঘর থেকে একটি মোবাইল ফোন চুরি যায় বলে অভিযোগ। তার কয়েক দিন আগে সোনার গয়নাও চুরি হয় বলে অগ্রবাল পরিবারের অভিযোগ। মোবাইল চুরির পর অগ্রবাল পরিবার ঋষভ-সহ আরও কয়েক জনকে সন্দেহ করে। ঋষভের পরিবারের অভিযোগ, রবিবার দুপুর ৩টে নাগাদ বাবলু তাঁদের ঘরে আসে। তারপর ঋষভকে থানায় নিয়ে যাবে বলে বাইকে তুলে কাছেই একটা পার্কে নিয়ে যায়। সেখানে তাঁকে বেধড়ক মারধর করা হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা নাগাদ ঋষভকে জখম অবস্থায় বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে যায়।

ছেলেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পরে পরেই ঋষভের বাবা দেবব্রতবাবু হৃদরোগে আক্রান্ত হন। বাড়ির লোকজন তাঁকে কল্যাণী হাসপাতালে ভর্তি করান। ঋষভ যখন ফিরে আসেন তখন বাড়িতে তাঁর মামি ছাড়া কেউ ছিলেন না। সকলেই ছিলেন হাসপাতালে। ঋষভ ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন।

রাত সাড়ে ৯টা নাগাদ বাড়ির লোকজন ফিরে দেখেন ঋষভের ঘরের দরজা বন্ধ। ডাকাডাকি করেও সাড়া না মেলায় দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে দেখা যায় ঋষভ গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছেন। চন্দননগর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ছেলের এমন মৃত্যুতে ঋষভের মা রুমাদেবী প্রদীপ ও বাবলু-সহ আরও কয়েক জনের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ দায়ের করলে পুলিশ প্রদীপ ও বাবলুকে গ্রেফতার করে।

‘‘ছে‌লে বার বার বলছিল ও চুরি করেনি। তা সত্ত্বেও থানায় নিয়ে যাবে বলে বাবলু ওকে তুলে নিয়ে যায়। দুই ভাই মিলে মারধর করে। সারা গায়ে কালশিটে ফেলে দেয়। হাত ফাটিয়ে দেয়। আমার একমাত্র ছেলে সেই অপমানেই এ ভাবে চলে গেল‌।’’ বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়লেন মা রুমাদেবী। মাসি ঝুমা বাগ বলেন, ‘‘পড়াশোনার পাশাপাশি ঋষভ খেলাধুলাও খুব ভালবাসত। আঁকার হাতও ভাল ছিল। শুধু শুধু ওকে চোর অপবাদ দেওয়া হয়। সেই অপমান সহ্য করতে না পেরেই ছেলেটা চলে গেল। যাদের জন্য এটা হল তাদের যেন উপযুক্ত শাস্তি হয়।’’

খলিসানিতে ওই বাড়িতে প্রায় ২৫ বছর ধরে ভাড়া আছেন রুমাদেবীরা। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে সজ্জন মানুষ বলেই তাঁরা পরিচিত। ঋষভও ‘ভাল ছেলে’ বলেই এলাকায় পরিচিত ছিলেন। অটো চালিয়েই সংসার চালান বাবা দেবব্রতবাবু। সংসারের অবস্থা সচ্ছল ছিল না। রুমাদেবী বলেন, ‘‘ছেলেকে নিয়ে ওর বাবার অনেক স্বপ্ন ছিল। ওঁকে কী ভাবে ছেলের কথা জানাব!’’

বাড়ির মালিক চৈতালি সরকারের কথায়, ‘‘বাবা-মায়ের মতো ভদ্র ছিল ঋষভ। বড়দের সম্মানও করত। আমাকে বলছিল, কলেজ থেকে পাশ করে চাকরি করবে। তখন বাবাকে আর কাজ করতে দেবে না। কিন্তু ছেলেটার সেই স্বপ্ন সফল হল না।’’