খাদানই চোখের বালি
গনগনিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার দাবি সেই বাম আমল থেকেই করে আসছেন গড়বেতার মানুষ।
shilabati river

গনগনিতে শিলাবতী নদী থেকে এই ভাবেই বালি তোলা হয়। নিজস্ব চিত্র

স্ত্রীকে নিয়ে গনগনি বেড়াতে গিয়েছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী দুর্গাদাস ঘোষ। কিন্তু মন ভাল হওয়ার বদলে ফিরলেন হতাশ হয়ে। 

কেন? বাহাত্তুরে বৃদ্ধের জবাব, ‘‘কোথায় কী! কয়েকবছর আগেও যা দেখেছি, এখনও তাই। বরং এখন নদী থেকে অবাধে বালি তোলার জেরে যত্রতত্র নিসর্গটাই মাটি হতে বসেছে।’’ গনগনি বেড়ানোর অভিজ্ঞতা সুখকর হয়নি হুমগড়ের সদ্য বিবাহিত শুভাশিস ও অরুণিমা মাহাতোরও। তাঁরা বলেন, ‘‘খবরের কাগজে পড়েছিলাম, গনগনিকে পর্যটন কেন্দ্র করা হচ্ছে। এসে দেখছি কিছুই হয়নি। রাস্তা খারাপ, একটা প্রাচীর দিয়ে যেন ঢেকে দেওয়া হচ্ছে গনগনিকে।’’ 

গড়বেতার পরিচিতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গনগনির সৌন্দর্য। ঝাড়গ্রাম লোকসভার অন্তর্গত গড়বেতা বিধানসভা এলাকায় কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে গনগনি নিয়ে হতাশা আর বালি মাফিয়াদের দাপটের   কথা। লোকসভা ভোটের প্রচারেও উঠে আসছে এই দুই প্রসঙ্গ। 

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯ 

গনগনিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার দাবি সেই বাম আমল থেকেই করে আসছেন গড়বেতার মানুষ। সেই দাবিকে পুর্ণতা দিতে গতবছরই জেলায় এসে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গনগনিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার কথা জানান। প্রাথমিকভাবে কয়েক কোটি টাকা বরাদ্দও হয়। যদিও কাজ কিছুই এগোয়নি বলে বিরোধীদের অভিযোগ।

একসময় গড়বেতা রাজনৈতিক সন্ত্রাসের খবরে শিরোনামে ছিল। ছোট আঙারিয়ার ঘটনা তো তোলপাড় করেছিল গোটা রাজ্য। সেই গড়বেতা জুড়ে এখন অবশ্য উন্নয়ন, কাজের কথা শোনা যাচ্ছে। ধাদিকার দীপক ঘোষ, ফুলবেড়িয়ার আতাউর মল্লিকের মতো প্রবীণ ভোটাররা বলছেন, ‘‘এখন রাস্তাঘাট ভাল হচ্ছে, কন্যাশ্রীতে মেয়েরা টাকা পাচ্ছে, স্কুল থেকে সাইকেল দিচ্ছে— সরকার থেকে নানা সুবিধা মিলছে, মানুষ শান্তিতে আছে।’’ ছোট আঙারিয়া গ্রামের সাবিয়া বিবির কথায়, ‘‘আমাদের গ্রামে রাস্তাটা পাকা হয়েছে, জলের সুবিধা করে দিয়েছে সরকার।’’ গড়বেতার তৃণমূল বিধায়ক আশিস চক্রবর্তী পরিসংখ্যান দিচ্ছেন, গত তিন বছরে গড়বেতা বিধানসভা কেন্দ্রে নতুন রাস্তাই হয়েছে ১০টির মতো। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোট থেকে ধরলে সংখ্যাটা আরও বেশি। শুধু রাস্তা নয়, বিধায়কের হিসেবে এই সময়ের মধ্যে কয়েকটি নতুন সেতু, গ্রামে গ্রামে পানীয় জল, হুমগড়ের কাছে বিদ্যুতের সাবস্টেশন— গড়বেতার প্রাপ্তির তালিকাটা দীর্ঘ।

২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটে গড়বেতায় সিপিএমের প্রার্থী ছিলেন সরফরাজ খান। তাঁর দাবি, ‘‘ তিন বছরে বালি আর খাদান মাফিয়াদের রমরমা বেড়েছে। বালি তুলে তুলে গনগনির ছবিটাই বদলে গিয়েছে।’’ 

বালি খাদানই যে এলাকায় তৃণমূলের চোখের বালি, তার আভাস মিলছে ভোটারদের কথাতেও। বিশেষ করে বালি গাড়ি যাতায়াতে গ্রামীণ রাস্তার দফারফা হচ্ছে। তৃণমূল বিধায়কের অবশ্য দাবি, সরকারি নির্দেশিকা মেনেই বালি তোলা হচ্ছে। তবে বাড়তি বালি বোঝাই গাড়ি নিয়ে বিধায়ক নিজেই অসন্তুষ্ট। তিনি বলেন, ‘‘ওভারলোড বন্ধ করতেই হবে। আমি বিডিও, বিএলএলআরও-কে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি।’’ 

বালি পাচার নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে গড়বেতার মাটিতে। এই সময়ের মধ্যে বিজেপির সাংগঠনিক শক্তিবৃদ্ধিও হয়েছে। ২০১৬ সালে বিজেপি প্রার্থী প্রদীপ লোধা পেয়েছিলেন ১৩ শতাংশ ভোট। তাঁর দাবি, ‘‘গড়বেতায় এ বার এক নম্বরে উঠে আসবে বিজেপি। এই ৫ বছরে গড়বেতায় তো বালি ব্যবসার উন্নয়ন হয়েছে। বালি তুলে আর অবাধে কাজুবাদাম বাগান ধ্বংস করে সব নষ্ট করে                       দেওয়া হচ্ছে।’’

সংখ্যার বিচারে তৃণমূল বহু কদম এগিয়ে, ধারেভারে, সাংগঠনিক শক্তিতেও। তবু চমকের অপেক্ষায় গেরুয়া শিবির। তৃণমূলের ব্লক সভাপতি সেবাব্রত ঘোষের অবশ্য শ্লেষ, ‘‘বিরোধীরা কোথায়!’’

কে, কোথায় দাঁড়িয়ে তা জানতে ২৩ মে পর্যন্ত ধৈর্য ধরতে হবে।

২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত