ট্যাপ ভাঙা টাইম কলের জল সকাল থেকে ভাসায় রাস্তা। দেখে না কেউ। 

বাড়তে থাকা শহরে ঘরে ঘরে সাব মার্সিবল পাম্প। হু হু করে উঠছে ভূগর্ভস্থ জল। হুঁশ নেই কারও। 

জল সংরক্ষণেরও উদ্যোগ নেই। উল্টে অবাধে চলছে গাছ কাটা। আলগা হচ্ছে মাটি। কমছে জলধারণ ক্ষমতা।

ছবিটা অরণ্যশহর ঝাড়গ্রামের। শহরের পরিবেশপ্রেমীরা তো বটেই, ভূ-বিজ্ঞানী ও গবেষকরাও বলছেন, জলের অপচয় না রুখলে সে দিন আর বেশি দূরে নয়, যখন জলকষ্টে চেন্নাইয়ে ছুঁয়ে যাবে ঝাড়গ্রাম! তবে সতর্কবার্তাতেও পর্যটন শহরে জলের অপচয় ঠেকাতে কোনও কার্যকরী পদক্ষেপ হচ্ছে না বলেই অভিযোগ। 

ঝাড়গ্রাম জেলা হওয়ার পরে গত দু’বছরে শহরে বহুতলের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। তৈরি হয়েছে বড়সড় বাজারও। ফলে, জলের চাহিদা বেড়েছে। ব্যক্তিগত বা বেসরকারি উদ্যোগে ভূগর্ভস্থ জল তোলার জন্য সাব মার্সিবল পাম্পের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। শহরে প্রতিদিনই বাসিন্দাদের কারও না কারও বাড়িতে বসছে। এ ক্ষেত্রে পুরসভার অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সে সবের তোয়াক্কা না করে সাব মার্সিবল পাম্প বসিয়ে ভূগর্ভস্থ জল তোলা হচ্ছে। 

সকলের বাড়িতে পাম্প নেই। আমজনতার ভরসা পুরসভার টাইম কল। সেই জলে আয়রন বেশি। তাই অনেকে কুয়োর জল ব্যবহার করেন। বেনাগেড়িয়ার বাসিন্দা সুব্রত মজুমদার, শক্তিনগরের জ্যোৎস্না বেরা জানালেন, বেশি কিছু টাইম কলে ট্যাপ না থাকায় প্রতিদিন প্রচুর জল অপচয় হয়। গ্রীষ্মে ট্যাপে জল পড়ে সুতোর মতো, পাতকুয়ো শুকিয়ে যায়। পুরসভা তখন জলের গাড়ি পাঠায়। আপাত সমস্যা মেটে। সঙ্কটের মূলটা থেকেই যায়।

১৮ ওয়ার্ডের ঝাড়গ্রাম শহরের জনসংখ্যা প্রায় ৯০ হাজার। পরিবার প্রায় ২২ হাজার। আর দোকানপাট ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হাজার দশেক। পুরসভা সূত্রে খবর, দিনে শহরে প্রায় ৬ লক্ষ গ্যালন জল প্রয়োজন। জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতরের সহযোগিতায় একাধিক ডিপ টিউবওয়েল ও মিনি ডিপ টিউবওয়েলে জল তুলে শহরের রাস্তার ধারের ১,২৮০ টি টাইম কলের মাধ্যমে দৈনিক তিন লক্ষ গ্যালন জল সরবরাহ করা হয়। এই অঙ্কে প্রতিদিন চাহিদার অর্ধেক জলের ঘাটতি থাকে।

এই সঙ্কটের মধ্যেই ভূগর্ভস্থ জলস্তর নেমে যাওয়ায় বিপদ বাড়ছে। তার উপর বেশিরভাগ টাইম কলের কলের মুখ চুরি হয়ে যায়। যে হারে শহরে অপরিকল্পিত ভাবে ডিপ টিউবওয়েল বসানো হচ্ছে, তাতেও বাড়ছে বিপদ। ঝাড়গ্রামের সেবাভারতী মহাবিদ্যালয়ের ভূগোলের বিভাগীয় প্রধান প্রণব সাহু দীর্ঘদিন অরণ্যশহরের ভৌমজলস্তর নিয়ে সমীক্ষা চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘‘ঝাড়গ্রাম শহরে ভৌম জলের স্তর কমছে। এ ব্যাপারে উপযুক্ত সমীক্ষা করে পুরসভাকে পদক্ষেপ করতে হবে।’’ ভূবিজ্ঞানীরা আরও বলছেন, বেশিরভাগ জায়গায় বাড়ি ও বহুতলের চারপাশটা কংক্রিটের বাঁধিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে, বৃষ্টির জল মাটির গভীরে পৌঁছতে পারছে না। ‘রেন ওয়াটার হারভেস্টিং’ বা বৃষ্টির জল সংরক্ষণ করে মাটির গভীরে পাঠানোর ব্যবস্থাও সে ভাবে নেই। তার উপর চলছে গাছ কাটা।

পুরসভার প্রশাসক সুবর্ণ রায়ের বক্তব্য, ‘‘জলের অপচয় রুখতে বাসিন্দাদের সচেতন করা হচ্ছে। যে সব টাইম কলে ট্যাপ নেই, সেগুলি লাগানো হচ্ছে। ভৌম জলের স্তর যথাযথ রাখার জন্য পরিকল্পনা নেওয়া হবে।’’ (চলবে)