• অনল আবেদিন
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

ক্যাম্পাস: কৃষ্ণনাথ কলেজ

বাইশ বছরের রাজার কলেজ আজ ১৬২তে

10
ছবি তুলেছেন গৌতম প্রামাণিক।

Advertisement

পড়ুয়া ৩ হাজার

স্থায়ী শিক্ষক ৪৬

শূন্য পদ ১০টি

গ্রন্থাগার ১৬টি

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েরও চার বছর আগে,  ১৮৫৩ সালে  তৈরি হয় বহরমপুর কলেজ। মাত্র ২২ বছরের এক যুবকের আগ্রহে। যিনি নিজে সে কলেজ দেখে যেতে পারেননি।

রামমোহন রায়, ডেভিড হেয়ার ও ডিরোজিওর ভাবশিষ্য ছিলেন কাশিমবাজারের মহারাজা কৃষ্ণনাথ রায়। মনে ইচ্ছে, মুক্তমনে জ্ঞানচর্চা হবে এ দেশেও। তাই নিজের সব সম্পত্তি কলেজকে দানপত্র করলেন। তার পরদিনই (৩১ অক্টোবর, ১৮৪৪) মারা যান  কৃষ্ণনাথ।  স্বামীর ইচ্ছাপূরণে উদ্যোগী হন রানি স্বর্ণময়ী। তাঁর জন্যই তৈরি হয় কলেজ। ১৮৫৩ সালের ১ নভেম্বর কলেজের পঠনপাঠন শুরু হয়। ১৯০৩ সালে বহরমপুর কলেজের নাম বদলে হয় কৃষ্ণনাথ কলেজ।

৬ অগস্ট, ১৯২৫ কৃষ্ণনাথ কলেজে এসেছিলেন মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধী। তিনি বলেছিলেন, ‘‘জাতি হিসাবে পার্সিদের সম্মিলিত দানের তুলনা হয় না। কিন্তু একক ভাবে কাশিমবাজার মহারাজার দানের তুলনা পৃথিবীতেই নেই।’’

তবে রাজা-রানির ইচ্ছেয় কলেজ শুরু হলেও, বহু মানুষ অংশ নেন এর গোড়াপত্তনে। ১৮৫৩ সালের ১৬ অগস্টের বেঙ্গল হরকরা-র রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ওই বছরের ১০ অগস্ট তৎকালীন জেলাশাসক ডি জে মানির সভাপতিত্বে বহরমপুরে দু’শোরও বেশি বিদ্যানুরাগীর সভায় ‘বহরমপুর কলেজ’ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য রানি স্বর্ণময়ী চার হাজার টাকা এবং নবাব পরিবারের দুই বেগম আমিরুন্নেশা ও নুজিবুন্নেশা দেন চার হাজার টাকা। মুর্শিদাবাদ জেলার ১৫০ রাজা-জমিদার কলেজ নির্মাণ তহবিলে দান করেন। এ ছাড়াও আরও চার বিধবা মহিলা, হরিহরপাড়ার ৮৪ জন কৃষক কলেজের জন্য টাকা দেন।

স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় কলেজ অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের গোপন ডেরা ছিল এই কলেজ। এখানকারই ছাত্র ছিলেন মাস্টারদা সূর্য সেন, নলিনী বাগচি, নিরঞ্জন সেন। প্রখ্যাত পরিচালক ঋত্বিক ঘটকও কৃষ্ণনাথ কলেজের ছাত্র। অবিভক্ত বাংলায় এই কলেজে খুব উচ্চমানের বিতর্ক প্রতিযোগিতা হত। পরপর দু’বছর সেই বিতর্কে একজনই জয়ী হ’ন। তিনি বর্তমানে ভারতের রাষ্ট্রপতি, প্রণব মুখোপাধ্যায়।

১৮৮৭ থেকে ১০ বছর কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল। তবে মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী ও অধ্যক্ষ এডওয়ার্ড হুইলারের তত্ত্বাবধানে কলেজের স্বর্ণযুগের সূচনা। সেই সময় কলেজের এতটাই উন্নতি হয়েছিল যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের জন্য আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এখান থেকে ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি নিয়ে যান।

আশির দশকে ভবতোষ দত্ত শিক্ষা কমিশন প্রেসিডেন্সির সঙ্গে কৃষ্ণনাথ কলেজকেও
ডিমড্ বিশ্ববিদ্যালয় করার সুপারিশ করেছিল। কিন্তু তা হয়নি। তবে মানবসম্পদ
উন্নয়ন মন্ত্রক রাজ্যে যে পাঁচটি গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেই
তালিকায় কৃষ্ণনাথ কলেজও রয়েছে। কল্যাণাক্ষ ঘোষ, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ  

এক সময় এই কলেজে রাতে কমার্স ও আইন কলেজ চলত। কমার্স কলেজটি ‘বহরমপুর কলেজ’ নামে শহরের অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়েছে। আইন কলেজ আজ আর নেই। তবে ভাল কলেজ হিসেবে কৃষ্ণনাথ কলেজের নাম বারবার সেরার তালিকায় উঠে এসেছে। আশির দশকে ভবতোষ দত্ত শিক্ষা কমিশন প্রেসিডেন্সি কলেজ, হুগলির হাজি মহসিন কলেজ, কৃষ্ণনগর গভর্নমেন্ট কলেজের সঙ্গে কৃষ্ণনাথ কলেজকেও ‘ডিমড্ বিশ্ববিদ্যালয়’ করার সুপারিশ করে। যদিও শেষ অবধি তা হয়নি। তবে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কল্যাণাক্ষ ঘোষ জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক যে পাঁচটি গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে  কৃষ্ণনাথ কলেজও। ২০০৯ সালে কলেজটির প্রথম ‘ন্যাক’ মূল্যায়ন হয়। তাতে ‘বি’ গ্রেড মিলেছে কৃষ্ণনাথ কলেজের।

ভাগীরথীর তীরে রানির দান করা ২১ বিঘা জমি জুড়ে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির আদলে গড়া হয় কলেজ ভবন। ঐতিহ্যের এই কলেজ আড়ে-বহরে বেড়েছে। পৃথক ভাবে প্রাতঃ ও দিবা বিভাগে ক্লাস হয়। বর্তমানে কলেজের ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা তিন হাজার।

কলেজে ১৫টি বিষয়ে সাম্মানিক স্নাতক এবং ৩টি বিষয়ে স্নাতকোত্তর পড়ানো হয়। যে সব বিষয়ে সাম্মানিক স্নাতক পড়ানো হয় তার মধ্যে রয়েছে ‘ট্রাভেল অ্যান্ড টুরিজম ম্যানেজমেন্ট’ এবং ‘সেরিকালচার’-এর  মতো পেশাকেন্দ্রিক কোর্সও। স্নাতকোত্তর পড়ানো হয় শারীরবিদ্যা, সেরিকালচার ও সংস্কৃতে।

এত বিষয় পড়ানো হলেও স্থায়ী শিক্ষক ৪৬ জন। আংশিক সময়ের শিক্ষক ১৫ জন। ১৪ জন অতিথি শিক্ষক। শিক্ষকদের শূন্যপদ ১০টি। কলেজের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব কুণ্ডু জানালেন, শিক্ষাকর্মীরও অভাব রয়েছে, ২৩টি পদ শূন্য। মাত্র ১৩ জনকে দিয়ে ৩৬ জনের কাজ করিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তা ছাড়া, পর্যাপ্ত পানীয় জল, এমনকী নিরাপত্তার অভাব রয়েছে বলেও জানালেন ছাত্রছাত্রীরা।

হয়তো অনেক কিছুই নেই, তা বলে ‘ক্যাম্পাস লাইফ’-এর মজায় ভাটা পড়েনি এতটুকু। আগে ছিল বিজয়দার ক্যান্টিন। এখন মিলনদার ক্যান্টিন। বিজয় সাহার ছেলে মিলন। সেখানে চায়ের সঙ্গে ‘গুটকি’-র  সঙ্গে টেবিল বাজিয়ে গান ও আড্ডার ট্র্যাডিশন সমানে চলছে। ক্লাস ‘অফ’ থাকলে আড্ডা জমে ইউনিয়ন রুমের সামনের মাঠে ও বকুলতলায়।  কলেজের প্রধান ফটকের সামনের মাঠেও শীতকালে আড্ডা জমে। কলেজের দেওয়াল-লাগোয়া ভাগীরথীর ধারে ঢালাই বেঞ্চও আছে। তবে  ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব কুণ্ডু বলেন, ‘‘গত বছর দুয়েকে তিন জন ছাত্র ডুবে মারা গিয়েছে। তাই ছাত্রছাত্রীরা যাতে ওখানে না বসে, সংগঠনের  তরফে তার নজরদারি চালানো হয়।’’

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন