• সুরবেক বিশ্বাস
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

বিষবৃক্ষ উপড়ে হাঁফ ছেড়েছেন গ্রামবাসী

Amanulla Sekh and Ali Hosen
মির্জাপুর গ্রামে এই জমিতেই ছিল মাদ্রাসাটি। ইনসেটে আমানুল্লা শেখ (উপরে), আলি হোসেন (নীচে)।

সেটা ছিল ঈদের ঠিক আগের দিন।

চার বছরের পুরনো স্মৃতির ঝাঁপি খুলতে বসলে গর্বে বুক ফুলে ওঠে এ তল্লাটের মানুষজনের। এক বাক্যে জানান, সে দিন তাঁরা পাঁচ-ছ’শো লোক মিলে লাঠিসোটা, কোদাল-শাবল নিয়ে গ্রামের ‘সন্দেহজনক’ মাদ্রাসাটিকে মাটির সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছিলেন। আরও অনেকে ওঁদের পাশে দাঁড়িয়ে উৎসাহ জুগিয়েছেন। ওঁদের মধ্যে ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা শহিদ মুন্সিও, যাঁর দান করা জমিতেই মাথা তুলেছিল ওই মাদ্রাসা।

নদিয়া জেলায় কালীগঞ্জের মির্জাপুর গ্রাম। হাজার সাতেক বাসিন্দার সকলেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের, যাঁদের অধিকাংশ কৃষিজীবী। ওঁদের এ হেন রোষের কারণ কী? কেনই বা মাদ্রাসা গুঁড়িয়ে দিয়ে ওঁরা এত খুশি?

কারণ একটাই। বাসিন্দাদের দাবি, বালিয়াড়াপাড়ার ওই বাড়িতে মাদ্রাসার নামে সন্দেহজনক কাজ-কারবার চলত। আদতে সেটি জেহাদি জঙ্গি প্রশিক্ষণের আঁতুড় হয়ে উঠেছিল বলেও ধারণা বাসা বাঁধে অনেকের মনে। কারিগরিশিক্ষায় ডিপ্লোমাপ্রাপ্ত মুখলেসুর রহমানের কথায়, “মাদ্রাসার আড়ালে ওরা আসলে এখানে খাগড়াগড়-শিমুলিয়ার মতো জঙ্গি ডেরা ফেঁঁদে বসার মতলবে ছিল।” নতুনপাড়ার কৃষক আলি হোসেনের বক্তব্য, “মাদ্রাসার জন্য দান করতে গেলেও ওরা নিত না। তা হলে চলছিল কী ভাবে? টাকার উৎসটাই ছিল সন্দেহজনক।” অবসরপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষক আমানুল্লা মুন্সি বলেন, “মনে হয়েছিল, এই জিনিস গ্রামে থাকলে বিপদ ঘনাবে।”

কাজেই ওঁরা দেরি করেননি। দল বেঁধে গিয়ে সমূলে উৎখাত করেছেন সন্দেহভাজন অশুভ শক্তির আস্তানাকে। আর মির্জাপুরের গ্রামবাসীর সন্দেহ যে অমূলক ছিল না, খাগড়াগড় কাণ্ড প্রকাশ্যে আসার পরে তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। কী রকম?

এ ক্ষেত্রে ‘সূত্রধর’ বলা যেতে পারে দু’জনকে মতিউর রহমান ও গিয়াসউদ্দিন মুন্সি। খাগড়াগড়-মামলায় অভিযুক্ত হিসেবে যারা কি না এনআইএ-র জালে ধরা পড়েছে গত ২৮ জানুয়ারি। মির্জাপুরের মানুষ জানিয়েছেন, পাঁচ বছর আগে এই গিয়াসউদ্দিন-মতিউরের তত্ত্বাবধানেই বালিয়াড়াপাড়ার আবাসিক শিশু মাদ্রাসাটির পত্তন। জায়গাটার এক কিলোমিটারের মধ্যে মতিউরের বাড়ি। সে দিন মাদ্রাসা ধূলিসাৎ করার পরে এক দল গ্রামবাসী মতিউরের বাড়িতে চড়াও হয়ে তাকে মারধরও করেন।

মুখলেসুর, আমানুল্লারা জানান, ওই ঘটনার পরেই মতিউর মির্জাপুর ছেড়ে মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় চলে যায়। চার বছর বাদে খাগড়াগড়-কাণ্ডে গিয়াসউদ্দিন-মতিউরের নাম উঠে আসায় মির্জাপুরবাসী এখন বলছেন, সে দিন তাঁরা ঠিক কাজই করেছিলেন। নচেৎ মির্জাপুরের পরিণতি বিলক্ষণ খাগড়াগড়ের মতো হতে পারত।

এনআইএ-সূত্রের বক্তব্যেও তাঁদের কথার সমর্থন মিলেছে। জানা যাচ্ছে, গিয়াসউদ্দিন-মতিউর জুটির জঙ্গি সংশ্রব যথেষ্ট জোরদার। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর কাছে উগ্রপন্থার তালিম নিয়েছে গিয়াসউদ্দিন। খাগড়াগড়-কাণ্ডে ফেরার অভিযুক্ত ইউসুফ গাজির সঙ্গে তার রীতিমতো ঘনিষ্ঠতা ছিল। মতিউরও কম যায় না। জেএমবি বেলডাঙায় ‘বোরখা ঘর’ নামে যে পোশাকের দোকানের আড়ালে বিস্ফোরক জোগানের ঘাঁটি বানায়, মতিউর ছিল সেখানকার ‘সর্ব ক্ষণের কর্মী’ (হোলটাইমার)।

এবং জেহাদি তালিমের কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য মির্জাপুরও ছিল জেএমবি’র বড় নিশানায়। “মঙ্গলকোটের শিমুলিয়া নয়। বরং লালগোলার মকিমনগরের পরে মির্জাপুরের ওই মাদ্রাসাতেই জেহাদি প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও অস্ত্র কারখানা চালু করার মতলব ফাঁদে ওরা।” বলছেন এনআইএ-র এক অফিসার।

কেন মির্জাপুর?

এ ক্ষেত্রে গ্রামটির ‘অবস্থানগত সুবিধা’ চক্রীদের মাথায় ছিল বলে গোয়েন্দাদের দাবি। সড়কপথে বেলডাঙা থেকে দূরত্ব সাকুল্যে ৩০ কিলোমিটার। এক দিকে পলাশি, অন্য দিকে দেবগ্রাম। আর বালিয়াড়াপাড়ার মাদ্রাসাটি গজিয়ে ওঠে গ্রামের একেবারে প্রান্তে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক থেকে পুবে সাড়ে চার কিলোমিটার ভিতরে। লম্বাটে প্রায় তিন কাঠা জায়গা জুড়ে। চার পাশে শুধু ফসলের মাঠ, বসতবাড়ি অনেকটা দূরে। এক এনআইএ অফিসারের কথায়, “বালিয়াড়াপাড়ার মাদ্রাসাটি ছিল গ্রামের একেবারে প্রান্তে, নিরালা জায়গায়। ওখানে কী হচ্ছে, চট করে টের পাওয়া যেত না। এটাই ছিল সবচেয়ে বড় সুবিধা।”

সঙ্গে ঢিলেঢালা পুলিশি নজরদারির বাড়তি সুযোগ। সব মওকা কাজে লাগানোর প্রস্তুতিও সেরে ফেলা হয়। শেষমেশ বাদ সাধে গ্রামবাসীর সন্দেহ। গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, দরমার বেড়ার উপরে করোগেটের ছাউনি দেওয়া মাদ্রাসার দু’টো বড় ঘর লাগোয়া ছিল রান্নাঘর, শৌচাগার। বড় ঘরে দিনে পড়াশোনা হত, রাতে ঘুমোত সাত থেকে দশ বছরের ৭০-৮০ জন পড়ুয়া ও জনা চারেক শিক্ষক। পড়ুয়ারা প্রায় সকলেই বাইরের, শিক্ষকেরাও। “সব কিছু চলত কেমন চুপিসাড়ে। রাতের আঁধারে বাইরের আরও লোকজন আসত।” বলেন আলি হোসেন।

ভাঙচুরের সময়ে মাদ্রাসার পড়ুয়া-শিক্ষকেরা অবশ্য ঈদের ছুটিতে ছিলেন। জায়গাটা এখন বেবাক ফাঁকা। আলি হোসেনের সগর্ব ঘোষণা, “ওদের আর একটা খাগড়াগড় বানাতে দিইনি।”

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন