যান নিয়ন্ত্রণ জরুরি

শ্রীচৈতন্যদেবের জন্মস্থান শ্রীধাম নবদ্বীপ এখন এক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পর্যটন কেন্দ্র। বিশ্বের সমস্ত প্রান্ত থেকে চৈতন্য অনুরাগীরা সারা বছর কমবেশি এ শহরে আসেন। শহরের চারদিকে ছড়িয়ে থাকা চৈতন্যস্মৃতি বিজড়িত স্থানগুলিতে তাঁরা নিয়মিত যাতায়াত করেন। একদা তাঁত, কাঁসা-পিতল ও শঙ্খশিল্পের জন্য প্রসিদ্ধ নবদ্বীপের মৃতপ্রায় অর্থনীতিতে ওই সব দেশি বিদেশি পর্যটকদের যাতায়াত  নতুন ভাবে প্রাণের সঞ্চার করেছে।

অন্য দিকে, প্রাচীন শহর নবদ্বীপে বিগত কয়েক বছর ধরে অকল্পনীয় ভাবে চাপ বাড়ছে মানুষ এবং যানবাহনের। নবদ্বীপ পুর এলাকা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী বর্ধমানের অনেকগুলি পঞ্চায়েতের মানুষ সব বিষয়ে নবদ্বীপ শহরের উপর নির্ভরশীল। ফলে প্রতিদিন এ শহরে স্থানীয় বাসিন্দা ছাড়াও লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটে। সেই সঙ্গে নানা ধরনের যানবাহনের ভিড়ে শহরের নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়। রিকশা, ট্রলি, মোটরবাইক, মোটর লাগানো ট্রলি আগেই ছিল। সম্প্রতি তাঁর সঙ্গে যোগ হয়েছে টোটো। মাত্র একবছরে নবদ্বীপের পথে নেমেছে প্রায় সাতশো টোটো। সব মিলিয়ে পর্যটন কেন্দ্র নবদ্বীপ কার্যত দিনভর যানজটে অবরুদ্ধ হয়ে থাকছে। পুরনো শহরের সংকীর্ণ রাস্তা চওড়া করার কোনও সুযোগ নেই। কিন্তু যেটা আছে, তা হল আধুনিক পদ্ধতিতে যান নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ করা।

এই শহরে প্রতিদিন চলাফেরা করার সুবাদে আমার মনে হয় ১) সবার আগে প্রয়োজন শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে নাম কা ওয়াস্তে সিভিক পুলিশ দাঁড় না করিয়ে তার বদলে দক্ষ ট্রাফিক পুলিশ নিয়োগ করা। ২) শহরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাকে একমুখী করা প্রয়োজন। যেমন বিষ্ণুপ্রিয়া হল্ট স্টেশন থেকে হরিসভা পাড়া রোড ধরে এসে যানবাহন আগমেশ্বরী পাড়া দিয়ে ঘুরিয়ে দিতে হবে। কিছু যানবাহন নবদ্বীপ ধাম স্টেশন থেকে রাধাবাজার পর্যন্ত এসে মতি রায় বাঁধ হয়ে বাজার রোড দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পোড়ামা তলা থেকে বিষ্ণুপ্রিয়া হল্ট যাওয়ার জন্য হরিসভা মোড় হয়ে পশ্চিমমুখী রাস্তাটি কেবলমাত্র যাওয়ার জন্য ব্যবহার করা হোক। পোড়ামা তলা থেকে দণ্ডপানি তলা হয়ে নবদ্বীপ স্টেশন যাওয়ার রাস্তাটি অবিলম্বে একমুখী করার কথা পুরকর্তারা ভাবুন। ৩) শহরের যত্রতত্র টোটো এবং রিকশা দাঁড়ানো নিষিদ্ধ করা হোক। ৪) বিরাট জনসংখ্যার শহর নবদ্বীপে একটি সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালের একান্ত প্রয়োজন। ৫) নবদ্বীপ শহরের আর্সেনিক মুক্ত পরিস্রুত জল সরবরাহের জন্য জল প্রকল্পের প্রয়োজন।

প্রশাসনিক ভাবে নবদ্বীপকে সাব ডিভিশন শহরের মর্যাদায় উন্নীত করা দরকার। সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করতে হবে। প্রয়োজন আরও একটি থানা নবদ্বীপের সঙ্গে যুক্ত করার। তাহলে সাব ডিভিশন শহর গড়ার লক্ষে ৯০ শতাংশ এগিয়ে যাওয়া যাবে। ভৌগলিক কারনেই মায়াপুর, বামুনপুকুর, সোনডাঙা প্রভৃতি এলাকা নিয়ে একটি এবং জোয়ানিয়া, ভালুকা, বাগআঁচড়া এবং শান্তিপুরের কিছু অংশ নিয়ে পৃথক থানা করাই যায়। তাহলে নবদ্বীপে সাব জজ আদালত, এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট হওয়া সহজ হবে। মামলার প্রয়োজনে কথায় কথায় নদী পার হয়ে কৃষ্ণনগর ছুটতে হবে না।

দিলীপ চট্টোপাধ্যায়, আইনজীবী, নবদ্বীপ আদালত।

 

কীর্তনের জন্য শিক্ষাকেন্দ্র

নবদ্বীপের মাটি, ভক্তিরসে খাঁটি। ভক্তির কোনও জাত-ধর্ম হয় না। মহাত্মা লালনও বলেছেন, “ভক্তির দ্বারে বাঁধা আছেন সাঁই।” শ্রীচৈতন্যদেব ভক্তির দড়ি দিয়ে ভগবানকে বাঁধতে গিয়ে মানুষকে বেঁধে ফেলেছিলেন। তাঁর কাছে ভগবান আর মানুষ অভিন্ন সত্ত্বা। তাই তাঁর ঘোষণা ছিল, “জীবে সম্মান দিবে জানি কৃষ্ণ অধিষ্ঠান।” কোনও সিংহাসনে আরোহণ না করে, রাষ্ট্রীয় শাসনকে কাজে না লাগিয়ে কেবল প্রেমভক্তি দিয়ে একটা বিছিন্ন মৃতপ্রায় জাতিকে পুনরুজ্জীবিত করার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তিনি ইতিহাস খ্যাত মহামানব। প্রখর ধীশক্তি আর সীমাহীন দূরদৃষ্টি বাংলার ভক্তি আন্দোলনকে সুদুরপ্রসারী করেছিল। গান দিয়ে তিনি মানুষের হৃদয়ের বন্ধ কপাট খুলতে চেয়েছিলেন। সেই দ্বার খোলানো গানের নাম কীর্তন। যে কোনও জাতির সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের সঙ্গে সেই জাতির সঙ্গীতের যোগ নিবিড়।    কীর্তন হল বাঙালির জাতীয় সঙ্গীত। শ্রী চৈতন্যদেব হলেন এই কীর্তনের পিতা– ‘সংকীর্ত্তনৈকপিতরৌ’।

অনেকে কীর্তনকে লোকসঙ্গীতের পর্যায়ভুক্ত করে অথবা ধর্মীয় সঙ্গীতের অভিধা দিয়ে তাঁর মাহাত্ম্যকে লঘু করতে চান। আসলে সংগীতের উৎস-ধর্ম অপেক্ষা সঞ্চারী-ধর্ম শ্রেষ্ঠতর। বৌদ্ধ সাধনতত্ত্ব বিষয়ক চর্যাগান ধর্মের তিলক কপালে পরেও সর্বকালের, সর্বমানুষের। তেমনই কীর্তনও শুধু বৈষ্ণবের তরে বৈকুন্ঠের গান নয়। এই গানের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাঙালির সঙ্গীত ধারার গঙ্গোত্রী প্রবাহ। এই গানের হৃদয় সঞ্চারী মাধুর্যে একদিন আত্মবিস্মৃত বাঙালি উত্তরণের পথ খুঁজে পেয়েছিল। গান দিয়ে যে জগত মাতানো যায় তা প্রমাণ করেছিলেন শ্রীচৈতন্য।

বৈষ্ণবধাম নবদ্বীপেই আজ কীর্তন গান উপেক্ষিত। আজও এখানে গড়ে ওঠেনি কীর্তনের কোনও স্কুল। যে অর্থে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ধ্রুপদী ঘরানার আদর্শকে সামনে রেখে বিশ্বভারতীতে সঙ্গীতভবন গড়ে উঠেছে, সেই অর্থে নবদ্বীপে কীর্তন সঙ্গীতের কোনও শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। ফলে এই গান নানা জনের হাতে পড়ে তার ধ্রুপদী চরিত্র হারাতে বসেছে। ইচ্ছেমতো সুর, তাল সংযোজনা, মূল কথাবস্তুর বিকৃতি এবং উচ্চারণ বিভ্রাট কীর্তনকে আটপৌরে লোকগানে রূপান্তরিত করেছে। নবদ্বীপ পুরসভা আমাদের উন্নত নাগরিক পরিষেবা দিয়েছে বা দেবে। কিন্তু বাহ্যিক চাকচিক্যই একটা শহরের সামগ্রিক পরিচয়কে তুলে ধরে না। শহরের অন্তরঙ্গ পরিচয় নির্ভর করে তার প্রাচীন ইতিহাস ও সংস্কৃতির রক্ষণাবেক্ষণের উপর। বাঙালি জাতির সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের অম্লান স্মারক কীর্তনকে বাঁচানোর জন্য নবদ্বীপে সরকারি উদ্যোগে এবং পুরসভার সহযোগিতায় কি একটি কীর্তন শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে উঠতে পারে না? নবদ্বীপের বাসিন্দা, সর্বোপরি বাঙালি হিসাবে এটা কি খুব বড় চাওয়া?

সিরাজুল ইসলাম, রামসীতা পাড়া, নবদ্বীপ

 

দরকার শৌচাগার

আনন্দবাজার পত্রিকার নদিয়া-মুর্শিদাবাদ বিভাগে প্রকাশিত ‘ঘাটে অব্যবস্থা’ নিয়ে প্রতিবেদনটি পড়লাম। একেবারে সঠিক চিত্র তুলে ধরেছেন প্রতিবেদক। নবদ্বীপের স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে দীর্ঘ প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে রানির ঘাটে গঙ্গায় আমি স্নান করতে আসি। গঙ্গা এবং ঘাটের রূপ বদলাতে দেখেছি আমার চোখের সামনেই। কিন্তু বেশ কয়েক বছর ধরে স্নানের ঘাটের চরম অব্যবস্থা আমাকে ভীষণ কষ্ট দেয়। গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর মহিমান্বিত নবদ্বীপ ধামের পবিত্র গঙ্গায় পুণ্যস্নানের আশায় দূরদুরান্ত থেকে কত মানুষ প্রতিনিয়ত আসেন নবদ্বীপে। তাঁদের সমস্যা এবং অসহায়তা আমি নিজেও অনুভব করি।

ঘাটে শৌচাগার নামক একটি বড় ঘর থাকলেও সেটি ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে। ঘাটে পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই। স্নানের পরে পোশাক বদলের দুর্দশার কথা তো প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে। গঙ্গার ঘাট জঞ্জালময়। স্থানীয় ছেলেরা মাঝে মধ্যে নিজেরাই কিছু কিছু পরিষ্কার করে, কিন্তু পুর-প্রশাসন এই বিষয়ে নজর না দেওয়ায় মূল সমস্যা যে তিমিরে সেই তিমিরেই থেকে যায়। ঘাটের সিঁড়িগুলোর অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে, আমাদের মতো বয়স্ক মানুষের ওঠানামা বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। গঙ্গার মতো পুণ্যতোয়া নদীকে পবিত্র ও দূষণমুক্ত রাখা নিয়ে আলোচনা এবং প্রচারের বাহুল্য থাকলেও অধিকাংশ মানুষ সে বিষয়ে এখনও সচেতন নন। বাড়ির জঞ্জাল, পুজোর ফুল-পাতা, প্রতিমা সবই ফেলে দেওয়া হয় গঙ্গার বুকে। উৎসব শেষে বর্জ্য পদার্থে গঙ্গার জল যেমন দূষিত হয়, তেমনি জলে ফেলে দেওয়া কাঠামোর বাঁশে, পেরেকে জখম হন স্নান করতে আসা লোকজন।

প্রশাসনের নাকের ডগায় শহরের নিকাশি নালার নোংরা জল সরাসরি এসে মেশে গঙ্গায়। গঙ্গার এই দূষিত জলেই আমরা স্নান করি, পুজোয় ব্যবহার করি এমনকী পানও করি। সব সমস্যার সমাধান একসঙ্গে সম্ভব নয়। কিন্তু স্নান করতে আসা লোকজনের জন্য স্থানীয় পুরসভা যদি ন্যূনতম পরিষেবাটুকুর ব্যবস্থা করে তাহলে সারা বছর ধরে বাইরে থেকে আসা পর্যটক এবং নবদ্বীপবাসী উভয়েই উপকৃত হবেন। বৃদ্ধি পাবে শহরের সুনামও। জীবনের উপান্তে এসে পুরপ্রশাসনের কাছে সামান্য দাবী– নবদ্বীপের ঘাটে ঘাটে নির্মিত হোক শৌচাগার, পোশাক পরিবর্তনের ঘর। পাশাপাশি পানীয় জল, পর্যাপ্ত আলো এবং সার্বিক পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা করা হোক।

সর্বাণী রায়, আগমেশ্বরী পাড়া, নবদ্বীপ  

 

শিশুদের খেলার মাঠ চাই

নবদ্বীপ শহরে পাড়ায় পাড়ায় যেটুকু ফাঁকা জায়গা ছিল, সে সব ক্রমশ বাড়ি-ঘরে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের হাত-পা মেলার জায়গা কমে আসছে। ঘর বন্দি হয়ে পড়ছে শিশুরা। নবদ্বীপ শহরে সখের ‘আনন্দকানন’ তৈরি হল বটে, কিন্তু শিশুরা সেখানে গেলে তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাবে!

শহরে বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বেশ কয়েকটি শিশু উদ্যান একটু একটু করে শূন্য ময়দানে পরিণত হয়ে উঠছে। আর অপেক্ষা করে আছে কবে সেখানে প্রমোটারদের হাত ধরে ফ্ল্যাট উঠবে। কোথাও কোথাও ইতিমধ্যেই বাড়ি-ঘর উঠেও গিয়েছে। এমন এক শহরে শিশুদের ঘর-বন্দী হয়ে থাকাটাই তো স্বাভাবিক! এর দায় কিন্তু আমরা যারা এ শহরে বাস করছি, তাদের সবাইকে নিতে হবে। কি বাড়ির অভিভাবক, কি শহরের অভিভাবক। কিন্তু এ শহরে কে কার আর দায়িত্ব নেয়!

 একে তো শহরের ঐতিহ্যময় স্থাপত্য অবলীলাক্রমে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে ভেঙে ফেলা হচ্ছে। জলাশয় ভরাট করে বহুতল নির্মাণই নাকি শহরের উন্নয়ন। এমন উন্নয়নের হাত থেকে প্রকৃত উন্নয়নের হাতে কি আমরা এই শহরকে তুলে দিতে পারি না?

নবেন্দু সাহা, বেসরকারি সংস্থার কর্মী পাঁচমাথা, নবদ্বীপ