বছর কয়েকের বিরতির পরে মুর্শিদাবাদে হনন-আত্মহননের চেনা ছবি ফের 

ফিরে আসছে। 

একদা কংগ্রেস এখন তৃণমূল কিংবা পুরনো বামপন্থী নেতাদের চোখে জেলার এই পরিবর্তনটা ধরা পড়তে শুরু করেছে। 

কথা কাটাকাটি থেকে হাতাহাতি হলে বছর দশেক আগেও রক্ত ঝরত, তবে সে সময়ে পকেট থেকে বেরিয়ে আসত ক্ষুর-ছুরি। এখন সরাসরি রিভলভার-ওয়ানশটার। অস্ত্রের এই অনায়াস ব্যবহার দেখে জেলা তৃণমূলের এক তাবড় 

২০১৮

• বেআইনি অস্ত্র উদ্ধার ৩৮৮টি
• গুলি উদ্ধার  ৮৪৫ রাউন্ড 

২০১৯ 

• ৪৩১টি আগ্নেয়াস্ত্র 
• ৯৩৯ রাউন্ড গুলি

(১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত)

নেতা স্বীকার করে নিচ্ছেন, ‘‘সীমান্ত পেরিয়ে বারুদ-গুলির আনাগোনা বড্ড বেড়ে গিয়েছে, এখন আর আমাদেরও নিয়ন্ত্রণ নেই!’’

পুলিশের কপালে ভাঁজ পড়েছে ঠিকই, তবে তা বন্ধ করার জন্য এখনও উপরতলার দিকেই তাকিয়ে আছেন তাঁরা। জেলা পুলিশের এক শীর্ষ কর্তা কোনও রাখঢাক না রেখেই কবুল করছেন, ‘‘অনেক ক্ষেত্রেই হাত-পা যে বাঁধা আমাদের!’’

এক সময়, এক বাড়ির মুরগি ও  বাড়ি দাওয়ায় উঠলে, এ পাড়ার ছাগল ও পাড়ায় গিয়ে তুলসী মঞ্চে মুখ দিলে বিবাদ গড়াত খুনোখুনিতে। থিতিয়ে আসা সেই আক্রোশের সময় বুঝি আবার ফিরছে। এবং ছুরি-ছোরা-কাতানের হাত ধরে নয়, সরাসরি গুলি-বন্দুকে।

জেলা কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক মহফুজ আলম ডালিম আঙুল তুলছেন পুলিশের দিকে, ‘‘যারা এই বারুদ-বন্দুক ঠেকাতে পারত সেই পুলিশ এখন শাসকদলের তাঁবেদারি করছে। মানুষের হাতে হাতে ঘুরছে আগ্নেয়াস্ত্র।’’ জেলা তৃণমূলের এক নেতাও বলছেন, ‘‘কথায় কথায় আগ্নেয়াস্ত্র বের করা খুবই উদ্বেগের।’’ তবে, মুর্শিদাবাদের পুলিশ সুপার মুকেশ কুমার ভরসা দেওয়ার গলায় শুনিয়ে দিচ্ছেন, ‘‘দেখছেন তো, চেষ্টার কোনও ত্রুটি নেই, আমরাও লাগাতার বেআইনি অস্ত্র উদ্ধার করছি তো।’’  পুলিশের দাবি, ২০১৮ সালে জেলায় ৩৮৮ টি বেআইনি অস্ত্র, ৮৪৫ রাউন্ড গুলি উদ্ধার হয়েছিল। চলতি বছরে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলায় সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে— ৪৩১টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৯৩৯ রাউন্ড গুলি।

লোকসভা নির্বাচন শেষ। এখন ভোটের তাপ-উত্তাপ নেই। তা সত্ত্বেও জেলার ডোমকল, বহরমপুর, নওদা, হরিহরপাড়া, কান্দি— প্রায় সর্বত্র ক্রমাগত বাড়ছে খুন জখমের ঘটনা।

এ বছর ২৫ ফেব্রুয়ারি বহরমপুরের নিয়াল্লিশপাড়ায় যুব তৃণমূল নেতা নাজিমুল শেখ দুষ্কৃতীদের গুলিতে খুন হন। গত ১৮ মার্চ ডোমকলের কুচিয়ামোড়ায় খুন হন পঞ্চায়েত সমিতির কর্মাধ্যক্ষ আলতাফ হোসেন। সেই ঘটনায় অবশ্য ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল। গত ৩ জুন নওদা গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধানের স্বামী দুষ্কৃতীদের ছোড়া গুলিতে জখম হন। ১৫ জুন ডোমকলের কুচিয়ামোড়ায় গুলি বোমার ঘায়ে তিন তৃণমূল কর্মীর মৃত্যু হয়। ১২ জুলাই হরিহরপাড়ার হুমাইপুর পঞ্চায়েতের তৃণমূলের পর্যবেক্ষক সফিউল হাসান গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। ৫ অগস্ট কান্দির গোসাইডোব গ্রামে কান্দি পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য গুলিবিদ্ধ হয়ে খুন হন। ৯ সেপ্টেম্বর নওদার বালি-১ অঞ্চল তৃণমূলের সভাপতি নিমাই মণ্ডলকে দুষ্কৃতীরা গুলি করে খুন করেছে। ১৫ সেপ্টেম্বর রাতেও কান্দির হিজলের বেনিপুরে এক কিশোর গুলিবিদ্ধ হয়ে জখম হয়েছে। 

এ যদি রাজনৈতিক হানাহানির নিদর্শন হয়, পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে দু’পাড়ার বিবাদ কিংবা ব্যক্তিগত রেষারেষির ঘটনাতেও অস্ত্রের ব্যবহারের ঘটনা কম নয়।

১৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় দৌলতাবাদের পাগলাটিকর গ্রামে নিছক দু’বাড়ির ঝামেলায় বোমার আঘাতে জখম হয়েছে এক গ্রামবাসী। ১৭ সেপ্টেম্বর ভোররাতে বহরমপুরের ভাকুড়িতে তরুণ হালদার নামে এক চা দোকানি আততায়ীর গুলিতে খুন হন। দু’দিন যেতেই, ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে বহরমপুরের গোবিন্দপুরে দুষ্কৃতীদের গুলিতে জখম হন এক যুবক।

জেলা সিপিএমের এক নেতা বলছেন, ‘‘কী করবেন বলুন, 

পুলিশকে পুলিশ হয়ে উঠতে না দিলে, এমন তো হবেই!’’