‘বৈপ্লবিক বাড়ি’ সংস্কার করতে গিয়ে বিতর্কের মুখে পড়ল পরিবার। প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে বন্ধ হয়ে গেল কাজও।

বাঁকুড়া শহরের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের কালীতলা এলাকায় বাঁকুড়া গার্লস স্কুল সংলগ্ন প্রাচীন একটি বাড়িতে এক সময় বিপ্লবীদের আস্তানা ছিল। জেলার ইতিহাস নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন, তাঁরা জানাচ্ছেন, ওই বাড়ির অন্যতম মালিক ধরণীধর মুখোপাধ্যায় নিজে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। সেই সূত্রেই বাংলার অনুশীলন সমিতির বহু বিপ্লবীর আনাগোনা ছিল এই বাড়িতে। বিপ্লবীরা বৃটিশ পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে গা ঢাকা দিয়ে দিনের পর দিন এই বাড়িটিতে থাকতেন। বাড়ির ভিতরেই রয়েছে একটি গুপ্ত কক্ষ। সেখানে রাখা থাকত বিপ্লবীদের আগ্নেয়াস্ত্র।

পরিবারের সদস্যেরা জানাচ্ছেন, বৃটিশ আমলে পুলিশের কড়া নজর থাকত বাড়িটির উপর। বার ছয়েক বিপ্লবীদের খোঁজে ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়েছিল পুলিশ। বাড়ির পিছনে একটি পুকুর রয়েছে। পুলিশ আসছে টের পেলেই আগ্নেয়াস্ত্র ওই পুকুরের জলে ফেলে লুকিয়ে দেওয়া হতো। দীর্ঘ দিন ধরেই ব্যবহার না হওয়ায় কড়িকাঠ ও চুন সুরকির বাড়িটির বেহাল হয়ে পড়েছে। বাড়ির বর্তমান মালিক, ধরণীধরবাবুর ছেলে আশিস মুখোপাধ্যায় এবং তাঁর স্ত্রী দুলালিদেবী বলেন, “কার্যত পরিত্যক্ত হয়ে বাড়িটি পড়ে থাকায় সমাজ বিরোধীদের আস্তানা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। কবে কী ঘটে যায়, সেটা ভেবেই আমরা বাড়ি সংস্কার শুরু করি।” তাঁদের দাবি, বর্তমানে বাড়ির যে অংশটি সংস্কার করা হচ্ছে সেটি আদপে বিপ্লবীর বাড়ির অংশও নয়।

এ দিকে, ওই প্রাচীন বাড়ি সংস্কার করার কাজ হচ্ছে দেখেই শোরগোল পড়ে গিয়েছে বাঁকুড়া শহরে। ১২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের একাংশ এবং বেশ কিছু সাংস্কৃতিক সংগঠন ওই বাড়ি সংস্কারের বিরোধিতায় নেমেছেন। বাঁকুড়ার নিদর্শন সাহিত্য পত্রিকা গোষ্ঠীর তরফে ওই বাড়ির সংস্কার বন্ধ করার জন্য বাঁকুড়া সদর মহকুমাশাসকের দফতরে লিখিত ভাবে দাবি জানানো হয়। ওই পত্রিকা গোষ্ঠীর সম্পাদক বিপ্লব বরাট বলেন, “বিপ্লবী বাড়িটি আমাদের শহরের ঐতিহ্য। অনেকেই ইতিহাসের টানে বাড়িটি দেখতে ছুটে আসেন।’’ তাঁদের আশঙ্কা, যথাযথ সতর্কতা ও পদ্ধতি মেনে কাজ না হলে ঐতিহাসিক বিভিন্ন নিদর্শনের ক্ষতি হতে পারে। বিপ্লববাবু বলেন, ‘‘প্রশাসনের উচিত বাড়িটি সংরক্ষণ করা।”

বাড়ি সংস্কার নিয়ে বিতর্ক শুরু হতেই ওই পরিবারকে আপাতত কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন মহকুমাশাসক (বাঁকুড়া সদর) অসীমকুমার বালা। তিনি বলেন, “আপাতত ওই পরিবারকে বাড়ি সংস্কারের কাজ বন্ধ রাখতে বলেছি। বাড়িটি নিয়ে বিস্তারিত খোঁজ খবর নিচ্ছি।” বাড়ির মালিক আশিসবাবু বলেন, “মহকুমা শাসকের কাছ থেকে লিখিত কোনও নির্দেশ না পেলেও কিছু পুলিশ কর্মী এসে আমাদের কাজ বন্ধ রাখতে বলেছেন। এই নির্দেশের জেরে আমরা সমস্যায় পড়েছি।” আশিসবাবুর প্রশ্ন, “বাড়িটি ভেঙে পড়ছে। বিপ্লবী স্মৃতি বিজড়িত ওই বাড়িটিকে কেন্দ্র করে মদের ঠেক বসছে। সেই বেলা প্রশাসন কেন কোনও পদক্ষেপ করছে না?”

অশিসবাবু দাবি করেছেন, তাঁরা অনেক বার বাড়িটিকে হেরিটেজ ঘোষণা করার দাবি তুলেছিলেন। কিন্তু প্রশাসন এগিয়ে আসেনি। তিনি বলেন, ‘‘এখন নিজেরা যখন বাড়িটিকে সংস্কার করতে উদ্যোগী হয়েছি, তখন কেন আপত্তি উঠছে ভেবে অবাক হচ্ছি!” স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি তুলেছেন, প্রাচীন ওই বাড়িটি প্রশাসন অধিগ্রহণ করে বিপ্লবীদের স্মৃতি রক্ষা করুক।

এ নিয়ে কি ভাবছে প্রশাসন?

মহকুমা শাসক বলেন, “ওই বাড়িটি নিয়ে যাবতীয় তথ্য জোগাড় করে যা ব্যবস্থা নেওয়ার নেব।”