জোড়া বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সরগরম হয়ে উঠল বাঁকুড়া পুরসভা। মঙ্গলবার দুপুরে বাঁকুড়া শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডের মানুষজন সরকারি প্রকল্পে বাড়ি না পাওয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভ দেখান পুরসভায়। তার পরেই জেলা বামফ্রন্ট ‘সকলের জন্য বাড়ি’ (হাউজিং ফর অল) প্রকল্পে তালিকাভুক্ত সমস্ত মানুষকে বাড়ি তৈরি করে দেওয়া-সহ একুশ দফা দাবি তুলে মাচানতলা মোড়ে বিক্ষোভ সভা করে স্মারকলিপি দিল পুরসভায়। দীর্ঘদিন পরে পুরসভায় রাজনৈতিক কর্মসূচি দেখল বাঁকুড়া।

সামনের বছরেই পুরসভায় পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হচ্ছে তৃণমূলের। শহরে বেশ কিছু সমস্যা নিয়ে বিরোধীরা মৌখিক ভাবে ক্ষোভ দেখালেও গত কয়েক বছরে তাদের পুরসভায় স্মারকলিপি দিতে দেখা যায়নি। জেলা রাজনীতির ওঠাপড়ার নিয়মিত পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী বছর পুরভোটের সম্ভাবনা রয়েছে মনে করে এ বার আসরে নামতে চাইছেন বিরোধীরা। 

এ দিন শহরের ১৯, ২৩ ও ২২ নম্বর ওয়ার্ড-সহ আরও কয়েকটি ওয়ার্ডের বাসিন্দারা পুরভবনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখান। তাঁদের অভিযোগ, সকলের জন্য বাড়ি প্রকল্পে প্রকৃত গরিব মানুষদের বঞ্চিত করা হয়েছে। উল্টে যাঁদের পাকা বাড়ি রয়েছে, তেমন কয়েকটি পরিবারকেও সরকারি প্রকল্পে বাড়ি তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ বিক্ষোভকারীদের। তাঁদের মধ্যে কেঠারডাঙার বাসিন্দা মর্জিনা বিবি অভিযোগ করেন, “এই বর্ষায় ত্রিপল খাটিয়ে কোনও রকমে মাথা গুঁজে রয়েছি। যাঁদের পাকা বাড়ি আছে, তাঁরা ঘর পাচ্ছেন, আর আমাদের দেওয়া হচ্ছে না!’’ 

‘বাঁকুড়া পৌর নাগরিক ফোরাম’ নামে একটি সংগঠনের তরফে এই বিক্ষোভ সংগঠিত করা হয়েছিল। ওই সংগঠনের সম্পাদক শেখ রানা বলেন, “অরাজনৈতিক ভাবেই সমাজের সব শ্রেণির মানুষ আন্দোলনে নেমেছি। কেবল সরকারি গৃহনির্মাণ প্রকল্পই নয়, শৌচালয় নির্মাণের ‘মিশন নির্মল বাংলা প্রকল্প’-তেও প্রকৃত উপভোক্তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। আমরা চাই, এ নিয়ে প্রশাসন যথাযথ তদন্ত করুক।” পুরসভায় বিক্ষোভের খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে বিক্ষোভকারীদের সামাল দেয়। 

ওই বিক্ষোভ শেষ হওয়ার ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই জেলা বামফ্রন্টের তরফে বাঁকুড়া শহরে মিছিল করে মাচানতলায় বিক্ষোভ-সভা করা হয় পুরসভার বিরুদ্ধে। উপস্থিত ছিলেন সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অমিয় পাত্র, সিপিএমের জেলা সম্পাদক অজিত পতি-সহ বামফ্রন্টের বিভিন্ন শরিক দলের সম্পাদক ও নেতৃত্ব। 

বামফ্রন্টের তরফে অভিযোগ তোলা হয়, কাউন্সিলরদের অন্ধকারে রেখেই বিভিন্ন ওয়ার্ডে কাজ করা হচ্ছে। শহরের বস্তিতে শৌচালয় নির্মাণ করা হয়নি। ‘গ্রিন সিটি’ প্রকল্পের নাম করে সরকারি কাজের টাকা তছরুপ করা হচ্ছে। এ ছাড়া, ‘হাউজিং ফর অল’ প্রকল্পের সমস্ত উপভোক্তাদের গৃহ নির্মাণ করা, গৃহপ্রকল্পের উপভোক্তাদের কাছ থেকে ‘কাটমানি’ হিসেবে নেওয়া টাকা ফেরত দেওয়া ও বাঁকুড়া শহরকে প্লাস্টিক-মুক্ত শহর হিসেবে গড়ে তোলার দাবিও তোলা হয়েছে। 

অমিয়বাবুর অভিযোগ, “বিভিন্ন ওয়ার্ডে সরকারি প্রকল্পের উপভোক্তা নির্ণয় করতে গিয়ে কাউন্সিলর বা ওয়ার্ড কমিটির সঙ্গে কোনও রকম আলোচনাই করা হচ্ছে না। পুরপ্রধান নিজের মতো করেই উপভোক্তা ঠিক করছেন। এই ঘটনার জন্য বহু যোগ্য উপভোক্তার নামই সরকারি সুবিধা পাওয়ার তালিকা থেকে বাদ যাচ্ছে।”

বাঁকুড়ার পুরপ্রধান মহাপ্রসাদ সেনগুপ্ত অবশ্য পুরসভার বিরুদ্ধে ওঠা যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, “বামফ্রন্টের তরফে যে দাবি বা অভিযোগগুলি তোলা হয়েছে, তার একটিও যুক্তিযুক্ত নয়। সরকারি প্রকল্পের উপভোক্তা তালিকায় যাঁদের নাম থাকে, তাঁদেরই সুবিধা দেওয়া হয়। তালিকার বাইরে গিয়ে কাজ করা যায় না। পুরভোটকে সামনে রেখে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই বামেরা এই কর্মসূচি করেছেন।” 
বিভিন্ন ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের গৃহ নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে যে অভিযোগ করা হয়েছে, তা নিয়ে পুরপ্রধানের আশ্বাস, “হাউজিং ফর অল প্রকল্পের কাজ ২০২২ সাল পর্যন্ত চলবে। যাঁরা এখনও বাড়ি পাননি, উপভোক্তা তালিকায় নাম থাকলে ওই সময়সীমার মধ্যে অবশ্যই পেয়ে যাবেন।” তিনি যুক্ত করেন, “কিছু মানুষের দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির মানুষ তাঁদের ভুল বুঝিয়ে পুরসভার বিরুদ্ধে তাঁদের সংগঠিত করার চেষ্টা করছেন। বেনিয়মের উদাহরণ তাঁরা দিতে পারেননি।”