ভিক্ষাজীবী ভিক্ষার পথটি বাছিয়া লন প্রয়োজনের তাগিদে, ইচ্ছাকৃত ভাবে নয়। তিনি ভিক্ষা করেন, কারণ ইহাই তাঁহার কাছে বাঁচিয়া থাকিবার শেষ উপায়। তিনি ভিক্ষা করেন, কারণ রাষ্ট্র তাহার সমস্ত নাগরিকের জন্য বাঁচিয়া থাকিবার ন্যূনতম অধিকারগুলি, অর্থাৎ খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের পর্যাপ্ত বন্দোবস্ত করিতে পারে নাই।— এই পর্যবেক্ষণটি দিল্লি হাইকোর্টের, দুইটি জনস্বার্থ মামলার প্রেক্ষিতে। এত কাল রাজধানীতে ভিক্ষাবৃত্তি আইনত ‘অপরাধ’ বলিয়া পরিগণিত হইত। জনস্বার্থ মামলা দুইটি ইহারই বিরুদ্ধে। মূল উদ্দেশ্য, নয়াদিল্লিতে ভিক্ষাবৃত্তির গা হইতে ‘অপরাধ’-এর তকমা মুছিয়া দেওয়া এবং ভিক্ষুকদের ন্যূনতম মানবিক ও মৌলিক অধিকারগুলি রক্ষা করা। এই আবেদনে সাড়া দিয়াই সম্প্রতি দিল্লি হাইকোর্ট আইনের যে ধারাটিতে ভিক্ষা করাকে অপরাধ বলা হইয়াছে, তাহাকে বাতিল ঘোষণা করিয়াছে। 

প্রথমেই প্রশ্ন উঠিতে পারে, আদালতের পর্যবেক্ষণ তো স্বাভাবিক বোধ-প্রসূত ভাবনারই কাছাকাছি, তাহা হইলে এত দিন ভিক্ষা করা অপরাধ বলিয়া গণ্য হইত কেন? উত্তরটি আছে ‘দ্য বম্বে প্রিভেনশন অব বেগিং অ্যাক্ট, ১৯৫৯’-এর মধ্যে। আইনটিতে ভিক্ষাবৃত্তিকে অপরাধের তকমা দিবার প্রধান উদ্দেশ্য, ভিক্ষাজীবীদের তাঁহাদের বর্তমান বেআইনি জীবিকা হইতে সরাইয়া অন্য পেশায় নিযুক্ত করা। সহজ কথায়, তাঁহাদের পরনির্ভরতা হইতে মুক্ত করিয়া স্বনির্ভর করিয়া তোলা। এ বিষয়ে কোনও নির্দিষ্ট কেন্দ্রীয় আইন না থাকিবার জন্য বিভিন্ন রাজ্য হয় এই আইনটিকেই গ্রহণ করিয়া থাকে, নয়তো এই আইনের ছাঁদে নিজ আইন তৈরি করিয়া লয়। অপরাধ প্রমাণিত হইলে আইন অনুযায়ী ভিক্ষাজীবীকে এক হইতে তিন বৎসরের জন্য সরকার নিয়ন্ত্রিত ‘বেগারস হোম’-এ স্থানান্তরিত করিয়া নিখরচায় খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা এবং শিক্ষা এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ দিবে, আইন এমনই বলিতেছে। সুতরাং, আইনের উদ্দেশ্যে খাদ ছিল না। তবে সমস্যা কোথায়? সমস্যা ইহাই যে, ভিক্ষাবৃত্তি একটি রোগলক্ষণ, কিন্তু সমগ্র পেশাটিকেই অপরাধ বলিয়া দাগাইয়া দিয়া রোগের মূল কারণটি যে সামাজিক অন্যায়, তাহার উপশমের ব্যবস্থা হয় না। কেবল সামাজিক অন্যায়ের ভুক্তভোগীদের শাস্তি পাইতে হয়। দারিদ্র দূরীকরণের দায়িত্বটি মূলত রাষ্ট্রের। সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতাকে চাপা দিতে সমাজের দরিদ্রতম মানুষদের ‘অপরাধী’ বলিয়া চিহ্নিত করা যায় না। 

মুশকিল হইল, দারিদ্রের সহিত ভিক্ষাবৃত্তির যোগ থাকিলেও, ভিক্ষাবৃত্তির সহিত বহু ক্ষেত্রে অপরাধচক্রের সংযোগ জড়াইয়া থাকে। ভিক্ষাবৃত্তিকে আইনি সিলমোহর দিলে কি সেই চক্রকে শায়েস্তা করা দুরূহ হইয়া যায় না? বিশেষত দারিদ্রের সুযোগ লইয়া যাহারা ভিক্ষুক তৈরির ব্যবসায়বৃত্তিটিকে বাণিজ্যিক লাভের মাধ্যম করিয়া তোলে, তাহাদের হাত কি এই আইনের ফলে দৃঢ়তর হয় না? এই প্রশ্নের উত্তর উপরের রায়টিতে আছে। আগেকার আইনের ১১ নম্বর ধারাটি অপরিবর্তিত রাখা হইয়াছে, যেখানে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে কাউকে ভিক্ষার জন্য বাধ্য করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। রায়ের মূল বক্তব্যটি সহজ ও যুক্তিপূর্ণ: ভিক্ষাবৃত্তি একটি সামাজিক ব্যাধি, তাহাকে ‘অপরাধ’ নাম দিয়া না দাগাইয়া বরং ব্যাধিটির বৃহত্তর প্রতিকার জরুরি।