লোকসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পূর্বলগ্নে (২১ ও ২২ মে) এই পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে সমাজবিজ্ঞানী তথা ইতিহাসবিদ পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলিয়াছেন, বর্তমান ভারতে যদি কোনও ‘হেজিমনিক’ প্রকল্প থাকে, তাহা একটিই: হিন্দুত্ববাদ। হেজিমনিকে যদি বাংলা ভাষায় চেতনার আধিপত্য বলা যায়, তবে এই মন্তব্যের অর্থ— হিন্দুত্ববাদ ভারতীয় চেতনায় যে ভাবে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করিতেছে, অন্য কোনও ধারণা অন্তত এই মুহূর্তে সেই ভূমিকায় নাই। সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ চলিতেছে, আরও কিছু কাল চলিবে। ইতিহাসবিদের এই উক্তি সেই ফল-বিচারের উপর এক বিশেষ সন্ধানী আলো ফেলিতে পারে। উদ্ভাসিত হইতে পারে ভারতীয় রাজনীতি তথা সমাজ-সংস্কৃতির নূতন পরিসর। উক্তিটির সূত্র ধরিয়া এই বিষয়ে ভাবনাকে কিছু দূর প্রসারিত করিবার চেষ্টা চলিতে পারে।

চেতনার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ও প্রসারের কৃৎকৌশল সচরাচর জটিল, সূক্ষ্ম এবং সতত সঞ্চরমাণ। বিচারবুদ্ধির পাশাপাশি আবেগ ও অনুভূতির স্তরেও (স্তরেই) তাহা (অধিকতর) সক্রিয় হয়। বৃহস্পতিবারের বারবেলায় অশ্বারোহণে আসিয়া আমি তোমার চেতনার অধিপতি হইব— এমন রঘুডাকাত-সুলভ ঘোষণা তাহার ধর্ম নহে, সে আসে ধীরে, নীরবে, অলক্ষ্যে, ধারণা ও বিশ্বাসের গভীরে নিজেকে বপন করে এবং ক্রমশ শিকড় বিস্তার করে। পরিবার, স্কুলকলেজ, ধর্মপ্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম ইত্যাদি বহুবিধ প্রকরণকেই ব্যবহার করে সে, জীবনের দৈনন্দিন পরিসরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মারফত তাহার প্রভাব বিস্তৃত হয়, এবং প্রভাবিত মানুষ সেই ধারণাকে স্বাভাবিক বলিয়া গণ্য করে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে হিন্দুত্ববাদের সাম্প্রতিক অভিযান যেন অস্বাভাবিক উগ্র, চিৎকৃত, প্রকট— রঘুডাকাতও বুঝি তাহা দেখিলে লজ্জিত হইত। কিন্তু ভাবিয়া দেখিলে, এই অভিযানেও কৃৎকৌশলের প্রয়োগ কম হয় নাই। নরেন্দ্র মোদীর শাসনের প্রথমার্ধে অসহিষ্ণুতা এবং হিংস্রতার যে আতিশয্য প্রকট ছিল, শেষ দুই বৎসরে তাহার বহিরঙ্গ রূপ অনেকখানি নিয়ন্ত্রিত হয়। ইহাও লক্ষণীয় যে, নির্বাচনের প্রস্তুতিপর্বে অনেকেই সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের উদ্দেশ্যে সংগঠিত হিংসার আশঙ্কা করিয়াছিলেন, বাস্তবে তেমন কিছু বড় আকারে ঘটে নাই। কিন্তু এই পরিবর্তনের অন্তরালে আছে গভীরতর সত্য: সংখ্যাগুরুর আধিপত্য এবং তাহাকে কেন্দ্র করিয়া সমাজের চিন্তা ও চেতনার সাম্প্রদায়িক বিভাজন ইতিমধ্যেই অনেক দূর অগ্রসর হইয়াছে, সমাজমানসে হিন্দুত্বের শাসন কায়েম করিবার জন্য প্রত্যক্ষ বা প্রকাশ্য হিংস্রতার প্রয়োজন সেই অনুপাতে কমিয়াছে, অন্তত আপাতত। এবং লক্ষণীয়, প্রচারের শেষ পর্বে শাসক দলের নির্বাচনী সংলাপের প্রধান অভিমুখ হইয়া দাঁড়ায় জাতীয় নিরাপত্তা— পুলওয়ামার জবাবে বালাকোট। সংখ্যাগুরুর হিন্দুত্ববাদ এবং তাহার সংলগ্ন অতিজাতীয়তা নির্বাচনী প্রচারে পরিবেশিত হয় এই নিরাপত্তার মোড়কে। দেশের নিরাপত্তা এবং সংখ্যাগুরুর নিরঙ্কুশ শাসন বহু মানুষের চেতনায় একাকার হইয়া যায়।

চেতনার আধিপত্য কখনও শাশ্বত নহে, তাহার পরিবর্তনের সম্ভাবনা সর্বদা জাগ্রত। ইউরোপে আর্থসামাজিক কাঠামোর বিবর্তনের সহিত ‘হেজিমনিক’ চেতনা কী ভাবে বদলাইয়াছে, সেই কাহিনি বহুচর্চিত। ঘর হইতে দুই পা ফেলিয়া ষাটের দশকের সহিত বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক সমাজের মানসলোকের তুলনা করিলেও বিবর্তনের সত্য ধরা পড়ে। কিন্তু এই অভিজ্ঞতাগুলিই জানাইয়া দেয়, হিন্দুত্ববাদের আধিপত্য নির্মাণের প্রকল্পটির মোকাবিলা সহজ কাজ নহে। বিশেষত, তাহা নির্বাচনসর্বস্ব রাজনীতির সাধ্যাতীত। পার্থবাবু সেই রাজনীতির সীমাবদ্ধতার উপর জোর দিয়া বলিয়াছিলেন, ‘দৈনন্দিন সংস্কৃতি’র পরিসরে হস্তক্ষেপ প্রয়োজন, যে সংস্কৃতি মানুষের কল্পনায় পরিবর্তন ঘটাইয়া চলে। চেতনার আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় হিন্দুত্ববাদ তথা সংখ্যাগুরুশাসিত অতিজাতীয়তাবাদের অভিযানে এই দৈনন্দিন সংস্কৃতির ভূমিকা বিরাট। ওই অভিযানের প্রতিস্পর্ধীদেরও সেই পরিসরে সক্রিয় হইতে হইবে। মানুষের মনের কথা শুনিবার এবং মানুষের মনকে নাড়া দিবার সৎ চেষ্টা করিতে হইবে। তাহা কেবল দৈনন্দিন কর্তব্য নহে, জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রতি মুহূর্তে পালনীয় কর্তব্য। সেই দৈনন্দিন সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করিয়াই উদার, বহুত্ববাদী, যথার্থ জনকল্যাণী রাজনীতি আপনাকে গড়িয়া তুলিতে পারে। সম্মুখের পথ দ্বিধা-বিভক্ত: নবনির্মাণ অথবা আত্মসমর্পণ।

যৎকিঞ্চিৎ

ইট দিয়ে চমৎকার রাস্তা তৈরি হচ্ছিল, কিন্তু এলাকার লোকে ভোট দেয়নি, তাই ইট রাতারাতি তুলে ফেলে, রাস্তা করে দেওয়া হল জঘন্য, খোঁদলময়। কবে এই তত্ত্ব অনুযায়ী পেটে সাঁড়াশি ঢুকিয়ে দু’টাকা কিলোর চাল বার করে নেবে, বা চোখে আঙুল খুঁচিয়ে খুঁটে নেবে ফ্রি জলসার দৃশ্যাবলি, কে জানে। কিন্তু উন্নয়ন যে আদৌ মানুষের জন্য নয়, স্রেফ ভোটের জন্য, এই গণিতটার ওপর থেকে শেষ আস্তরণটুকুও সরিয়ে, এবড়োখেবড়ো সত্যটা খুল্লমখুল্লা করার জন্য গণতান্ত্রিক কুর্নিশ!